# এক মঞ্চে বসলেও কারো সাথে কথা হয়নি
# নারায়ণগঞ্জে বসে সোনারগাঁয়ে হস্তক্ষেপ করে এক নেতা : আইভী
# নিজের অবস্থান আগে পরিস্কার করেন : শামীম ওসমান
এক দলের নেতা হলেও মেয়র ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভী আর সাংসদ শামীম ওসমানের দ্বৈরথ কারো অজানা নয়। দা-কুমড়া সম্পর্ক আর ক্ষণিকের জন্য ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়ে হাজির হলেও তাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা সবসময়ই রাজনীতিতে আলাদা মাত্রা যোগ করে। জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির দখলে থাকা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন (সোনারগাঁ) নিয়ে উপজেলা সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই শামীম ওসমানের প্রতি ইঙ্গিত করে টিপ্পনি কেটেছেন মেয়র আইভী।
আইভীর কয়েক মিনিটের বক্তব্যে সম্মেলনে আলাদা মাত্রা তৈরি হয়। প্রটোকল অনুযায়ী শামীম ওসমান আগে বক্তব্য দেয়ার কথা থাকলেও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত মেয়র আইভী বেশ কয়েক নেতার অনুরোধে শামীম ওসমানের আগে বক্তব্য দিতে এসে রীতিমত যেন আগুন ঝরালেন। সোনারগাঁ তো বটেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ভাই ভিত্তিক যে রাজনীতির প্রভাব সেটি খোলাসা করেছেন তিনি।
তাছাড়া সোনারগাঁ নিয়ে শামীম ওসমানের আলাদা আগ্রহের বিষয়টিও তার বক্তব্যে টেনে আনেন আইভী। আইভীর বক্তব্য শুনে এসময় মঞ্চে হাসছিলেন শামীম ওসমান। তবে বক্তব্য দেয়ার আগে কিংবা পরে আইভীর সাথে কথা বলতে দেখা যায়নি শামীম ওসমানকে। আইভীর বক্তব্যের পর শামীম ওসমানও তার বক্তব্যে ২৭ আগস্টে তার সমাবেশের আক্ষেপ নিয়ে কথা বলেন।
দীর্ঘ দুই যুগপর গতকাল শনিবার সকালে সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলনের মাধ্যমে আংশিক কমিটি গঠিত হয়। এই সম্মেলনের অনুষ্ঠানে আইভী ও শামীম ওসমাান একই সাথে একে অপরকে ইঙ্গিত দিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। দুজনে মঞ্চের দিকে বসলেও কেউ কারো দিকে তাকান নেই।
তাদের এই বক্তব্য নিয়ে খোদ দলীয় নেতা কর্মীরা বলাবলি করেন আজকে খেলা জমে উঠেছে। কেননা এক মঞ্চে বসে কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলেন নাই। তাই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে এক মঞ্চে বসলেও কারো সাথে কথা হলো না। তবে আইভী যেন সোনারগাঁয়ে শামীম ওসমানকে আবারও ছাপিয়ে গেলেন।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘নেতৃবৃন্দের কাছে অনরোধ থাকবে আজকের এই সম্মেলনের মাধ্যমে যারা ত্যাগী আছে তাদের যেন এই কমিটিতে স্থান দেয়া হয়। যাদের দুঃসময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন কাউকে যেন এই কমিটিতে দেওয়া না হয়।
অনেকের অনেক পয়সা হয়েছে; যারা দলের পরীক্ষিত ত্যাগী কর্মী তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য আমি অনুরোধ করবো। কোন পয়সার বিনিময়ে কেউ যেন কমিটিতে স্থান না পায়।’
মেয়র আইভী নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন প্রসঙ্গে বলেন, ‘সোনারগাঁয়ে কি ঘাটতি পড়েছে যার জন্য এই আসনটি বার বার জাতীয় পার্টির হাতে তুলে দিতে হবে। নারায়ণগঞ্জের পাঁচ আসন নিয়ে দীর্ঘ দিন যাবৎ ষড়যন্ত্র চলছে। সেখানে না হয় জোহা কাকার ছেলে (সেলিম ওসমান) আছে; জাতীয় পার্টি থেকে তাকে দিতে হবে। কিন্তু সোনারগাঁয়ে কেন জাতীয় পার্টিকে দিতে হবে?
