Logo
Logo
×

রাজনীতি

অন্তর্দ্বন্দ্বে বিবর্ণ না’গঞ্জের রাজনীতি

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ০১ মে ২০২২, ০৮:৩২ পিএম

অন্তর্দ্বন্দ্বে বিবর্ণ না’গঞ্জের রাজনীতি
Swapno

# দ্বন্দ্ব জেলা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত।
# দ্বন্দ্ব কঠিন আওয়ামীগেও
# অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেই মামুন মাহমুদ আহত

 

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে আনার সাথে সাথে বাংলাদেশের রপ্তানী আয়ে বিশাল ভূমিকা রাখায় এবং এর অবস্থান রাজধানী ঢাকার সংলগ্ন হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারায়ণগঞ্জের আলাদা একটি গুরুত্ব আছে। বাংলাদেশের যেকোন আন্দোলন সংগ্রামে এখানকার রাজনৈতিক দলগুলো খুবই গুরুত্ব ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পর থেকে এখানকার রাজনীতিতে যেই ভূমিকা ছিল একাত্মতা ছিল সেই চিত্রটা আরও বিশালভাবে দেখা যায় আশির দশকে। সে সময় আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে কর্ম চঞ্চলতা বৃদ্ধি পায়।

 

তারপর ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠনের পর সেই চঞ্চলতায় সোনায় সোহাগা হয়ে যায়। এর মধ্যে দলীয় আভ্যন্তরীণ কিছু কোন্দল থাকলেও সেখানে দলের প্রতি নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করার একটি প্রবণতা ছিল। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সেই আন্তরিকতা বা নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করার বিষয়টি আর লক্ষ্য করা যায় না।

 

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যদিও এই দ্বন্দ্বের শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে। যখন আলী আহাম্মদ চুনকা আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে স্বতন্ত্র লড়ে বিপুল ভোটে হারিয়েছিলেন খোকা মহিউদ্দিনকে। সেই নির্বাচনে খোকা আওয়ামী লীগ ও ওসমান আলীর পুত্র শামসুজ্জোহা পরিবারের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।

 

এই দ্বন্দ্বটা আরো জোরালো হয় ১৯৮০ সালে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে। সে সময় সরাসরি একেএম শামসুজ্জোহাকে হারিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন আলী আহাম্মদ চুনকা। ১৯৮৪ সালে আলী আহাম্মদ চুনকার মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের মাঠে এককভাবে রাজত্ব শুরু করেন ওসমান পরিবার।

 

কিন্তু তখন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপিকা নাজমা রহমানের নেতৃত্বে চুনকা সমর্থকরা সংগঠিত হতে থাকলে ওসমান পরিবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নাজমা রহমানের নৌকার বিপরীতে শামীম ওসমান দলের বাইরে গিয়ে জাতীয় পার্টি সমর্থিত তার ভাই নাসিম ওসমানকে সমর্থন করেন এবং নির্বাচিত হতে সাহায্য করেন।

 

তবে ওসমান পরিবারের দাপটের কারণে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি নাজমা রহমান এবং তখন থেকেই নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবার একই সাথে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি শুরু করে একটি দ্বৈত বলয়ের রাজনীতি তৈরি করে। সেই বলয়ের মাধ্যমেই ২০০৩ সালের আগ পর্যন্ত এককভাবে দাপটে ছিল ওসমান পরিবার।

 

কিন্তু ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌর নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন চুনকার মেয়ে ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। আর ঠিক তখন থেকেই বদলে যেতে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের চিত্র। দীর্ঘ সময় কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়ে একক কর্তৃত্ব হারাতে শুরু করে ওসমান পরিবার। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের আরো একজন শক্ত নেতা পেয়ে তার ছায়াতলে ভীড়তে থাকেন তৃণমূল ও আওয়ামী লীগের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা। আর তখন থেকেই অন্ত কোন্দলে পড়ে ভূগছে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতি।

 

এই দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব চরমভাবে প্রকাশ পায় ২০১১ সালের সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে। আইভী কাছে এক লাখেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়ে জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের হোঁচট খায় শামীম ওসমান।

 

ওই নির্বাচনতে ঘিরে প্রকাশ্যে একে অপরকে দোষারোপ ও বাক বিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন তারা। ত্বকী হত্যা ও সাত খুনের ঘটনায়ও দোষাদোষী চলে সমান তালে। একে অপরকে খুন, গুম, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকারও অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এমনকি টেলিভিশনে সরাসরি সমপ্রচারিত টক-শোতেও দেখা যায় মারমুখী বাক্য বিনিময়।

 

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চিত্রও কোন অংশে কম না। সৃষ্টি লগ্নে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি’র দলীয় তেমন কোন কর্মতৎপরতা দেখা না গেলেও ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার সময় সদর ও বন্দর আসনসহ নারায়ণগঞ্জ এর ৫টি আসনেই বিএনপি সমর্থিত সাংসদ নির্বাচিত হন। শহর ও শহর সংলগ্ন আসন অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এডভোকেট আবুল কালাম ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সিরাজুল ইসলাম (কমান্ডার) সাংসদ হিসেবে

 

নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে চঞ্চলতা চলে আসে। কিন্তু ১৯৯৬’র নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেন তখন অনেকটাই নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন আবুল কালাম। এমনকি তখন শহরের চাষাঢ়ায় অবস্থিত শহীদ জিয়া হল মিলনায়তনের নাম পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ যখন এর নাম মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন করে তখনও অনেকটা নিশ্চুপ ছিলেন আবুল কালাম।

 

তখন বিএনপিতে সদ্য যোগদান করা এডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার এর তীব্র বিরোধিতা করেন। পুরস্কার হিসেবে তৈমুরকে সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সভাপতি পদ দেওয়া হয়। তখন থেকেই মূলত নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বিভক্তি প্রকাশ্যে আসে। প্রায় দুই বছর আগে কাজী মনিরুজ্জামান মনির ও অধ্যাপক মামুন মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়।

 

এরপর ২০২১ সালে এডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে আহবায়ক ও মামুন মাহমুদকে সদস্য সচিব করে ৪১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তাদের তিন মাস সময় বেধে দেওয়া হয় তাদের অধীনস্ত ১০টি ইউনিটের কমিটি গঠন করার জন্য। তখন তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠে।

 

এরই মধ্যে বিভিন্ন কারণে দল থেকে বহিস্কার হন এডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার ও এটিএম কামাল। এরপর মনিরুল ইসলাম রবিকে ভারপ্রাপ্ত আহবায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। হেফাজতের মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হলে নাসিরউদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক করা হয়। তখন ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক নাসিরউদ্দিন ও সদস্য সচিব মামুন মাহমুদ ১০টি কমিটির অনুমোদন দেয়। এরই মধ্যে বিএনপির অন্তদ্বন্দ্বের সর্বশেষ যে চিত্রটি ফুটে তা হলো জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদের ছুরিকাঘাতে আহত হওয়া। যেখানে নিজ দলীয় লোকজনের অন্তর্দ্বন্দ্বকেও দায়ী করছেন অনেকে।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন