# হাইভোল্টেজ দুই মন্ত্রীর নারায়ণগঞ্জ সফরে অনুপুস্থিত তারা
# সমালোচনায় সরব, উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগে নীরব
গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সাংসদ সেলিম ওসমান ও সাংসদ শামীম ওসমানের রাজনৈতিক যে দৌঁড়ঝাঁপ ছিল তা ক্রমেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান দুইজনই ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে উদ্দেশ্য করে নানাবিদ মন্তব্যে মশগুল ছিলেন।
এমনকি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পরও আইভীকে নিয়ে নানারূপ তীর্যক মন্তব্য ছিল তাদের। তবে সময় বদলেছে। এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান তথা ওসমান পরিবারের রাজনীতির অতীত জৌলুসে শেষ পেরেক ঠোঁকা হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সূত্র জানিয়েছে, আইভীকে নৌকার মাঝি হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার পর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা আটঘাট বেধে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিলেও সেখানে শামীম ওসমান ও অনুসারীরা মাঠে নামেননি। উল্টো তাদের চলনবিধি নিয়েও সংশয়ে পড়েন কেন্দ্রীয় নেতারা। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক শামীম ওসমানের প্রতি ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন, বেঁচে থাকতে নৌকা পাবেননা।
এরপর শামীম ওসমান অনুগত চারটি কমিটি ভেঙে দিলে তিক্ততার বিষয়টি সামনে আসে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বানের মাধ্যমে কেন্দ্র ও সারাদেশের আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কার্যক্রম, জনপ্রিয়তা, উন্নয়ন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পায়। কেন্দ্রীয় নেতাসহ সর্বমহলের অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা আদায় করতে সক্ষম হন আইভী।
ঠিক উল্টো ব্যাপারটি ঘটেছে শামীম ওসমানের ক্ষেত্রে। তাছাড়া সিটি নির্বাচনের সময় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাঁছাই ও জাতীয় পার্টির আগ্রাসী ভূমিকার কথা জানতে পারে কেন্দ্রীয় নেতারা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রহমান প্রচারণায় এসে তো মুখে লাগাম না টেনে সোজাসুজি বলেই দিলেন, ‘শুনলাম কি, আর এসে দেখলাম কী।’ আইভীকে প্রশংসার বানে ভাসিয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে আসা জাম্বো টিম। তাছাড়া কেন্দ্রেও এনিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা হয়। যার ফলে একেবারেই খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকে শামীম ওসমানের রাজনীতি।
সূত্র বলছে, সিটি নির্বাচনের পর থেকে রাজনীতির মাঠ থেকে একেবারে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনের পর দন্তহীন বাঘের মতো তর্জন-গর্জন করে মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও তাতে কেউ সারা দেয়নি। একই সময় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সাংগঠনিক বিধি না মেনে ৫০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করার আকাশ কুসুম প্রস্তাবনায় শামীম ওসমানের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, সিটি নির্বাচনের পরপরই অল ক্রেডিট গোজ টু শামীম ওসমান এমন সংবাদের ধোঁয়া তুলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আবারও এন্ট্রি নেয়ার চেষ্টা চালান শামীম ওসমান। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইভীর হ্যাট্রিক জয়ের কাছে সেসব কোন পাল্লা তো পায়ইনি কেন্দ্র ও স্থানীয় আওয়ামী লীগে আইভী মহিরুহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
দিন যত গড়িয়েছে আইভীর প্রতি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের ব্যাপারটি আরো শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ হলেও তিনি ঢাকায় বসবার করেন। অতীতে আওয়ামী লীগের বিশেষ টিম, মন্ত্রী কিংবা সচিব পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নারায়ণগঞ্জে সফর করলে সেখানে শামীম ওসমান কিংবা সেলিম ওসমানের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত।
একদিকে ফতুল্লায় নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আওয়াজ উঠলেও তা নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি শামীম ওসমানকে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির মতো হাইভোল্টেজ ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ সফর করলেও তাদের এই সফরে দেখা যায়নি শামীম ওসমান কিংবা সেলিম ওসমানকে।
সম্প্রতি এদুটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন আর শিক্ষার উন্নয়ন কী শুধুমাত্র সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য প্রয়োজন। এতে দুই সাংসদের কোন দায় নেই! এমনিতেই নানাধরণের সমস্যায় সিটি করপোরেশনের তুলনায় কয়েকগুন জর্জরিত ইউনিয়ন পরিষদগুলো।
অথচ দুই সাংসদের নির্বাচনী এলাকায় এতো গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মন্ত্রী সফর করলেও অনুপুস্থিত ছিলেন শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও আক্ষেপ করে বলেছেন, জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বর্পূণ আচার অনুষ্ঠানেও অনুপুস্থিত থাকেন দুই সাংসদ, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও তারা এড়িয়ে যান। তাহলে নিজ এলাকায় তাদের ভূমিকা কী? তাদের কাজ কী শুধু সমালোচনা করা?
তবে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের অনুপুস্থিতিতে প্রশংসার বানে ভাসিয়েছেন দুই মন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নিয়ে সারাদেশের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মীরা গর্বিত বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি। তিনি বলেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধির মানুষের কাজকর্ম কাজ করার আকুতিই প্রমাণ করে কেন আইভীকে মানুষ বারবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে।
এই অঞ্চলে যেভাবে উন্নয়ন হচ্ছে সেটি সকলের কাছে প্রশংসার দাবি রাখে। আমরা সত্যিই গর্বিত যে আমাদের একজন সেলিনা হায়াৎ আইভী আছেন। সারা বাংলাদেশেই আমরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সবাই গর্বিত।’
এদিকে এরআগে নারায়ণগঞ্জ সফরে এসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়র আইভী অত্যন্ত কর্মঠ।আমরা দূর দূরান্ত থেকে অনেক শুনেছি, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর আমাদের তার উপর আস্থা ছিল। উনি সৎ, ন্যায় পরায়ন এবং মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে চান।
তিনি এতো ভালো কিছু করেছেন মানুষের জন্য যা না দেখলে আমার অপূর্ণতা থেকে যেত। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনটি নারায়ণগঞ্জের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয়। আইভীর হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, আমি মুগ্ধ। নারায়ণগঞ্জের মানুষের আশা আকাঙ্খা পূর্ণ করার জন্য আইভী অত্যন্ত যোগ্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কখনো মানুষ চিনতে ভুল করেননা।’


