দাপট ধরে রাখতে পদবিহীন নেতাদের নানা কৌশল
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২২, ০৫:২৪ পিএম
# কমিটি বিলুপ্তির বিষয়টি লুকোতে চান সাবেক হয়ে যাওয়া নেতারা
# বেশিরভাগ দাপুটে নেতাই এখন ছন্নছাড়া, তলানিতে প্রভাব
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে সাংসদ শামীম ওসমান ও তার অনুগতদের কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করায় চরম বিরক্তি এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কেন্দ্রীয় নেতারা। যার জেরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বন্দরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বেচে থাকতে নৌকা পাবেননা।
একপর্যায়ে দেয়ালে পিঠ থেকে যাওয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে আইভীর পক্ষে অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হন শামীম ওসমান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। তার অনুগত মহানগর ছাত্রলীগ, জেলা ও মহানগর শ্রমিক লীগ, জেলা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। তাছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের দুই নেতাকেও বহিষ্কার করে দেয়া হয়।
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সিটি নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। এতে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এদিকে নির্বাচনের আগে থেকে ধ্বস নামতে থাকে শামীম ওসমান শিবিরে।
নির্বাচনের পরও শামীম ওসমান তার নেতাকর্মীদের চাঙা করতে যতগুলো কর্মসূচি করেছেন সবগুলোই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে সিটি নির্বাচনের সময় যেসব কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে বিলুপ্ত সেসব কমিটির নেতারা নিজেদের প্রভাব জাহির করতে নানা ছদ্মবেশ ধারণ করেছে।
সূত্র জানিয়েছে, জেলা ও মহানগর শ্রমিক লীগের বেশ কয়েকজন নেতা তাদের শ্রমিক লীগ আহবায়ক কমিটি সম্মেলন আয়োজন কমিটির সভাপতি হিসেবে দাবি করে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন।
এতে অনেক চাতুরতার সাথে আগের কমিটিই বহাল আছে এমনটি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও বেশ কয়েকজন নেতা স্বেচ্ছাসেবক লীগে ব্যানারেই নানা কার্যক্রম করার চেষ্টা চালাচ্ছে। একই অবস্থা ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতার দিকেও একই কৌশল অবলম্বন করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, জেলা ও মহানগর শ্রমিক লীগ বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে এই কৌশল নিতে দেখা গেছে। তারা নিজেদের সম্মেলন আয়োজন কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন। তাদের ধারণা তারা বিলুপ্ত শ্রমিকলীগের যেই পদে ছিলেন, সামনেও আবার তারা সেই পদ ফিরে পাবেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কেন এমন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা তা খুঁজতে গিয়েও বেশ কয়েকটি কারণ বেরিয়ে এসেছে। সূত্র জানায়, তারা সবজায়গায় নানা অপকর্মে সেসব দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করতেন। এবং তা দিয়েই তাদের প্রভাব বিস্তারের মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগাতেন।
কিন্তু হঠাৎ করে পদ চলে যাওয়ায় তারা বেকায়দায় পড়েছেন। পদ না থাকায় সবকিছুতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বির সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তাদের অনুগতরাও পদবিহীন নেতা বদলে ফেলছেন। এতে অনেকে অস্তিত্ব শুন্য হয়ে পড়েছেন, এবং পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, যদি ব্যর্থই না হত আর দলের প্রতি বিলুপ্ত কমিটির নেতারা আস্থাভাজনই হতেন তাহলে হুট করে একসাথে এসব কমিটি ভেঙে দেয়ার প্রয়োজন পড়তোনা। বিলুপ্ত ছাত্রলীগের কমিটির নেতারা একটি বিশেষ মহলের পকেটে থেকে তাদের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ ছিল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের যেসকল কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে সেখানেও একই অভিযোগ ছিল। বিলুপ্ত সেসব কমিটির নেতাদের ধারণা সেই পকেটই আবার সেলাই করে তাদের হারানো পদ ফেরত দিবেন। তবে আদতে সেই ধরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পবিত্র রমজান উপলক্ষেও পদবিহীন সেসব নেতা সংগঠনের নাম ব্যবহার করে ইফতার মাহফিল আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব জাহির করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর পেছনে মূলত নিজেদের অস্তিত্ব সংকটটাই মূল বিষয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে অথবা যে কোন সংগঠনের সাবেক নেতা হিসেবে তা স্পষ্ট করে এই ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা নেই, তবে কৌশলে সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কমিটি বিলুপ্তির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া স্রেফ প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এতে আওয়ামীলীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দেখভালেরও দায় রয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম যুগের চিন্তাকে বলেন, এক্ষেত্রে বিলুপ্ত কমিটির ব্যানার ব্যবহার করে কেউ কোন ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজনের এখতিয়ার রাখেননা। যদি এমনটি কেউ করার চেষ্টা কৌশলে করেন তবে এটি একটি প্রতারণা।
কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সবকিছু জেনেবুঝেই ওসব কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। যারা পদ হারিয়েছেন, তাদের কেউ যোগ্য হলে সেসব অঙ্গসংগঠনে আবারো পদ পেতে পারেন, তবে এখন তারা ওই সংগঠনের ব্যানারে কিছু করতে পারবেননা। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে আয়োজন করেন তবে সেটি ভিন্ন ব্যাপার। সেক্ষেত্রে তিনি যে সংগঠনের পদে ছিলেন সেটি যে ‘সাবেক’ তা স্পষ্ট করতে হবে।


