ছুটছেন প্রার্থীরা, সিটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০৬ পিএম
# ৬১৫ ভোটের খেলায় আসতে পারে স্বতন্ত্র প্রার্থী
# এই সরকারের অধীন কোন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী দেবেনা : মামুন মাহমুদ
# কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্তুষ্ট আনোয়ার হোসেন, আশাবাদী মিজানুর রহমান বাচ্চু
চলতি বছরে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনেও। সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও ছায়া প্রার্থী হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা (বহিষ্কৃত) তৈমূর আলম খন্দকার অংশ নিয়েছিল। যদিও শেষতক প্রার্থী হওয়ার কারণে তাকে বিএনপির সকল পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়।
তবে সিটি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আওয়ামীলীগের স্থানীয় একটি বড় অংশ সহযোগিতা করেনি। উল্টো স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে নানাভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও ওই মহলটিকে হুঁশিয়ারি করে দেন। কিন্তু আওয়ামীলীগ ও বিএনপির দুই মহলের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে তৈমূর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
জেলা পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামীলীগের মনমতো মনোয়ন না পেলে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পথেই হাঁটতে পারে ওই মহলটি। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছেন।
জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবদুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল, সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান বাচ্চু, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বর্তমান জেলা পরিষদের প্রশাসক আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, সহ-সভাপতি বাবু চন্দনশীল আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণ চলবে আওয়ামী লীগের। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার জনপ্রনিধি মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ সভায় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। তবে আওয়ামীলীগের একটি অংশ সিটি নির্বাচনের মতোই এখন পর্যন্ত মনোনয়নপত্র কেনা প্রার্থীদের বাইরে গিয়ে আরো নিবিড় সম্পর্ক থাকা এক প্রার্থীর জন্য জেলা পরিষদে আওয়ামী লীগের টিকেট কাটার চেষ্টায় আছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।
সূত্র বলছে, ২০১৬ সালে ২২ ডিসেম্বর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের জন্য আওয়ামীলীগের প্রার্থী হতে দৌঁড়ঝাপ করেছিলেন মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হলেও আওয়ামীলীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনোয়ার হোসেনকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছিলেন এবং তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগ সভানেত্রীর সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিলনা তা কাজে কর্মে প্রমাণ করে দেখান আনোয়ার হোসেন।
জেলা পরিষদকে একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান ও সচল কার্যক্রমের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলায় তুলে ধরতে সক্ষম হন আনোয়ার হোসেন। তবে এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচনটি হচ্ছে একটু ভিন্ন পরিসরে। একদিকে যেমন ভোটের মাঠে লড়তে হবে; অপরদিকে আওয়ামীলীগের একটি ব্যাপক অংশেই জেলা পরিষদ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।
৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন তালিকার পরিমান আরো বাড়তে পারে। আওয়ামীলীগের প্রার্থী বাঁছাই হয়ে গেলেও জেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারে আওয়ামীলীগ থেকেই। কারণ হিসেবে সূত্র জানিয়েছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত কাউন্সিলররা যেমন ভোটার, তেমনি জেলার বিভিন্ন উপজেলার, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বাররা ভোট প্রদান করে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন।
আর সে হিসেবেই মনোনিত প্রার্থী না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারে আওয়ামীলীগের একটিই অংশ। সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনে এবার পুরো জেলায় ভোটার ৬১৫ জন। তাদের ভোটের ভিত্তিতেই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন।
সূত্র জানিয়েছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বিরোধীরা ভোটের হিসেবেই এগুচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর মূল ভিত্তি হচ্ছে ফতুল্লা, বন্দর ও সোনারগাঁ উপজেলায় আওয়ামী লীগের সেখানকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা চেয়ারমান, পৌরসভা মেয়র ও কাউন্সিলরদের আধিক্য ও আগ্রহ রয়েছে।
তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশেনের অধীন থাকা ভোটের একটি অংশও তারা পাবে বলে মনে করে সেই মহলটি। তাই মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়েই জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাঠে নামবে সেই মহলটি। সূত্র বলছে, দলীয় মনোনয়ন না পেলে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে লিপি ওসমানকেও যদি জেলা পরিষদের প্রার্থী হিসেবে দেখা যায় তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা।
এদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করা আনোয়ার হোসেন বেশ ফুরফুরে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে জেলা পরিষদের মাধ্যমে পুরো জেলায় অভূতপূর্ব বেশ কিছু কাজ করেছেন তিনি। জেলা পরিষদে আওয়ামীলীগের প্রাথী হিসেবে সাবেক প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই মনোনয়ন দৌঁড়ে গতবছর পর্যন্ত নাম আলোচনায় থাকলেও জেলা আওয়ামী লীগে কমিটি বাণিজ্য, দলীয় বিভেদকরণ, স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্বে দুর্বলতার কারণে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌঁড়ে ছিটকে গেছেন।
জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবদুল হাই বর্তমানে ইমেজ সংকটে রয়েছেন। যার ফলে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের গ্রীণ সিগন্যাল পাওয়ার দৌঁড়ে তাকে পেছনের কাতারেই রাখছেন খোদ আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা বলছেন, আবদুল হাইয়ের সকল কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয় নেতারা তো বটেই আওয়ামীলীগ সভানেত্রীরও দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের ইতিহাসে কোন সভাপতির বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ কেন্দ্রে জমা পড়েনি।
এদিকে মনোনয়নপত্র ইতিমধ্যে সংগ্রহ করেছেন বলে জানিয়েছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়োর হোসেন। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের দায়িত্ব নেয়ার পর আমি কি কি কাজ করেছি নারায়ণগঞ্জ জেলাবাসী তা জানে। আওয়ামীলীগ সভানেত্রীও বিষয়টি জানেন। আশা করি, মনোনয়ন পাবো এবং জেলা পরিষদের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে পারবো।’
জেলা আওয়ামীলীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চু যুগের চিন্তাকে জানান, আমি সোমবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে আওয়ামীলীগের মনোনয়নত্র সংগ্রহ করেছি। দল আমার সার্বিক কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আমি আশা করছি।
তবে, আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে মরিয়া হয়ে উঠলেও জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘আমার আগে থেকেই বলে আসছি, এই ফ্যাসিবাদী সরকারের অধীন কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনা। বিএনপি অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবেনা; কোন নির্বাচনেই নয়। তাই জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা।’ এন.এইচ/জেসি


