Logo
Logo
×

রাজনীতি

রাজনীতি বা মনোনয়নে পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসছে কি, আ.লীগ ...?

Icon

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:৩৩ পিএম

রাজনীতি বা মনোনয়নে পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসছে কি, আ.লীগ ...?
Swapno


# না.গঞ্জে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে পারিবারিকরণ বাড়ছে না কমছে

 

দেশের নির্বাচনী রাজনীতির প্রায় সব স্তরে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব স্বাভাবিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সেটা ইউনিয়ন, কিংবা সংসদ নির্বাচন। এমনকি দলীয় সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও এটা দেখা যায় হরহামেশা। তবে বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটা সাধারণের চোখে পড়ে বেশি। এ নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও নানা সময়ে সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা গেছে।

 

 

 

বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে আরও বেশি। নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে উত্তর-দক্ষিন বলয়ে দুটি পরিবারের প্রভাব রয়েছে বলে জানান স্থানীয় নেতা কর্মীরা। এমনকি বিভিন্ন নির্বাচনেও তাদের প্রভাব রয়েছে। জানা যায়, সামসুজ্জোহা পরিবারের ছেলে এমপি শামীম ওসমানের অনুসারীদের উত্তর বলয় হিসেবে জানেন নগরবাসী তথা ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা।

 

 

 

তার বিপরীতে প্রয়াত পৌর চেয়ারম্যান আলী আহম্মদ চুনকার মেয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর অনুসারীদেরকে দক্ষিণ বলয় হিসেবে চেনেন সবাই। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে এই দুই বলয়ের প্রভাব রয়েছে, সেই সাথে তাদের পরিবারেরও। তবে এই পরিবারতন্ত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে মনোনয়ন পর্যন্ত বেরিয়ে আসছে ক্ষমতাসীন দল।

 

 


আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, ইদানিং রূপগঞ্জেও পরিবারতন্ত্র রাজনীতি গড়ে উঠছে। সেই সাথে ওই এলাকায় একাধিক পরিবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য ক্ষমাতসীন দলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার তৈরী করছেন। তারই প্রতিফলন দেখা যায় রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগ কমিটি গঠনে।

 

 

 

শহরের উত্তর দক্ষিণ মেরু দুই বলয়ের ভাইরে গিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী এবং রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি গোলাম দস্তগীর গাজীও ওই এলাকায় আওয়ামীলীগের কমিটিতে তাদের এক পরিবারের তিন জন সদস্যের নাম দেয়া হয়। মন্ত্রী গাজী রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও তারই ছেলে  ওই উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে গোলাম মর্তুজা গাজী পাপ্পা সহ সভাপতি পদ পান। একই সাথে মন্ত্রী গাজীর স্ত্রী হাসিনা গাজী ওই কমিটির সদস্য পদে পদায়িত হন। সেই সাথে তিনি তারাব পৌর সভার মেয়র হিসেবে আছেন।

 

 

 

তাদের সাথে তাল মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাইও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিতে পদায়ন শুরু করেছে। তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে বিতকির্ত হয়ে আছেন। তবে তিনি আগামীতে জেলা সভাপতি পদ থেকে বাদ পড়তে পারেন। তাই এবার তার ছেলে মো. তানভীর হাইকে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক পদে রাখা হয়েছে।

 

 

 

একই সাথে উপজেলা আওয়ামীলীগের প্রথম সদস্য পদটিও আব্দুল হাই দখল করে রেখেছে। যা নিয়ে রীতিমত রাজনৈতিক মহলে ব্যপক সমালোচনা হচ্ছে। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে পিছিয়ে নেই রূপগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূইয়া। তিনিও ইদানিং পারিবারিক রাজনৈতিক বলয়ে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছেন। তারই প্রতিফলন হিসেবে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম সোহেলকে এই উপজেলা আওয়ামীলীগ কমিটিতে যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক পদে রাখা হয়েছে। এ যেন এক পারিবারিক রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে এখানে।

 

 

 

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা মহানগর ছাত্রলীগ সাংসদ শামীম ওসমান ছেলে অয়ন ওসমানের অনুসারীদের দখলে। এখানে তারা অনুসারীরা এককভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তিনিও প্রভাব তৈরী করছেন বলে জানান দলীয় নেতা-কর্মীরা। তবে শামীম ওসমানের ছেলেকে রাজনীতিতে না জড়ানোর কথা এমপি নিজেই বেশ কয়েকবার বলেছেন।

 

 

 

এমনকি ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্ত্রী ও সন্তানের নাম আসলে সেটি তিনি সম্মানের সাথে প্রত্যাহার করার কথা বলেন। এদিকে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা একেএম শামসুজ্জোহার ছেলে সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ। সাংসদ হওয়ার পূর্বে তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেখান থেকে তার বড় ভাই নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে সাংসদ হন সেলিম ওসমান।

 

 

 

বর্তমানে জাপায় টালমাটাল অবস্থা, এমন অবস্থায় জোট থেকে বেরিয়ে গেলে সেলিম ওসমান একেএম সামসুজ্জোহার ছেলে হিসেবে এবং আওয়ামী পরিবারের সদস্য হিসেবেও একই আসনে মনোনয়ন চাইলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।

 

 


