প্রভাবশালীদের শেল্টারে কিশোর অপরাধ বাড়ছে
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২২, ০৬:০৮ পিএম
# কিশোর অপরাধ দমনে অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে: এসপি
দ্বি-মত হবার কোনো সুযোগ নেই যে, করোনাকালীন সময়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় কিশোর-কিশোরীদের ঘরে বসে সময় কাটাতে হয়েছে। দেখা যাচ্ছে বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের বিনোদনের কথা চিন্তা করে হাতে তুলে দিচ্ছে স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ। কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাসের খাতিরে বাবা-মা ছেলে-মেয়েদের হাতে মোবাইল তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফলে কিশোর-কিশোরীরা খুব সহজেই ইউটিউব, টিকটক, লাইকি, ফেইসবুক, বিভিন্ন গেইম এমনকি পর্নগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় আবার বাবা-মা সন্তানের প্রাইভেসির কথা চিন্তা করে আলাদা কক্ষ দিয়ে থাকে। তবে তারা কী করে, তা সঠিকভাবে তদারকি করেন না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সাইডগুলোতে কিশোররা ভয়ঙ্করভাবে আসক্ত হয়ে এবং অনেক সময় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হতে প্ররোচিত হচ্ছে। কিশোরদের ভিতর ডিফরেন্ট বিহেভিয়ার দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলছে। সুতরাং পরিবার, আর খুব সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বাবা-মার কিছু দায়িত্বহীনতা শিশু-কিশোরদের অপরাধমুখী করে তুলছে।
এদিকে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে কিশোরগ্যাংয়ের গ্রুপের হাতে শিক্ষার্থী সহ একাধিক কিশোর হত্যা হয়েছে। এই কিশোর হত্যা ঘটনার পিছনে ছোট ভাই বড় ভাই, নির্বাচনে রাজনৈতিক ব্যক্তির পক্ষে কাজ না করার কারন জানান ভুক্তভোগিরা। আবার কোন ক্ষেত্রে এলাকার প্রভাব বিস্তারের জন্য রাজনৈতিক এবং জনপ্রতিনিধিদের শেল্টারে কিশোরগ্যাং গড়ে উঠেছে। এলাকায় প্রভাববিস্তার নিয়ে মারা মারি থেকে খুনো খুনি পর্যন্ত হয়।
অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালিদের ছত্র ছায়া কিশোরগ্যাং তৈরী হয়ে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। ছোট খাটো বিষয় নিয়ে হত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। অনেক ঘটনায় এক নারী নিয়ে দুই প্রেমিক পর্যন্ত মারা মারি লেগে যায়। এই অপরাধের পিছনে কিশোর অপরাধ সবচেয়ে বেশি হয়।
কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশ প্রশাসন মাঠে মহরা দিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করার পরেও অপরাধ কমিয়ে আনা যাচ্ছে না । বরং উল্টো দিন দিন কিশোর অপরাধ আরও বাড়ছে। যারা হত্যা মারা মারিতে জরিত হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে একাধিক কিশোরকে আইনের আওতায়ও আনা হচ্ছে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, ১৬ মে রাতে নগরীর দেওভোগ দিঘীরপাড় এলাকায় শুব্রত নামে এক কিশোরকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন নাসিক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিরের কিশোর গ্যাং বাহিনী নির্যাতন করে হত্যা করে। অভিযোগ রয়েছে মনিরের নির্দেশে শুব্রতকে হত্যা করা হয়। নিহত শুব্রত মারা যাওয়ার আগে ভিডিও বক্তব্যে বলে যান নাসিক নির্বাচনে কাউন্সিলর মনিরের পক্ষে কাজ না করায় তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়।
অপরদিকে তার একদিন পরে ইসদাইর রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেনীর ছাত্র ধ্রুবকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ছুড়িকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ৬ কিশোরকে পুলিশ প্রশাসন গ্রেপ্তার করেছে। সমসাময়িক সময়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নে ১৫ বছরের সিয়াম সরদার নামে এক অটো চালককে ইটভাটায় নিয়ে হত্যা করা হয়।
তারই পরিচিত কিছু কিশোর অপরাধি তাকে কৌশলে ডেকে নিয়ে ইটভাটায় নির্যাতন করে হত্যা করে। ইসদাইর এলাকায় কিশোর প্রভাবশালি ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় একাধিক কিশোরগ্যাং রয়েছে।
কিশোর অপরাধ থেকে বাচার জন্য সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও বন্ধুবান্ধব কিশোরদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে। একে বলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণ বিনষ্ট হয়ে গেছে। আগে কিশোরেরা প্রকাশ্যে ধূমপান করলেও পাড়ার মুরুব্বিরা শাসন করতেন। এখন উল্টো পাড়ার মুরুব্বিরা ভয় পান।
এছাড়া প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের সঙ্গে অভিভাবকেরা অনেক সময় তাল মেলাতে পারছেন না। সন্তান কী করে সময় কাটায়, ডিজিটাল ডিভাইসে কী করে তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না। এ ছাড়া কিশোরেরা কেন অপরাধে জড়াচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা থাকলেও সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর তাতে আগ্রহ নেই।
তাই ভালো ভালো আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেসবের বাস্তবায়ন হচ্ছে না।পাকিস্তান আমলে কিশোরদের করা অপরাধের শীর্ষে ছিল চুরি, তারপর পকেটমারি। গবেষণায় দেখা যায়, কিশোরেরা ক্রমশ মাদক, খুন, ধর্ষণ ও মারামারির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।
শিশু কিশোর আইন বিষ্লেশনরা জানান, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে শিশু-কিশোরদের জন্য জাতীয় শিশু আইন প্রণীত হয়। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে সই করে। এরপর ২০১৩ সালে আসে নতুন শিশু আইন। এর বাইরে শিশু-কিশোরদের নীতিমালা হয়েছে তিনটি।
১৯৯৪ সালে প্রণীত হয় জাতীয় শিশু নীতি। এরপর একই নামে ২০১৩ সালে হয় আরেকটি নীতিমালা। ওই নীতিমালায় আলাদাভাবে কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নের প্রসঙ্গ আছে। এর বাইরে রয়েছে জাতীয় শিশু শ্রম নিরসন নীতি, ২০১০। শিশু আইন, ২০১৩-তে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, শোষণ, অসৎ পথে পরিচালনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে।
শিশুর কল্যাণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শিশুকল্যাণ বোর্ডের কথাও বলা আছে। সব মিলিয়ে সচেতন মহল বলছেন কিশোরগ্যাং অপরাধ দমাতে হলে সবার আাগে পরিবার সমাজ পঞ্চায়েত ব্যক্তিদের সতর্ক হতে হবে।
জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। পাড়া মহল্লায় যারা পড়া- লেখা বাদ দিয়ে সন্ধ্যার পর আড্ডা দিচ্ছে তাদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে কার সাথে মিসছে কি করছে সেদিকে নজর দিতে হবে। তাহলে হয়ত সকলের প্রচেষ্টায় কিশোর অপরাাধ কমানো যাবে। এছাড়া পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে বা মহরা করে সকলকে সতর্ক করছে।


