এক বছর আগেই শুরু হয়েছে গিয়াস-শামীম বাকযুদ্ধ
পরিচয় প্রকাশ গুপ্ত
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২২, ১১:২০ এএম
# শত ষড়যন্ত্র করেও আমাকে জনবিচ্ছিন্ন করা যাবেনা : গিয়াসউদ্দিন
# আজ এ পর্যন্তই থাক, বাকীটা আগামী ২৭ তারিখে বলবো: শামীম ওসমান
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মান একনায়ক হিটলার কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমনের পর পরই মিত্রপক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করলেও তখনই কিন্তু সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়নি। সে সময় ঝানু বৃটিশ রাষ্ট্রনায়ক উইনষ্টন চার্চিল বুঝতে পেরেছিলেন, হিটলারের পরবর্তী লক্ষ্য বেলজিয়াম ও ফ্রান্স। সে সময় (১৯৩৮) পশ্চিম ইউরোপ রক্ষায় বেলজিয়ামে এক লাখ বৃটিশ সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছিল এবং এক বছর ধরে দু’পক্ষ শুধুই বাকযুদ্ধ বা চাপাবাজি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।
তখন মিত্রপক্ষে চার্চিল ও রুজভেল্ট কোন হুমকি দিলে অপর পক্ষ থেকে তার জবাব দিচ্ছিলেন হিটলার ও তার চৌকশ তথ্যমন্ত্রী ডা. গোয়েবলস্। যেমন, হিটলারের জল স্থল ও অন্তরীক্ষে সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে বৃটিশ দ্বীপপূঞ্জ দখলে নেয়ার হুমকির জবাবে চার্চিল বলেছিল, ইংল্যান্ডের পতন হলে প্রয়োজনে আমরা কানাডা থেকে যুদ্ধ করবো।
এর জবাবে হিটলার প্রশ্ন করেছিল, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কি তার সঙ্গে করে বৃটিশ জনগণকে কানাডায় নিয়ে যাবেন? নাকি কানাডার জনগণ চার্চিলের হয়ে যুদ্ধ করতে রাজী? গোয়েবলস্ মহাশয় সে সময় জার্মান থেকে বেলজিয়ান ভাষায় রেডিওতে প্রচার করতেন, বেলজিয়ান কুমারীরা সাবধান, তাদের দেশে বৃটিশ নাগরিক এসে হাজির হয়েছে।
ফলে, সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাতে বৃটিশ সেনারা যে নাইট ক্লাবে গিয়ে একটু ফূর্তি ফার্তা করবে তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় নিউইয়র্ক টাইমস্ এ বাকযুদ্ধের নাম দিয়েছিল ‘ফোনি ওয়ার’ (চাপাবাজি যুদ্ধ)।
আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য দু’প্রার্থী এমপি শামীম ওসমান ও বিএনপির সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের মাঝেও এক বছর আগে থাকতেই ‘ফোনি ওয়ার’ শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, ‘জনগণ যদি ভোট দিতে পারে এবং শামীম ওসমান যদি আওয়ামী লীগ প্রার্থী হন, আর বিএনপি যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে শামীম ওসমান নির্ঘাৎ জামানত হারাবেন।’
‘কারণ, ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জের জনগণ তাকে পছন্দ করে না। বর্তমানে শামীম ওসমান ইলেক্টেড নন, একজন সিলেক্টেড এমপি। সিন্দাবাদের বুড়োর মতো তিনি জনগণের কাঁধে চেপে আছেন। উন্নয়নের ব্যপারে তিনি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নন; তাই নিজের খেয়াল খুশী অনুযায়ী তিনি যা খুশী তাই করতে পারেন।’
‘সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও বন্দরের পাশাপাশি ফতুল্লার দিকে তাকালেই ফতুল্লার দৈন্যতা দেখা যায়। ভাঙ্গাচুড়া রাস্তাঘাট, ভেঙ্গে পড়া নিষ্কাশন ব্যাবস্থা ও জলাবদ্ধতার কারণে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ফতুল্লাবাসীদের। সিদ্ধিরগঞ্জ,নারায়ণগঞ্জ ও বন্দরে উন্নয়ন করেছে সিটি কর্পোরেশন। এ কারণে ফতুল্লাবাসী সিটি কর্পোরেশনে যেতে চায়। কিন্তু এতেও বাঁধা দিচ্ছেন এমপি শামীম ওসমান। শামীম ওসমান তার এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের কথা বলেন কিন্তু তার উন্নয়ন আমি যেমন দেখি না, তেমনি জনগণও দেখে না।’
গিয়াসউদ্দিন আরও বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে শামীম ওসমান আমার কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হলেও সে নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়েছিল। পরবর্তী (২০০৮) নির্বাচনে শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি; সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তী দুটি নির্বাচন (২০১৪ ও ২০১৮) ছিল প্রহসনের নির্বাচন।’
‘এ দুটি নির্বাচনে যেহেতু জনগণ শামীম ওসমানকে ভোট দেয়নি, তাই জনগণের প্রতি তার কোন দায়বদ্ধতা নেই। প্রতি বর্ষায় তার এলাকার জনগণ যখন পূঁতিগন্ধময় জলাবদ্ধ পানিতে হাবুডুবু খায়, তখন তিনি বিদেশ ভ্রমণে বের হন। এবারের বর্ষাতেও তিনি সপরিবারে আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণে বেড়িয়েছিলেন।’
মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের এসব কথার জবাবে গত ১৯ আগষ্ট ফতুল্লায় জাতীয় শোক দিবসের এক আলোচনা সভায় শামীম ওসমান গিয়াসউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘কয়েক দিন আগে জেলা বিএনপি সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে ঢাকায় হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। যে তাকে ছুরি মেরেছে, সে ঢাকার কন্ট্রাক্ট কিলার। পরে দেখা গেছে, ঔ এলাকার এক সময়ের এমপি ছিলেন আমাদের বড়ভাই গিয়াসউদ্দিন।’
‘যার হাতে আমাদের বহু লোক মরেছে। তার ছোট ছেলের নাম আসামীর স্বীকারোক্তিতে এসেছে যে, সে টাকা দিয়ে ঐ কিলারকে কন্ট্রাক্ট করেছে মামুনকে মারার জন্য। এই খেলা কিন্তু নারায়ণগঞ্জে নতুন না। সেভেন মার্ডার হওয়ার পর সে খেলেছে, ত্বকী হত্যার পর খেলেছে, এখনো খেলতেছে। মামুন মার্ডার হওয়ার পরও খেলতো; দায় আমাদের উপর চাপিয়ে দিত। ইস্যূ সৃষ্টির জন্য তাদের লাশ খুব দরকার।’
শামীম ওসমান আরও বলেন, ‘আজ এপর্যন্তই থাক, বাকীটা আগামী ২৭ তারিখে বলবো।’
এ ব্যাপারে গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘শামীম ওসমান আমাকেই তার জন্য সবচেয়ে বড় বাঁধা ও চ্যালেঞ্জ মনে করে। এ কারনেই সে আমার ও আমার সন্তানদের বিরুদ্ধে মামলা এবং মিথ্যা, বানোয়াট ও অলীক কথাবার্তা বলে। সে এসব করে নিছক আমাকে হয়রানি করার জন্য। তবে, এসব করে আমাকে গণবিচ্ছিন্ন করা যাবে না, বিএনপি থেকেও আমাকে দূরে সরানো যাবে না। আমি আমার এলাকার জনগণের অন্তরে আছি। সময় মতো তা দেখতে পাবেন।’ এন.এইচ/জেসি


