# শেখ হাসিনার জন্যই আমার সকল অর্জন
# ভালো মানুষ না আসলে রাজনীতি কখনোই ভালো হবেনা
সবাই যে স্রোতের অনুকূলে চলেন তা নয়, কেউ কেউ বিপরীতেও চলেন। এমনই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একেএম সামসুজ্জোহা ও আলী আহাম্মদ চুনকার দুই মেরুর রাজনীতি দীর্ঘদিন থেকেই চলে আসছিল। তবে এর বাইরেও আনোয়ার হোসেন তার নিজস্ব একটা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছিলেন।
আনোয়ার হোসেন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। সবে মাত্র নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। তবে এর আগেই ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভূত্থ্যানসহ নানা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা আর ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেনকে আকর্ষণ করেন। সেটির মাত্র এতোটাই ছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ যখন বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন শুনেছেন তখনই বড় ভাইয়ের কাছে আবদার ধরেন তিনি ঢাকায় যাবেন ভাষণ শুনতে ও বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যাবেন,
যেই কথা সেই কাজ। ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে শুনলেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার তোলারাম কলেজে পড়াকালীন সময়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। তবে তখনও তিনি জানতেননা তিনি যে একজন রাজনীতিবিদই হবেন। যুগের চিন্তার সাথে স্বাক্ষাৎকারে আনোয়ার হোসেন নানা বিষয়ের স্মৃতিচারণা করেন।
তিনি বলেন, যেহুতু আমি ছাত্র হিসেবে ভাল ছিলাম, তাই ভাবতে পারিনি যে রাজনীতিবিদ হবো। তবে বঙ্গবন্ধু ও তার ভাষণের প্রতি দুর্বলতা থেকেই আমি অজান্তেই রাজনীতিতে জড়িয়ে যাই। ১৯৭৩ সালে আনোয়ার হোসেন তোলারাম কলেজের ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্রইউনিয়নের রোকনউদ্দিন আহমেদ সভাপতি ও আনোয়ার হোসেন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭৪ সালে যখন সারাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় তখন এই পরিষদই বঙ্গবন্ধুর সাথে স্বাক্ষাৎ করে রিলিফ ফান্ডে সহযোগিতার একটি অংশ পৌঁছে দেন। বঙ্গবন্ধু তখন আনোয়ার হোসেনকে আদর করে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। আনোয়ার হোসেন বলেন, একেএম শামসুজ্জোহার মাধ্যমে আমি রাজনীতিতে উৎসাহিত হই। তিনি অনেক পরামর্শ আমাকে দিতেন। তার মাধ্যমেই তোলারাম কলেজ সংসদের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে স্বাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলাম। তবে আজকের আনোয়ার হোসেন হয়ে উঠার পেছনের গল্পটা তখনো বাকি।
শত শত বিশ্বস্ত আওয়ামী লীগের কর্মী তৈরি করেছেন যে আনোয়ার হোসেন তার উত্থানের পেছনের সংগ্রামের গল্পটাই বেশি। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট নাসিম ওসমানের বিয়ে থেকে রাতে ফিরে বাসায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সকালে উঠে শুনেন বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ১৫ ও ১৬ আগস্ট সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেরিয়েছেন কী করবেন। কিন্তু তখন কোন নেতাকেই পাওয়া যাচ্ছেনা।
শেষে নারায়ণগঞ্জে ছাত্রলীগের যে কজনকে পাওয়া গেল তাদের নিয়েই সিদ্ধান্ত নিলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে তারা ঝটিকা মিছিল করবেন। ১৭ আগস্ট বিকেলে আছরের নামাজের পর ডিআইটি এলাকা থেকে বের করলেন ঝটিকা মিছিল। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান শুনে সবাই তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, ২নং রেলগেট এলাকায় পৌঁছানোর আগেই পুলিশের ধাওয়া।
আনোয়ার হোসেন স্মৃতি চারণ করে বলেন, তখন তো আর যোগাযোগ এতো উন্নত ছিলনা, সম্ভবত সেটিই ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে দেশের প্রথম ঝটিকা মিছিল। কিন্তু ৭৫’র আগস্টের পর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর পর্যন্ত চুপিসারে চিকা মারা, ছাত্রলীগ কর্মীদের সংগঠিত করা চুপিসারে চলছিল। একই বছর ৩রা নভেম্বর যখন জেল হত্যা হয়, তখন কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনায় হরতাল, পিকেটিং ও মিছিলে রাজপথে বের হন আনোয়ার হোসেনসহ তার সহযোগীরা।এমনকি গায়েবানা জানাযাতে অংশ নিতেও ঢাকায় ছুটে যান। তবে অরুণ নামে একজনকে তখন গ্রেফতার করা হয়।
এর কিছুদিনের মধ্যেই তোলারাম কলেজে আমিং ক্যাম্প তৈরি করা হয়। ডেকে পাঠানো হয় আনোয়ার হোসেনকে। তাকে দুইদিন রেখে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। তারপর রাইফেল ক্লাবে কমান্ডিং ইনর্চাজ নওজেস এর কাছে পাঠানো হয়। তখন আনোয়ার হোসেন শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। এরই মাঝে তাকে থানায় হ্যান্ডওভার করা হয়। ২/৩ দিন পর পর ইন্টিগরেশনে পাঠানো হয়।
১৩ দিনের মাথায় ডিটেকশন অর্ডার দিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তখন একেএম শামসুজ্জোহাও ছিলেন কারাগারে। কিছুদিন পরে সেখান থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয় রাজশাহী কারাগারে। দীর্ঘ ১৪,/১৫ মাস জেল খেটে বের হন আনোয়ার হোসেন। বেরিয়ে আবারো ছাত্রলীগের গুরু দায়িত্ব পালন করেন। তোলারাম কলেজের ছাত্র সংসদে দুর্দিনেও আরজু জাহাঙ্গীর পরিষদ এবং শামীম ওসমান-জাহাঙ্গীর পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে পাশ করান। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আনোয়ার হোসেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ছিলেন।
এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কোষাধ্যক্ষ পর্যন্ত পদে ছিলেন। এরপর নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯/৯০ এর দিকে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে এরমাঝে জেল, জুলুম, আন্দোলন ছিল নিত্যসঙ্গী।১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখনও যেন দুর্যোগ আনোয়ার হোসেনের পিছু ছাড়েনি।
তার শিষ্য শামীম ওসমান তখন এমপি। ১৯৯৭ সালে তাকে কুটকৌশলে বাদ দিয়েই সম্মেলন করা হয়, কিন্তু কোন পদে রাখা হয়নি। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে রাখেন।
২০০৩ সাল পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে শহর আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০১৩ সালে হন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০১৬ সালে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। তবে তার সকল অর্জনই হয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে। সারা দেশেই আনোয়ার হোসেন আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত।
তবে এতো চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এতোদূর আসলেও নানা আক্ষেপ রয়েছে আনোয়ার হোসেনের। তিনি বলেন, আমার হাতে অনেক কর্মীই নেতা হয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধটা খুবই কম। ২০১৩ সালে বাসভাড়া আন্দোলন নিয়ে শামীম ওসমানের দুর্ব্যবহার সারাদেশে ভাইরাল হয়েছে। এমন অনেক খারাপ ঘটনা রয়েছে।
তবে স্বস্তির বিষয় আমাকে কেউ বঞ্চিত রাখতে পারেনি কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সবসময়ই স্নেহ করেন। আমার মা-বোন আর অভিভাবক হিসেবে তিনিই দায়িত্ব পালন করেছেন সবসময়। তার মাধ্যমেই আমার সকল অর্জন। মানুষ আমাকে ভালবাসে, সম্মান করে, ক্লিন ইমেজের আনোয়ার হোসেন বলে চেনে এটাই আমার সবচাইতে বড় স্বার্থকতা। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। নারায়ণগঞ্জের পিচ্ছিল রাজনীতির মধ্যেও তিনি আমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমার সকল অর্জন শুধু তার জন্যই।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে দুই মেরুকরণে বিভক্ত। আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি সবসময়ই এসব দ্বন্দ্বের অবসান চাই। সামসুজ্জোহা-চুনকা ভাইয়ের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল তবে এখন শামীম-আইভীর দ্বন্দ্ব যে নোংরামির পর্যায়ে গিয়েছে এমনটা ছিলনা। শালীনতার মধ্যে থেকে আমাদের রাজনীতিটা করতে হবে। তবে ত্বকী হত্যাসহ যেসকল হত্যকাণ্ড হয়েছে আমরা সকল হত্যাকান্ডের বিচার চাই, চাইবো।
সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান মাসুমের বাসার সামনে বোমা হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাই। সে স্পষ্ট কথা বলে বিধায় এই হামলা। কিন্তু আমরা চুপ থাকবো। আমরা অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানাই। আমরা একটা সুন্দর শহর চাই। হকারদের পুনর্বাসন কখনোই শেষ হবেনা। কারণ তাদের পুনর্বাসন করেছিল আলী আহম্মাদ চুনকা, মেয়র আইভীও পুনর্বাসন করেছিল কিন্তু তারা দোকান বিক্রি করে দিয়ে রাস্তায় ওঠে। যারা হকারদের রাস্তায় নামায় তারা কেউ নারায়ণগঞ্জে থাকেনা, দুর্ভোগটা আমাদেরই পোহাতে হয়।
রাজনীতিতে সদ্য নাম লেখানোদের প্রতি আহবান জানিয়ে আনোয়ার হোসেন বলেন, হালুয়া-রুটি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির জন্য রাজনীতিতে আসার দরকার নাই। ভালো মানুষ, ভালো গুনাবলি নিয়ে স্বচ্ছ রাজনীতি করতে পারলেই রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন। ভালো মানুষ না থাকলে যেমন ভালো দেশ হয়না, তেমনি ভালো লোক রাজনীতিতে না আসলে রাজনীতিই কখনো ভালো হবেনা।


