# জয়ী হয়ে প্রমাণ করলেন দলীয় সিদ্ধান্ত ভুল ছিল
ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে সোনারগাঁও উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। ইভিএম পদ্ধতি অর্থাৎ মেশিন জটিলতা এবং দুপুরের পর বৃষ্টির হানা ছাড়া নির্বাচন পরিচালনায় তেমন কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। নির্বাচনে সকল জল্পনা-কল্পনা শেষ করে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন সদ্য আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও ঐতিয্যে যে পরিবারের নাম আসে, বঙ্গবন্ধুর সহচর সাজেদ আলী মিয়ার সন্তান আরিফ মাসুদ বাবু।
বেসরকারী ফলাফলে আনারস প্রতীক পেয়েছে ৮ হাজার ৩শত ৯৯ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীক পেয়েছে ৭ হাজার ২শত ৪৯ ভোট। অর্থাৎ আরিফ মাসুদ বাবু আনারস প্রতীক নিয়ে ১১শত ৫০ ভোটে জয়ী হয়েছেন। সোনারগাঁও আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, যেখানে কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন ছাড়াই নৌকা প্রতীকের বিজয় লাভ করার কথা, সেখানে দলীয় ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আজ ধরাশায়ী নৌকা। জেলার নামীদামি নেতারা সেখানে অনেক তোরজোর চালিয়েও সোহাগ রনির শেষ রক্ষা করতে পারলেন না।
তবে অনেকের দাবী এসব নেতাদের ম্যানেজ করেই দলের জন্য নিবেদিত পরিবারের সন্তান এবং দলের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত নেতা আরিফ মাসুদ বাবুকে টেক্কা মেরে নৌকা প্রতীক হাতিয়ে নিয়েছেন অনেক বিতর্কিত কাজের হোতা সোহাগ রনি। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ সোহাগ রণির সাথে টক্কর মেরে আরিফ মাসুদ বাবুকে জয়ী করিয়ে সেই জবাব দিয়েছেন।
নির্বাচনে প্রশাসনের ব্যাপক তৎপরতায় বড় ধরণের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। নির্বচনী পরিবেশের বিষয়ে ভোটাররা জানান, ইভিএম এর মেশিন জটিলতার কারণে ভোট দিতে প্রচুর সময় লাগছে। তাই তাদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে নির্বাচনের প্রভাব বিস্তারের মতো কোন ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম মানিক জানান, তিনি বিগত সময়ও মেম্বার নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করার পর এবারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এলাকার জনগণ খুবই স্বতস্ফুর্তভাবে ভোট দিতেছেন। এখানে প্রচুর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন উপস্থিত আছেন, তাই এখানে কাউকে কোন প্রকার প্রভাবিত করার মতো লোক নাই।
নির্বাচন চলাকালীন সময় নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ (‘বি’ সার্কেল) সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন মিডিয়াকে জানান, ইভিএম-এ কারও ভোট কেউ দিয়ে দিতে পারে না। এখানে সমস্যা হয় কারও আঙ্গুলে যদি কোন প্রকার কাটা থাকে কিংবা আঙ্গুলের ছাপে সমস্যা থাকে। তখন তাদের আঙ্গুলের ছাপ মেশিনের মাধ্যমে ম্যাচ করতে সমস্যা হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে আসলে সমস্যা সমাধান করা যায়। তিনি জানান, প্রতিটি কেন্দ্রে একজন পুলিশ পরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর) নেতৃত্বে ৭জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৬টি মোবাইল টিম, ৩টি স্ট্রাইকিং টিম এবং স্ট্যান্ডবাই টিম দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
আরিফ মাসুদ বাবুর বিজয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাচন কমিশনার ইউসুফ উর রহমান। উপজেলা নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্য মতে সোনারগাঁও উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মোট ভোটারের সংখ্যা ২৪,২৩৪জন। মোট ভোট প্রদান করেছেন ১৬৫০৮জন। অর্থাৎ ভোট গ্রহণের হার শতকরা ৬৮.১। এর মধ্যে ৩৫টি ভোট বাতিল হওয়ার পর মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ১৬৪৭৩। এর মধ্যে মো. আরিফ মাসুদ বাবু আনারস প্রতীক পেয়েছেন ৮৩৯৯ ভোট, সোহাগ রনির নৌকা প্রতীক পেয়েছেন ৭২৪৯ ভোট, মো. দেলোয়ার হোসেনের হাতপাখা প্রতীক পেয়েছেন ৬৫৬ ভোট, মো. সুরুজ মিয়ার মোটর সাইকেল প্রতীক পেয়েছেন ১১০ ভোট এবং রকসির ঘোড়া প্রতীক পেয়েছেন ৫৯ ভোট।
এই নির্বাচনে শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে চলে নাটকীয়তা। যখন সোনারগাঁও আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক বোদ্ধাদেরই মতামত ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থন পাবেন আরিফ মাসুদ বাবু। কিন্তু গত ১৩ মে রাতে ধানমন্ডি ৩ নাম্বারে অনুষ্ঠিত মনোনয়ন বোর্ডের সভা শেষে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই সোহাগ রনি দলীয় সমর্থন পান বলে নিশ্চিত হয়ে সোহাগ রনি ও তার অনুগামীরা আনন্দ মিছিল করেন। মিছিল শেষে নেতাকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় সেজদায় লুটিয়ে পড়েন শাহ মো. সোহাগ রনি। তবে তার দলীয় সমর্থন পাওয়া নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের তৃণমূলেই দেখা দেয় নানান সমালোচনা। এমনকি অনেকে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাবুর সাথে রনির কোন তুলনাই হয়না বলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। আনেকে আবার বলতে শুরু করেন, কমিটিগুলোর মতো এখানেও টাকা পয়সা ও বলয়ের কারবার হয়েছে। আর না হলে বাবুকে বাদ দিয়ে রনিকে দলীয় সমর্থন দেওয়ার আর কোন থাকতে পারেনা বলে মনে করেন তারা।
বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি আওয়ামী পরিবারের সদস্য বঙ্গবন্ধুর সহচর সাজেদ আলী মিয়ার সন্তান আরিফ মাসুদ বাবু। কারণ তারা পারিবারিকভাবেই আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। তার ভাই আবুল হাসনাত ও মোবারক হোসেন ছিলেন সাংসদ। অন্যদিকে তার ভাতিজা আবদুল্লাহ আল কায়সার হাসনাতও ছিলেন সাংসদ। বাবুও ছিলেন মোগরাপাড়া ইউনিয়নের একাধিকবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান সোহাগ রনি তাদের এক সময়ের অনুগত কর্মী। তাই তার কাছে হেরে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি তিনি। অন্যদিকে নিজের উপর বিশ্বাসসহ মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভর করেন তিনি। তাই দলকেও অসম্মান না করে দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। একই সাথে শুধু নৌকা প্রতীক কিংবা বিশেষ পরিবারের সমর্থনই যে শেষ কথা নয় তারও প্রমাণ করার একটি সুযোগ তৈরি করে সেখানে সফল হন তিনি।
অন্যদিকে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ সোহাগ রনি প্রথম থেকেই বিতর্কিত ছিলেন। তিনি মূলত সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নারীসহ আটক করে আলোচনায় আসেন। একটি বিশেষ পরিবারে সাথে সখ্যতা থাকায় সেই ঘটনার পর থেকেই নৌকা প্রতীক পেতে সরব হয়ে উঠে রনি। তার বিরুদ্ধে বালু দস্যু ও ভূমি দস্যুতা ছাড়াও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। গত কোরবানীর ঈদে বেশ কয়েকটি গরু মহিষ কোরবানী দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণাও চালায় রনি। তাছাড়া হাসনাত পরিবারের পেছনে থেকেই রাজনীতিতে সোহাগ রনির উত্থান ঘটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালবাসা এবং নিজের কর্মই তাকে নির্বাচনের এমন ফল এনে দিতে সাহায্য করে বলে করেন সচেতন মানুষ।এমই/জেসি


