# বিভেদ ভুলে এককাতারে বিএনপি নেতারা
# জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে নেতাকর্মীদের কাজের নির্দেশ
করোনার চোখ রাঙানি শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্রমেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বেকায়দায়। প্রথম দিকে সরকারি কিছু সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া হলেও সময়ের ব্যবধানে সেটি শুন্যে এসে ঠেকেছে। দিন যত গড়িয়েছে মানুষের আর্থিক দৈন্যতা তত বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর জীবনধারণের সর্বক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস।
জনগণের এসব সমস্যা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন কোন উদ্যোগ কিংবা কর্মসূচি লক্ষ্য করা যায়নি। তবে দেরীতে হলেও মানুষের এসব জনদাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। জনসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন পর নারায়ণগঞ্জ বিএনপিও তাদের দুরুত্ব ঘুঁচিয়ে এক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবিষয়ে এখনো মুখ খোলেনি।
সূত্র বলছে, প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রয়োজনীয়ত পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে চলেছে। চাল-ডাল, ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে গেছে। তা কমার লক্ষণ নেই। করোনার শুরুতে বাড়ি ভাড়া না বাড়লেও এবছর বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। দীর্ঘদিন সংকটে থাকার কারণ দেখিয়ে বাড়ানো হয়েছে বাসভাড়া। শিক্ষা ব্যবস্থাতেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বহু কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক হয়ে পড়েছেন বেকার। টিসিবির সামনে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, ভিড় বেড়েছে মধ্যবিত্তেরও। ধনী শ্রেণির হাতে অগাধ টাকা থাকলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের পরিবার পরিজন নিয়ে চলাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনার চোখ রাঙানির পর থেকে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। বহু সার্টিফিকেটধারী বেকার জীবন যাপন করছে।
হতাশায় অনেকে আত্মহননের মতো পথ বেঁছে নিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় গত ২৪ ঘন্টায় অন্তত ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিচ্ছিন্ন কারণে হলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারেই এসব ঘটনা ঘটছে বেশি। নানা কারণে হতাশায় আত্মহত্যার ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। তাছাড়া করোনার সময় সাহায্য চেয়ে প্রশাসনের কাছে ফোন দেয়ায় কাশিপুরে একব্যক্তির হেনস্থা হওয়ার ঘটনাও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে ব্যথিত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মানুষের এসব সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের অনীহা সবসময়ই লক্ষ্য করা গেছে। বাজারদর মনিটরিংয়েও ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছে। মানুষ পড়েছে বিপাকে। ছোট সংসার চালাতেও মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
গতকাল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহানগর বিএনপির আয়োজনে এই প্রথম বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের একসাথে এক মঞ্চে দাঁড়াতে দেখা গেছে। মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুস সবুর খান সেন্টু এজন্য প্রশংসায় ভাসছেন।
তার প্রচেষ্টাতেই দীর্ঘদিন পর মহানগর বিএনপির নেতারা দুরুত্ব ঘুচিয়ে জনদাবিতে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, এই কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির সভাপতি সাবেক সাংসদ এড. আবুল কালামের সভাপতিত্বে মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা আব্দুল মজিদ, সহ-সভাপতি এড.সাখাওয়াত হোসেন, এড.জাকির হোসেন, আতাউর রহমান মুকুল, ফখরুল ইসলাম মজনু
হাজী নূর উদ্দিন,এড. সরকার হুমায়ন কবির,এড.রফিকুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান মনির, এড. রিয়াজুল ইসলাম আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাউসার আশা, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মুজিবুর রহমান, মহানগর বিএনপি নেতা সুলতান আহমেদ, হান্নান সরকার, মহানগর যুবদলের আহবায়ক মমতাজ উদ্দিন মন্তু, মহানগর শ্রমিক দলের সদস্য সচিব আলী আজগর, মহানগর মহিলা দলের সভানেত্রী দিলারা মাসুদ ময়না,সাধারণ সম্পাদক আয়শা আক্তার দিনা সহ প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।
এসময় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী, অবসর প্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম। প্রধানবক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এড. আব্দুস সালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ টিটু।
বিএনপির জাতীয় কমিটির ভাইস চেয়াম্যান ও সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর নারায়ণগঞ্জে জনসমাবেশের সুযোগ পাওয়া গেছে। দ্রব্যমূল্যে উর্ধগতি ও দুর্নীতি প্রতিবাদ সমাবেশে আজকে অনেক তরুণ উৎসাহী হয়েছে। অনেক বছর ধরে আমরা বক্তব্য দিয়ে আসছি। বক্তব্য দিয়ে এই সরকারে পতন হবে না। দুর্নীতি দুর হবে না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমে যাবে না। দ্রব্যমূল্য কমাতে হলে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি দেশ থেকে বের করে দিতে হয়। তাহলে আজকে রাজনৈতিক দলে সাথে সাথে সাধারণ মানুষকে রাজ পথে নেমে আসতে হবে।’ তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘আপনাদের শপথ নিতে হবে। আমরা মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে চাই। সেজন্যেই আমাদের আন্দোলন।
বাড়ি গোপালগঞ্জ হলে কিংবা ছাত্রলীগরে সদস্য হলে চাকরি পাওয়া যায়। মেধাবী ছাত্ররা চাকরি পাচ্ছে না। হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, আইসিইউ নেই তারা নাকি উন্নয়নের রোল মডেল। কথা দিয়েছিলেন দশ টাকা কেজি চাল, আজকে ৭০ টাকা কেজি।’মেজর হাফিজ আরো বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তারাই স্বাধীনতার পর দেশে এসে সরকার গঠন করেছে।
তাদের অদক্ষতা আর অবহেলার জন্য সেই সময়ও দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল। এখনও সেভাবেই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হচ্ছে। তারপরেও কেন মানুষ রাজপথে নামে না। কারণ আমরা জনগণের মনে বিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারছি না। সেই বিশ্বাসের বীজ রোপন করতে হবে, তাদের বুঝাতে হবে, আমরা আওয়ামী লীগের চেয়েও ভালো। আমাদের দলে চোর বাটপার নেই, এটা জিয়াউর রহমানের দল। আমাদের সময় গুম ছিলনা, খুন ছিল না। ব্যাংকে মানি লেন্ডারিং ছিল না। বিভিন্ন সময় সরকার পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই।
কিন্তু আমাদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয় না। আজকে যদি এই সরকারের পতন হয় বা কেউ যদি ঘোষণা দেয়, নির্বাচন তত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে হবে, তাদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। দূর্ণীতিতে শ্রেষ্ঠ হয়েছে এই দেশের সরকার। দুঃখ লাগে এই সেনাবাহিনী আমরা সৃষ্টি করেছিলাম। এখন সেই সেনাবাহিনীর ৭ জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কানাডা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাপান, জার্মানীসহ বিশ্বের সব কটি গণতান্ত্রীক দেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে।’
কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এড আবুল কালাম মাজেদ বলেন, ‘সেই ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত দেশের যে অবস্থা ছিল, দুর্ভিক্ষ ছিল দেশে। তেমন করেই এখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে নিষ্ঠুর শাসন চালিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ ভাবে ক্ষমতায় এসেছে আজকে কথা বলতে দেওয়া হয় না। দেশকে বাঁচাতে হবে, এদেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।
আমাদের ঐক্যেবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ ছাড়া এদেশের মুক্তি আসতে পারে না। উন্নয়নের নামে এদেশকে লুট করা হচ্ছে। তিনি আরো সমালোচনা করে বলেন, এই সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বলেন, সরকার নাকি উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে, এদেশের মানুষ উন্নয়নের উপর দিয়ে হাঁটছেন, এদেশ সিংগাপুর-আমেরিকাতে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ, এদেশের মানুষ দুর্ভিক্ষ উপভোগ করছে, আইনের শাসন নাই, কথা বলার অধিকার নাই।’