আর এমন একজন ব্যক্তিকে দিয়েছে যার নাম নিশানা কোন কিছু ছিলনা। তাকে ডেকে এনে এখানে জাতীয় পার্টির সাংসদ বানানো হলো। এইখানে কি আওয়ামী লীগের লোকজন নেই। আমি নেতৃবৃন্দের কাছে দাবী জানাবো, এখানে নৌকা দিতে হবে, নৌকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যার হাতে নৌকা তুলে দিবে তিনিই হবেন নৌকার মাঝি। কিন্তু জাতীয় পার্টি এখানে মেনে নেওয়া যায়না ’
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘সোনারগাঁয়ে জাতীয় পার্টির এমপি থাকায় আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা এখানে মামলা খায়, নির্যাতিত হয়। এটা এখানে মেনে নেয়া যায়না। এখানে নৌকার এমপি না থাকায় দশ বছরে তারা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছে।’
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানকে ইঙ্গিত করে মেয়র আইভী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের কিছু নেতার কারণে সোনারগাঁয়ের স্থানীয় নেতারা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। নারায়ণগঞ্জে একজন বসে এখানে (সোনারগাঁয়ে) হস্তক্ষেপ করবেন, আমরা সেটা চাই না। সোনারগাঁয়ের নেতৃবৃন্দ এখানে নেতৃত্ব দিবে।
বিভিন্ন নামে স্লোগান দেয়া বন্ধ করুন, শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দেন। রাস্তায় রাস্তায় বিভিন্ন স্লোগান দেখলাম অমুক ভাই-তমুক ভাইয়ের নামে স্লোগান হচ্ছে। যদি শেখ হাসিনা না থাকে, সব ভাই ভেসে যাবেন। সবাই শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দিবেন।’ শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সোনারগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে অংশ নিয়ে একথা বলেন তিনি।
মেয়র আইভী আরো বলেন, ‘সোনারগাঁয়ে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তারা আওয়ামী লীগের ছিল। আমরা মোবারক সাহেবদের ভুলে যাইনি। তিনি রাজনীতি করেছেন আলী আহমদ চুনকার নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধু নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া মিউচুয়াল ক্লাবে আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়, যা পরবর্তীতে ঢাকা রোজ গার্ডেনে নামে আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী লীগের সকল স্তরের নেতাদের যেন কমিটিতে রাখা হয়। যাদের দুঃসময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি তারা নয় সবসময় যারা দলের পাশে ছিল তাদের ডেকে আনুন।’
অপরদিকে সাংসদ শামীম ওসমান মেয়র আইভীকে ইঙ্গিত দিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনার অবস্থান পরিষ্কার করার কথা বলেন। অবস্থান সবার পরিষ্কার করতে হবে। বিএনপি-জামাত আর ওই সুশীলধারী অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। আর নেত্রী কোথায়, কী করবেন তার সিদ্ধান্ত একমাত্র শেখ হাসিনার।
ক্ষমতায় এসেছি শেখ হাসিনার জন্য। শেখ হাসিনা কোথায় কোন সিদ্ধান্ত নিবেন এ ব্যাপারে কারো জিজ্ঞাসা করার ক্ষমতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের থাকার কথা না বলে আমি মনে করি; বড় কথা অনেকই বলতে পারবেন। কারা কতোবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, কোন পরিবারের সদস্য কয়বার গ্রেফতার হয়েছে সেটা দেখার বিষয় আছে।’
তবে আইভী-শামীমকে উদ্দেশ্য করে ঢাকা বিভাগীয় আওয়ামীলীগের সাধারণ সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেন, ‘মহাজোট গঠনের কারণে নেত্রীর নিদের্শে বিভিন্ন এলাকায় কিছু আসন আমাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে; সোনারগাঁয়েও তাই। এই সোনারগাঁয়ে কিন্তু নৌকাও ফেল করেছে সেই তথ্য আমাদের কাছে আছে।
তাই আমি বলব দলে নেতৃত্বে ভুল বুঝাবুঝি থাকতে পারে। আপনারা নৌকার দাবী জানিয়েছেন। আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং নেত্রীকে তা জানাবো। নেত্রী যাকে নৌকা দিবে আপনারা তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন। সকল মিলে মিশে দলকে সংগঠিত করবেন আমি এই প্রত্যাশা করি।’
এদিকে সবকিছু মিলিয়ে রাজনৈতিক মহলে আইভী-শামীম ওসমানের বক্তব্য নিয়ে ব্যপক আলোচনা তৈরী হয়েছে। দীর্ঘ দিন পর তারা এক মঞ্চে বসে একের অপরকে উদ্দেশ্য করে বক্তব্য রাখেন। যা নারায়গঞ্জের রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সব কিছু মিলিয়ে তারা দুজনেই ঐক্যের ডাক দিয়েছেন; সেই সাথে আগামী নির্বাচনেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহবান জানান দুজনে। কেন্দ্রীয় নেতারাও একই রকম দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলনে ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি সোনারগাঁ আওয়ামীলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. মো.আব্দুর রাজ্জাক।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক মৃনাল কান্তি দাস এমপি, কার্যকারী পরিষদের সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, আইন বিষয়ক সম্পাদক এড. নজিবুল্লাহ হিরু, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন, কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য এড. সানজিদা খানম, শাহাবুদ্দিন ফরাজী, আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ আব্দুল আউয়াল শামীম, সাঈদ খোকন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী এবং রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক।
আরও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবু নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল, যুগ্ম সম্পাদক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বিরুসহ প্রমুখ। এন.এইচ/জেসি


