অপমানে অভিমানে আমেরিকা চলে গেছেন এটিএম কামাল
পরিচয় প্রকাশ গুপ্ত
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:০১ এএম
# এটিএম কামাল কাউকে বানানো যায়না, এটিএম কামালরা জন্মগ্রহণ করেন
দেশ ও জনগণকে ভালোবেসে রাজনীতিতে এসেছিলেন এটিএম কামাল। আর বিএনপির রাজনীতিতে এসেছিলেন, পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে। সোনারগাঁয়ের একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে এটিএম কামালের জন্ম। তার পিতা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। এটিএম কামালের মা বিএনপি নেত্রী ছিলেন। চাচা মনিরুজ্জামান মিলু ছিলেন সাবেক সোনারগাঁ উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা। মানুষের প্রতি তার একটি স্বাভাবিক ভালোবাসা ছিলো।
এজন্য ৮৮ ও ৯২ এর প্রলয়ঙ্করী বন্যা, আইলা ও সিডড়ের ধংসযজ্ঞের পর, এটিএম কামালকে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ছুটে যেতে দেখা গেছে উপদ্রুত এলাকায়। নিজের পকেটের টাকা দিয়েই তিনি এসব দাতব্য কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। প্রয়োজনে শুভানুদ্ধায়ীদের সাহায্য সহযোগীতাও নিয়েছেন। ‘নির্ভীক’ নামে এটিএম কামালের একটি সামাজিক সংগঠনও ছিলো। যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে ও সামাজিক প্রয়োজনে দাবি-দাওয়া নিয়ে এই নির্ভীক নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তেন এটিএম কামাল। প্রয়োজনে বিক্ষোভ মিছিল এবং মানববন্ধনও করতেন। নির্ভীকের গুটিকয় সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তার মিছিল করা দখে অনেকে হাসি-ঠাট্টা ও ব্যাঙ্গ বিদরুপও করেছেন। কিন্তু কামাল ছিলেন নির্বিকার।
এটিএম কামালের মধ্যে একটি বৈপ্লবিক ঔদ্ধত্যও ছিলো। তিনি যেটাকে সঠিক ও ন্যায় মনে করতেন তা নিয়ে মাঠে নামতে তিনি লজ্জা পেতেন না। তার সঙ্গে কয়জন আছে তা নিয়ে চিন্তা করতেন না। ৭-৮ জন আছে তো, একটি ব্যানার নিয়ে ৭-৮ জনকে সাথে নিয়েই তিনি রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ২০০৮ এর পর এভাবে বিএনপির পক্ষে মাঠে নেমে এটিএম কামাল যে, কত পুলিশ ও সরকারি দলের গুন্ডাদের ধাওয়া খেয়েছেন তার কোনো লেখাজোখা নেই। তার চেয়ে বেশি পুলিশি নির্যাতনের শিকার এ জেলায় অন্য কোনো বিএনপি নেতা হয়নি। মামলা খেতে খেতে এক পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা হয়েছিলো প্রায় তিন ডজন।
সে সময় এটিএম কামাল একবার হাস্যছলে এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, বাড়িতে একটি ব্যাগ সব সময় সময়ের জন্য রেডি করে রেখেছি। কারণ কোন সময় পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়, তার তো ঠিক নেই। এই ব্যাগের মধ্যে রেখেছি একটি লুঙ্গি, একটি গামছা, টুথপেষ্ট, টুথব্রাশ ও একটি সাবান। যেনো জেলখানায় গিয়ে হঠাৎ বিপদে পরতে না হয়। এক পর্যায়ে কাফনের কাপড় নিয়ে এটিএম কামাল অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে নামতেন। ভালো থাকা খাওয়ার ধান্দায় এটিএম কামাল রাজনিতীতে নামেনি। কারণ সে ধান্দা করলে রাজনীতি ছাড়া তার অন্য অপশনও ছিলো। বিগত শতকের আশির দশকে এটিএম কামাল দুবাই থেকে এসে সক্রিয় বিএনপি রাজনীতি শুরু করেন। এটিএম কামাল এ প্রতিবেদকে বলেছিলেন, সে সময় শামীম ওসমান তাকে রাইফেল ক্লাবে ডেকে নিয়ে বলেছিলো, ‘তুমি ভালো ছেলে। রাজনীতি করবা ভালো কথা।
তুমি আওয়ামীলীগ করবা, যুবলীগ করবা। শুধু আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো।’ শামীম ওসমানের এ কথায় এটিএম কামাল ঠিক করেন, তিনি রাজনীতি করবেন এবং বিএনপিই করবেন। এটিএম কামালের এক মেয়ে ও মেয়ের জামাই আমেরিকাতে থাকেন। সে সুবাদে তিনি মাঝে মধ্যেই মার্কিন মুলকে চলে যান। একাদিক্রমে সেখানে তিনি দু-বছরও থেকেছেন। গত ২৮ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর তিনি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে আসেন। মেয়র পদে নির্বাচন করার তার ইচ্ছাও ছিলো। এজন্য তিনি মনোনয়ন পত্রও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেননি। জেলা বিএনপি আহবায়ক ও চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচনে দাড়ালে, এটিএম কামাল তার পক্ষে মাঠে নামেন। এবং তার প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। এ ব্যাপারে এটিএম কামালকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব। এরা রাতের বেলা নির্বাচন করে। তারপরও তৈমুর ভাইয়ের পক্ষে নেমেছি; কারণ আমি চাই একটি উৎসমূখর নির্বাচন। যেখানে ভোটাররা আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে ভোট দিতে আসবে। ফলাফল যাই হোক না কেন।
এদিকে, বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তারপরও তৈমুর এ নির্বাচন করায় এবং এটিএম কামাল তাকে সহযোগিতা করায়, দুজনকেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। নির্বচনের একদিন পর গত ১৮ই জানুয়ায়ি দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এড. রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পরই নিরব হয়ে যান এটিএম কামাল। গত ৬ই ফেব্রুয়ারি কাতার এয়ারওয়েজে চড়ে তিনি আবার আমেরিকা চলে যান। এবার আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে কৈফিয়ত হিসেবে তিনি বলেছেন, স্ত্রীর চিকিৎসা এবং নিজের চেকাপের জন্যই তিনি আমেরিকা যাচ্ছেন। তবে তিনি কবে ফিরবেন সে সম্পর্কে কিছু বলেনি।
অনেকে মনে করেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে অপমানে অভিমানে এটিএম কামাল আমেরিকা চলে গেছেন। তিনি হয়তো আর নাও ফিরতে পারেন। বিএনপির এক প্রবীণ কর্মী বলেছেন, রাতারাতি কেউ এটিএম কামাল হতে পারেনা। এটিএম কামাল কাউকে বানানো যায়না। এটিএম কামালরা জন্ম গ্রহণ করেন।


