আনোয়ার-হাই মনোনয়নে পছন্দের তালিকাতেই ছিলেন না
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:০৩ পিএম
# দায়িত্ব থাকাকালীন নানা অনিয়মই কাল হলো তাদের
# দুইজনের নামেই কেন্দ্রে অভিযোগের পাহাড়
জেলা পরিষদ নির্বাচনে সাধারণত জেলার ক্লিন ইমেজের নেতাদেরই মূল্যায়ন করে মনোনয়ন দিয়ে থাকে আওয়ামীলীগ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০০১ সালে ১৬ জুন চাষাঢ়ায় বোমা হামলায় দুই পা হারানো ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহবায়ক ও মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বাবু চন্দন শীলকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যে আওয়ামীলীগে মূল্যায়ন করা হয় চন্দনশীল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ, এটা চন্দনশীলও নিজেও বলেছেন। জেলা পরিষদ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ ছিল জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই এবং জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রশাসক মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বৈরথ, দ্বিধাদ্বন্দ্বের চিত্রও লক্ষ করা গেছে। তাই স্বভাবতই তারা কেন জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দৌড়ে বাদ পড়লেন সেই আলোচনাও নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের মুখে মুখে।
যদিও জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বেশ আগে থেকেই জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ছিল অভিযোগের পাহাড়। জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হয়েই কমিটি বাণিজ্য, পদবাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা, তৃণমূলকে অবমূল্যায়ন, খামখেয়ালীপনাসহ হাজারো অভিযোগ উঠেছিলো তার বিরুদ্ধে।
বিশেষ করে জেলা আওয়ামীলীগের পদবাণিজ্য নিয়ে বেশ কয়েকজন মুখ খোলায় আওয়ামীলীগের আবদুল হাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা তলানীতে গিয়ে ঠেকে। তাছাড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক থাকাকালীন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়েও কথা বলেন একসময়ে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচিত শ্রমিকলীগ নেতা মতিউর রহমান আখন্দ।
তাছাড়া জেলা আওয়ামীলীগের পদবাণিজ্য নিয়েও এক শ্রমিকলীগ নেতা এবং সোনারগাঁয়ের আওয়ামীলীগ নেত্রী এড. নূর জাহান মুখ খোলেন। তাছাড়া জেলার সভাপতি হিসেবে উপজেলায় কমিটি নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি, কথায় কথায় আওয়ামী লীগের নেতাদের বহিঃষ্কার, কমিটিতে কোন্দল তৈরি, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে আবদুল হাই স্থানীয় আওয়ামীলীগেও নিন্দিত হয়ে পড়েন; এসকল তথ্য ছিল কেন্দ্রের কাছে।
অপরদিকে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনেয়ার হোসেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর জেলা পরিষদের অর্থায়নে অনেক উন্নয়ন কাজ করলেও জেলাব্যাপী এসব কাজ তার দুই ভাতিজাই করে বলে অভিযোগ উঠে; এনিয়ে চাপে পড়ে যান আনোয়ার হোসেন।
তাছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও মহানগর আওয়ামীলীগ কমিটিতে বিভক্তি, অনৈক্য এবং তা সামাল দিতে অপারগ হওয়া আনোয়ার হোসেনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এমনকি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার পরও জেলার উপজেলা এলাকার নেতৃবৃন্দের সাথেও সুসম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হন আনোয়ার হোসেন।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে জেলার পাঁচ উপজেলার জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে যেই সুসম্পর্ক থাকার কথা সেখানে ব্যর্থ হন আনোয়ার হোসেন। এদিকে মনোনয়ন পাওয়া চন্দন শীল ছিলেন তার তুলনায় ঢের এগিয়ে।
এছাড়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি হলেও আনোয়ার হোসেন ধীরে ধীরে কর্মী শূন্য হয়ে একাকী হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও কেন্দ্র টের পায়। সিটি নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে গেছে জানিয়েছে সূত্র।
এছাড়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীন আনোয়ার হোসেন সদস্যদের সাথে দুই ধরনের আচরণ করেছেন। অনুগতদের বেশী বাজেট দিয়েছেন অন্যদের দিয়েছেন কম। এ নিয়ে সদস্যরা একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। বাজেট নিয়ে গরমিল ছিল তার মনোনয়ন না পাবার অন্যতম কারণ।
এদিকে শুধু নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের সাবেক এই দুই প্রশাসককেই আওয়ামীলীগ মনোনয়ন দেয়নি তা নয়। আসন্ন ৬১ জেলা পরিষদ নির্বাচনে ২৭ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে এবার মনোনয়ন দেয়নি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। স্থানীয় দলীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় বেশির ভাগ জেলায় প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে।
ভালোভাবে দায়িত্ব পালন না করা, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগেও কয়েকটি জেলার চেয়ারম্যানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক সদস্য গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
মনোনয়ন বোর্ডের কয়েকজন সদস্য জানান, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, জয়পুরহাট, নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলায় দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার হিসাব-নিকাশকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে। একই নেতাকে বারবার মনোনয়ন দিলে তৃণমূলে দলের অভ্যন্তরে নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।
আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলে বহু নেতার অনেক অবদান রয়েছে। সবাইকেই কমবেশি মূল্যায়নের চেষ্টা করছেন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, মনোনয়ন বোর্ডে আলোচনার সময় দেখা গেছে যাঁরা গত মেয়াদে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন, তাঁদের অনেকে ভালো কাজ করতে পারেননি। অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জমা হয়েছে। এ কারণে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
মনোনয়ন বোর্ডের আরেক সদস্য আব্দুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, দলের জন্য ত্যাগের মনোভাব, দলের প্রতি আনুগত্য কেমন এসব বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় নেতাদের দেয়া বক্তব্যে সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে, দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং বিভেদ তৈরি এবং জেলা পরিষদের দায়িত্বে থাকাকালীন নানা অনিয়মের কারণেই অনেককে বাদ দেয়া হয়েছে। জেলা পরিষদের সাবেক দুই প্রশাসক আবদুল হাই ও আনোয়ার হোসেন যে সেই তালিকায় নাম থাকার দরুণ তারা বাদ পড়েছে তা নারায়ণগঞ্জবাসীর নিকট তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। এন.এইচ/জেসি


