ঠাকুর ঘরে খুঁট খাট শব্দ পেয়ে যখন জানতে চাওয়া হয় যে, ‘ঠাকুর ঘরে কে?’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে, "আমি কলা খাই না।" তার মানে ঠাকুর ঘরে যে যায় কলা খেতেই যায়। যেমন বলা হয় যে লঙ্কায় যায়, সেই রাবণ হয়। দেশের গণমাধ্যম কয়েকদিন যাবত সরগরম আমেরিকায় লবিষ্ট নিয়োগ বিষয়ে।
বিএনপি, আওয়ামীলীগ একে অন্যকে অভিযুক্ত করছেন। দোষারোপের ঐতিহ্য আমাদের রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য। কলা খাওয়া অর্থব্য লবিস্ট নিয়োগের বিষয়টি জানা থাকলেও কোনও পক্ষই কিন্তু মুখ খুলে নি এতদিন। সরকার পক্ষ থেকে প্রথম প্রকাশ করা হলো বিএনপির নিবিস্ট নিয়োগের বিষয়। প্রথম দিকে বিএনপি চুপচাপ থাকলো। পরে অভিযোগ স্বীকার/অস্বীকার না করে পালটা অভিযোগ করে সরকারি দলের বিরুদ্ধে।
সরকার শেষ পর্যন্ত কয়েক ধাপ এগিয়ে বিএনপির মহা-সচিবের স্বাক্ষরিত চিঠির কপি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করে। হাঁটে হাড়ি ভাঙার মতো। কিন্তু বিএনপি এখন পর্যন্ত দলিলপত্র হাজির না করতে পারলেও হম্বিতম্বি করে বলতে চাইছে তারা দোষণীয় কিছু করে নি। লবিস্ট নিয়োগ আমেরিকায় সাধারণ এবং নিয়মিত চর্চা। বাংলায় বললে এক ধরনের দালাল। যারা ওই দেশের নীতি নির্বাবক ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কর্তার নির্দেশ ও ইচ্ছা মাফিক তদবির করবে।
অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে এই কাজ করার জন্য অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়। তারা নানা সম্ভব, অসম্ভব উপায়ে মক্কেলের পক্ষে কাজ করে। যুক্তি-প্রমাণের অতিরিক্ত তারা উপহার-উপটৌকনের আশ্রয়ও নিয়ে থাকে। খাস বাংলা উৎকোচ বা ঘুষ বললেও অত্যুক্তি হয় না। রাজনৈতিক আকারে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী মুরব্বির দ্বারা মনোবাসনা পূরণের চেষ্টা এই দেশে নতুন কিছু নয়। সরকারের পক্ষে বিদেশী রাষ্ট্রে ওকালতি করার কাজ দূতাবাস করে থাকে। এরপরও যদি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ দিতে হয় তবে প্রশ্ন এসেই যায় দূতাবাসের দক্ষতা, সক্ষমতা নিয়ে। বলা হচ্ছে পিআর ফার্ম হিসেবে সরকারী ভাবে এদের নিয়োগ দেয়া হয়।
সরকারী ব্যয়ের খাত ও উদ্দেশ্য নিশ্চয় জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের লবিস্ট নিয়োগের যৌক্তিকতা থাকতে হবে। ব্যয় নির্বাহের উৎস অবশ্যই জনগণকে জানাতে হবে। কেবলমাত্র শাসকদলকে ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’ বিধিতে ক্ষমতা থেকে হটানের একমাত্র উদ্দেশ্যেই লবিস্ট নিয়োগ করা হয়, তবে সেই পক্ষের দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ইত্যাদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সামনে আরো জন ঘোলা হবে। ঘোলা জলে সুযোগ সন্ধানীরা হয়তো মাছও শিকার করার মতো পেয়ে যাবে।
কিন্তু জনগণের জীবন মানের উন্নয়ন, দেশের প্রবৃদ্ধি প্রভৃতির ঘোলা জলের অস্বচ্ছতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ব্যাপক আকারেই থেকে যায়। ভাষা আন্দোলনের এই মাসে এখনও শব্দ প্রয়োগে শাসক শ্রেণির মানসিকতা, ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে পীড়িত। ‘দ্বায়িত্ব’ নয় ‘ক্ষমতা’ বলতেই আমাদের রাজনীতির ব্যবহারজীবিরা স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। জনগণও নের্তৃবৃন্দের মানসিকতার পরিচয় পায়।