এদিকে এই রীতি দেশের প্রায় সব দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়ে উঠছে। বাবা এমপি হলে তার শূন্যস্থানে স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা এমপি হন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও সেই চিত্র দেখা গেছে। কিন্তু এই রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এর প্রতিফলন ঘটেছে বিগত উপনির্বাচনগুলোতে।

 

 

 

সর্বশেষ গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচনে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনকে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। সদ্য প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়ার এই আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তার মেয়ে। কিন্তু তিনি মনোনয়ন পাননি। সততা, যোগ্যতা, আদর্শ এবং এলাকার জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে দলকে ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনা নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, গাইবান্ধা তারই একটি বড় উদাহরণ।

 

 


আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, কিছু প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মনে করেন এমপির ছেলে এমপি হবে, এটা তাদের অধিকার। এসব মন্ত্রী-এমপির ধারণা ভুল প্রমাণ করে দলের গণতন্ত্র অনুযায়ী সবার এমপির হওয়ার অধিকার আছে, সেই ধারাই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে আওয়ামী লীগ। তার উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছেন ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়ার মৃত্যুতে শূন্য হওয়া গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনকে। তার মেয়ে ফুলছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারজানা রাব্বী বুবলীকে মনোনয়ন না দিয়ে আওয়ামী লীগ এমপিদের পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসার জোরালো অবস্থান নিচ্ছে।

 

 


এর আগে যে কয়টি উপনির্বাচন হয়েছে দুটি ছাড়া বাকি সব আসনে প্রয়াত এমপির পরিবারের বাইরে থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। করোনাকাল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের যেসব এমপি মারা গেছেন, সব কটি উপনির্বাচনে একই ধারা অনুসরণ করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। সর্বশেষ যে দুই ডজন উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এসব শূন্য আসনে দেওয়া বেশির ভাগ মনোনয়নই প্রয়াত এমপিদের পরিবারের বাইরে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের এক ধরনের রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে আসছে দলটি। এতে দলের প্রতি নেতা-কর্মীদের আস্থা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।

 

 


এ বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড শূন্য আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে এবার প্রচলিত অবস্থানের পরিবর্তন করেছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, দলকে গতিশীল করতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দলের জন্য তা ইতিবাচক।

 

 

 

শুধু দলীয় মনোনয়ন নয়, নেতা নির্বাচনেও রয়েছে এখন বাড়তি সতর্কতা। নতুন নেতা-কর্মীদের জায়গা করে দেওয়ায় দলের মধ্যে বিদ্রোহী কমবে। মনোনয়ন পেতে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং উড়ে এসে জুড়ে বসার বিষয়েও দলটি এখন সতর্ক। এর আগে ঢাকা মহানগরীতেও এমপিদের পরিবারের বাইরে এসেছে আওয়ামী লীগ। ঢাকা-৫ ও ১৮ শূন্য আসনে প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ও হাবিবুর রহমান মোল্লার পরিবারের কেউ মনোনয়ন পাননি।

 

 

 

জানা যায়, হাবিবুর রহমান মোল্লার আসনে মনোনয়ন পান যাত্রাবাড়ী থানা সভাপতি মনোরুল ইসলাম মনু এবং সাহারা খাতুনের আসনে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিব হাসান মনোনয়ন পান। সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ফারজানা চৌধুরী মনোনয়ন চান দলের।

 

 

 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমপি পরিবারের মনোনয়ন মেলেনি। মনোনয়ন পেয়েছেন প্রবাস ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান। ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আসলামুল হকের মৃত্যুর কারণে শূন্য আসনে মনোনয়ন চান তার স্ত্রী মাকসুদা হক। আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয় দলের থানা পর্যায়ের সভাপতি আগা খান মিন্টুকে।

 

 

 

কেবল দুটি আসনে পরিবারের সদস্যরা মনোনয়ন পেয়েছেন। সিরাজগঞ্জের একটি আসনে মোহাম্মদ নাসিম পুত্র তানভিরুল হক জয় এবং বগুড়ার আরেকটি আসনে দলের প্রয়াত নেতা আবদুল মান্নানের স্ত্রী মনোনয়ন পান।

 

 


অন্য আসনগুলোতে দলের মাঠ পর্যায়ের নেতা অথবা দীর্ঘদিন নির্বাচনী এলাকায় কাজ করা নেতাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এ রাজনৈতিক দলে এর আগে রীতি অনুযায়ী সব সময় দলীয় নেতাদের পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে অগ্রাধিকার দিত। নেতাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা মনোনয়ন এবং দলীয় পদ পেতেন। এমনকি সংসদে সংরক্ষিত আসনেও তাদের জন্য আলাদা কোটা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে দলটি।

 

 

 


স্থানীয় মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন পরিবার তন্ত্র থেকে বের হয়ে আসার জন্য বিভিন্ন সভা সমাবেশে নেতা-কর্মীদের আহবান জানিয়ে আসছে। কিন্তু কে শুনে কার কথা, নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমান অনুসারীরা তার সিদ্ধান্তের বাহিরে যান না। অপর দিকে মেয়র আইভী অনুসারীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। তবে এখানকার প্রবীন আওয়ামীলীগ নেতারা চান পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাজনীতি করুক।

 

 


আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় দলের যোগ্য ও ত্যাগীকেই মনোনয়ন দিয়ে থাকে। সব সময় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়। এমপির পরিবারের সদস্য হলেই তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে- আওয়ামী লীগ এই নীতিতে বিশ্বাসী নয়।’ এন.এইচ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন