Logo
Logo
×

রাজনীতি

বলয়ের থাবায় না’গঞ্জের রাজনীতি

Icon

এ.এল.আর আকাশ

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২২, ০৪:৫৭ পিএম

বলয়ের থাবায় না’গঞ্জের রাজনীতি
Swapno

# অনেকেই নেতাই আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন
# রাজনীতিবিদের অভাব না হলেও প্রকৃত নেতার বড়ই অভাব হবে

 

বলয়ে বিভক্ত হয়ে বিবর্ণ হয়ে পড়ছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। এর ফলে রাজনীতিতে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো নেতার সংকট সৃষ্টি হবে বলে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ধারণা। বর্তমানে দলের চেয়ে ব্যক্তিকে বড় করে দেখার প্রতিযোগিতায় হয়তো রাজনীতিবিদ তৈরি হবে ঘরে ঘরে কিন্তু তাদের মধ্যে নেতা হওয়ার যোগ্যতা কয়জনের থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

 

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির মতো বড় দলগুলো এখন বলয়ের রাজনীতিতে বিভক্ত হয়ে বেশিরভাগ নেতাকর্মীই তাদের বলয়ের বড় ভাই বা ম্যাডামকে খুশি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার সাথে সম্পৃক্ত থাকে নিজেদের আর্থিক, প্রশাসনিক কিংবা পেশিগত শক্তি বৃদ্ধি করা। এতে দলের ভাবমূর্তিকে জলাঞ্জলি দিতেও তারা কুন্ঠিত হয় না। ফলে দেশ, দল কিংবা জনগণের নেতা হওয়ার জন্য যে গুণাবলির প্রয়োজন তা থেকে অনেক দুরে সরে যাচ্ছেন তারা।

 

একজন নেতাকে তার দল, সংগঠন, কর্মীসহ জনগণের পথ প্রদর্শকরূপে চিহ্নিত হওয়ার কথা। একটি দলের উন্নয়নের স্বার্থে বহুমুখী দায়িত্ব পালন করার জন্য একজন নেতাকে বিচিত্রগুণের অধিকারী হতে হয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসমালোচক, সংযমশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, বন্ধুপ্রতিমতা, বিশ্লেষণমূলক ক্ষমতা, নমনীয় মনোভাব, আন্তরিকতাসহ একজন নেতাকে দলের স্বার্থে পরিবেশ ও অবস্থা বুঝে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হয়। কিন্তু এখনকার নেতাকর্মীদের মধ্য হতে সেধরণের গুণাবলি যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে।
 
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম থেকেই এখানকার রাজনীতিতে বলয়ের সৃষ্টি হলেও তখন দলের স্বার্থে নেতৃবৃন্দকে ছাড় দিতে দেখা যেত। তখনকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে উত্তর-দক্ষিণ মেরু থাকলেও প্রত্যেক বলয়ের সাধারণ কর্মীরা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ। আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলে বিভক্তি বা বলয় থাকাটা স্বাভাবিক হলেও নিজ স্বার্থে দলের বিরুদ্ধে কাজ করা এখন একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

শুধু বড় ভাইয়েরা না, তারা তাদের কর্মী নামক ভবিষ্যৎ নেতাদেরও দলের প্রতি অনুগত না হয়ে কিভাবে বড় ভাইরে পক্ষে কাজ করতে হয় তা শিখিয়ে যাচ্ছেন। যার প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে। সে সময় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপিকা নাজমা রহমানের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগ নেতা একেএম শামীম ওসমান তার ভাই তৎকালীন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের মনোনীত প্রার্থী একেএম নাসিম ওসমানের পক্ষ হয়ে কাজ করেন এবং নির্বাচিত করেন।

 

এরপর এধরণের প্রকাশ্য বৈরিতা অনেকবার চোখে দেখেছে নারায়ণগঞ্জবাসী। যার প্রমাণ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সারাহ বেগম কবরীর সাথে হয়েছে, ২০১৬ সালের সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াত আইভীর সাথে হয়েছে এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের সিটি নির্বাচনেও বেশ কিছু দেখেছেন তারা। এছাড়াও ইউনিয়ন ভিত্তিক নির্বাচনেও এর প্রকাশ্য দৃশ্য দেখা গেছে। নিজের দলের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তারা রাজাকার আলবদরদের সাথেও হাত মিলিয়েছে। এসব নেতাদের সাথে যারা হাত মিলিয়ে চলতে পেরেছেন তাদের প্রত্যেকেই একটি করে টাকা বানানোর মেশিন পেয়েছেন। যাকে বলে আলাদিনের চেরাগ।

 

যাদের এখন থেকে কয়েক বছর আগেও নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা, এখন তাদের বিলাসিতা যে কোন বড় মাপের ব্যবসায়ীদেরও হার মানায়। শুধু মাত্র বড় ভাই নামক নেতাদের চাটুকারিতা করার ফলই এত মিষ্টি হলে এধরণের চাটুকারিতা বা নেতা হতে কে না চাইবে। উপজেলা কমিটিগুলো নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক।

 

তৃণমূলের অভিযোগ এখানে এমন কিছু নেতা আছে যারা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ, যাদের দলের জন্য অনেক ভূমিকা আছে কিন্তু কমিটিতে স্থান পায় নাই। আবার কমিটিতে আসার কোন যোগ্যতাই নেই তাকেও নাকি কমিটিতে নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের এ ধরণের দ্বন্দ্বের কারণে তার প্রভাব পড়ছে সম্মেলনগুলোতে। 
 
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অবস্থাও কোন অংশে কম নয়। এখানে সবাই নেতা হতে যেয়ে নিজেদেরকে ক্ষমতাবান বানাতে গিয়ে দলের কোন কমান্ডই মানছেন না তারা। এখানেও দলের সিনিয়র পরিক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে হাইব্রিড ও সুবিধাবাদী কিছু নেতাসহ দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোও বিএনপির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন। তাদের মতে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে।

 

তাদের মতে দলের মধ্যে একাধিক বলয়ের সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রত্যেকেই তাদের আলাদা সমর্থক ও কর্মী বাহিনীদের নিয়ে তাদের নিজেদের শক্তিমত্তা প্রকাশে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এতে বিএনপির আসল নিয়ন্ত্রক কে এটা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা রকম সন্দেহ সৃষ্টি দিয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপির দু:সময়ের মাঠে অবস্থান করা নেতা এডভোকেট তৈমৃুর আলম খন্দকারকে দল থেকে বহিস্কারের ঘটনাকেও অনেকে বলছেন বলয়ের শিকার তিনি। এর আগেও এধরণের বহু ঘটনা ঘটলেও কাউকে এরকম শাস্তি দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন অনেকে।

 

বিএনপির বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, দলের ভেতরকার এধরণের বলয় গড়ে ওঠার কারণে দলে বিশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন কর্মসূচীতে কয়েকদফা সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। দলের উপরের সারির একাধিক নেতা হামলার শিকারও হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মামুন মাহমুদের উপর হামলার ঘটনা।

 

অনেকে অবার এই ঘটনার মধ্যেও নতুন ধরণের নোংরা রাজনীতির গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন। এতে করে সুযোগ গ্রহণ করতে জায়গা পাচ্ছে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। এই দলের কমিটিতেও যারা ক্ষমতায় আছে বা সুযোগে আছে তাদের মন মতো লোককে কমিটিতে নিয়ে তাদের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে কিংবা টাকার বিনিময়ে পদ দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ করা হচ্ছে এখন প্রকাশ্যেই।
 
বলয়ের রাজনীতিতে পিছিয়ে নেই নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টিও। নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির কারিগর হিসেবে পরিচিত একেএম নাসিম ওসমান থাকতে সেই বিভক্তি চোখে না পড়লেও তার মৃত্যুর পর তা প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে। খোদ ওসমান পরিবারেই জাতীয় পার্টি নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নাসিমভক্ত একাধিক নেতা কর্মী এখনও তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভতি দেখিয়ে তার পরিবার অর্থাৎ নাসিম ওসমানের সহধর্মিনী পারভীন ওসমানের পক্ষ নিয়েছেন।

 

অন্যরা যারা দলের চেয়ে কিংবা নাসিম ওসমানের চেয়ে অর্থ ও ক্ষমতার লোভকে প্রাধান্য দিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই আছেন শামীম ওসমান সমর্থিত সেলিম ওসমানের পক্ষে। তারা আসলেই লাঙ্গলের নাকি নৌকার জাতীয় পার্টির তা বুঝার কোন উপায় নেই। এরই মধ্যে দলিল জালিয়াতির মামলায় ধরা খেয়েছেন জাতীয় পার্টির নেতা রোটারিয়ান গিয়াসউদ্দিন (যাকে লজিং মাস্টার, জামাই গিয়াস, ভেন্ডার গিয়াস আবার কেউ কেউ তাকে অন্য নামেও ডাকে)। এরপর থেকে নতুন করে বলয়ের চিত্র ফুটে উঠে। তিনিও টাকা বানানোর মেশিন মানে আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ জালিয়াতি জমি জালিয়াতি করেছেন অভিযোগ আসে, প্রতিবাদ আসে।

 

কিন্তু জাতীয় পার্টি তথা ওসমান পরিবারের চেরাগই তাকে বাঁচিয়ে দেয়। এক সময় তাকে নাসিক ২৪ নং ওয়ার্ডের এসিআই ফ্লাওয়ার মিলের গেটে দেখা যেত দালালি করতে। তখন তার গাড়ি বাড়ির ঝলক ছিল না। কিন্তু এখন তার একাধিক আলিশান বাড়ি। গাড়ি ছাড়া চলাচলই করতে পারেন না। তাকে নিয়েও দলের একটি অংশ বলছেন তিনি জাতীয় পার্টির কেউ না।

 

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বলয়ের সৃষ্টির কারণে রাজনীতির ঐতিহ্য তার রং হারাচ্ছে। শীঘ্রই এসব নোংরা রাজনীতি এবং টাকা কামানোর সহজ পথ হিসেবে রাজনীতিকে ব্যাবহারের সুযোগ না কমানো গেলে ভবিষ্যতে হয়তো রাজনীতিবিদের অভাব হবে না। তবে দল বা জনগণের প্রকৃত নেতার বড়ই অভাব হবে বলে মনে করেন এখানকার সচেতন মহল।বিবি/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন