# বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বাদ পড়তে পারেন হাই
# পদ বাণিজ্যকারীরা যেন পদে আসতে না পারে : দিপু
# অক্টোবরে সম্মেলনের তারিখ বর্ধিত সভায় নির্ধারণ
টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ। নারায়ণগঞ্জকে বলা হয় আওয়ামীলীগের সূতিকাগার। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দরাও তাদের বক্তব্যে বিভিন্ন সভায় তা বলে থাকেন। এই জেলায় ক্ষমতাসীন বলতে উত্তর দক্ষিন মেরুর অনুসারীদের বলয় বুঝায়। কেননা এখানে উত্তর মেরুতে সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারীরা আওয়ামীলীগের কমিটির একটি অংশ।
অপরদিকে তাদের বিপরীতে দক্ষিন মেরুতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর অনুসারীরা জেলা আওয়ামীলীগের বড় একটি অংশ রয়েছে। এখানে দুই মেরুর প্রভাবে দলীয় সাংগঠনিক শক্তিশালী করতে পারেন দায়িত্বরত নেতারা। জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সেই সাথে জেলা পর্যায় সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। করোনার কারনণ দীর্ঘ দিন ঝিমিয়ে থাকা নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে।
কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছর ডিসেম্বরে। তার আগে জেলা-উপজেলা সম্মেলন শেষ করতে চলছে সাংগঠনিক কর্মযজ্ঞ। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন মাসের ‘আলটিমেটাম’ দেওয়ার পর মাঠে তৎপর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ২২তম জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী তৃণমূলে সংগঠন গুছিয়ে আনার কাজ করছেন নেতারা।
ইতোমধ্যে ঢাকার নিকটতম জেলা গুলোতে সম্মেলন হয়ে গেছে। কিন্তু ঢাকার অতি নিকটতম জেলা নারায়ণগঞ্জের সম্মেলন নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে। এই সম্মেলন ঘিরে বর্তমান কমিটির পুরাতনরা চাচ্ছেন পদে থাকতে আর নতুন মুখে নেতৃত্ব চাচ্ছেন তৃণমূল।
তবে দলীয় সূত্রে জানা যায় পুরাতনরা তাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য সম্মেলনে পদ হারাতে যাচ্ছেন। তাই রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল মনে করেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটিতে নতুন মুখে আসছে। কিন্তু কারা আসছে তা এখনো নির্ধারণ হয় নাই।
এদিকে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের কয়েকটি জেলার সম্মেলন শেষ হয়েছে। সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি জেলার, উপজেলা-পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সম্মেলন হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজও চলছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, ডিসেম্বরের আগেই দলের মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
এরপর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে গড়ে তোলা হবে। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে ঢাকার সবচেয়ে নিকটতম জেলা নারায়গঞ্জ আওয়ামীলীগের সম্মেলনের তারিখ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দলীয় সূত্রমতে জানা যায়, আগামী মাসে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন হতে যাচ্ছে।
তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের ১ অক্টোবর বর্ধিত সভা ডাকা হায়েছে। সেখানে সম্মেলন সহ নানা বিষয়ে আলোচনা হবে। একই সাথে বতর্মান কমিটির সভাপতি সেক্রেটারি আমলনামা উঠে আসবে এই সভায়। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলা হতে পারে বলে জানান একাধিক নেতৃবৃন্দ।
তার মাঝে রয়েছে কমিটি বানিজ্য, স্থানীয় নির্বাচনে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একক প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানো। এছাড়া রূপগঞ্জের ক্ষমতাসীন দলের নারী নেত্রী ফেরদৌসি আলম নীলার কর্মকান্ডের কারণে তাকে বহিস্কার; আবার এক মন্ত্রীর চাপে পরে তাকে পদায়ন করা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদোত্তীর্ন হয়ে আছে প্রায় চার বছর হয়েছে। বিভক্তির মাঝে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে দলীয় কার্যক্রম। দলীয় গঠণতন্ত্র অনুয়ায়ী তিন বছর মেয়াদ থাকে আওয়ামী লীগের কমিটির। এই বছরের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর থেকে জেলায় আওয়ামীলীগের কমিটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরী হয়।
এবার সম্মেলনে যারা নেতৃত্বে আসতে চাচ্ছে তাদের নিয়ে চলছে ব্যপক আলোচনা। এছাড়া দীর্ঘ দিন যাবত জেলার ছয়টি শূন্য পদ পূরণের জন্য একাধিক বর্ধিত সভা হলেও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল হাইয়ের ব্যর্থতার কারনে তা পূর্ণ হয়নি বলে জানান একাধিক নেতৃবৃন্দ। ক্ষমতাসীন দলের জেলার এই সভাপতি তার ব্যর্থতার দায়ভার এড়িয়ে চলতে পারেন না।
জেলা আওয়ামীলীগে নেতৃত্বে আসতে যাচ্ছে তারা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অবস্থান তৈরীর পাশা পাশি আগে থেকে বলয় তৈরী করছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে গুঞ্জন উঠেছে এবার জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে নতুন মুখ হিসেবে যারা আসতে চায় তারা তাদের মত করে শীর্ষ পদে আসার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছে। ক্ষমতাসীন দলে জেলা মহানগরে এই দুই বলয়ের সমন্বয়ে কমিটি হয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন কমিটির নেতৃত্বে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ও জেলা আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান দিপু। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে তিনি ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। এবারের সম্মেলনে তার নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে।
এর আগে তিনি দক্ষতার সাথে জেলা আইনজীবি সমিতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদির, মিজানুর রহমান বাচ্চু, আরজু রহমান ভূইয়া, বর্তমান কমিটির সভাপতি আব্দুল হাই আবারও সভাপতি থাকার জন্য নানা ভাবে দৌড়ঝাঁপ করে যাচ্ছে। এদিকে আওয়ামীলীগের একটি অংশ নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম বলাবলি করছে।
অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আসার জন্য আলোচনায় রয়েছেন সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আড়াইহাজার নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবু, তার সাথে দলের কর্মঠ নেতা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক জাহাঙ্গীরও ক্ষমতাসীন দলের জেলার সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে চান। এছাড়া বর্তমান কমিটির জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলও আবার থাকার জন্য দলীয় নেতাদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
জানা যায়, বর্তমান কমিটির জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই এবং সেক্রেটারি আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলের বিরুদ্ধে গত ইউনিয়ন নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেই সাথে তাদের বিরুদ্ধে কমিটি বানিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। সোনারগাঁ উপজেলা কমিটি নিয়ে আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে স্বজন প্রীতি থেকে শুরু করে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেন খোদ দলীয় নেতৃবৃন্দ।
তিনি সোনারগাঁ কমিটি ঘোষণা দিতে গিয়ে লাঞ্চিত হন। সেই সাথে রোষানলে পড়ে দৌড়ে পালিয়ে আসতে হয় তাকে। তাছাড়া সোনারগাঁ উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একক ভাবে বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রার্থীদের নাম তার স্বাক্ষরে প্রস্তাব পাঠানো হয়।
জেলা আওয়ামীলীগের শুন্য কয়েকটি পদে পদ দেয়ার কথা বলে একাধিক নেতা থেকে টাকা খেয়েছে বলে অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। আবদুল হাইয়ের সাথে এখন গোগনগর ইউনিয়নে নৌকা পেয়ে বার বার ফেল করা ব্যক্তি জসিমকে দেখা যায়। সদর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আল মামুন অভিযোগ করে একটি সভায় বলেন, জসিম উদ্দিন হলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সহযোগি মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে।
যুদ্ধকালীন সময়ে জসিমের পিতা বঙ্গবন্ধু স্কুলে অস্ত্র রেখে পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করে। সেই পাকিস্তানী সহযোগীর ছেলে জসিমকে নিয়ে নানা কর্মকান্ডে বিতর্কিত আব্দুল হাই । তাই দলীয় অনেক নেতা বলাবলি করে এক বিতর্কিত ব্যক্তি আরেক বির্তকিত নিয়ে চলে। ধারণা করা হচ্ছে সামনে তিনি জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতির পদও হারাতে পারেন।
আর তা বুঝতে পেরে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে তিনি প্রথম সদস্য পদে রয়েছেন। সেই সাথে তার ছেলে তানভীর হাইকেও সেই কমিটিতে রেখেছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, ‘সেই লক্ষ্যে আমাদের কাজ চলছে। করোনা সংক্রমণ কমার পর আমরা পুরোদমে দলকে ঢেলে সাজানোর জন্য কাজ শুরু করেছি।’
একই বিষয়ে আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, ‘নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) তিন মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো সম্মেলনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা তিন মাস টার্গেট করেই কাজ করছি। এই সময়ের মধ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা সম্মেলন করব। এর মধ্য দিয়ে আমরা দলকে আরও সুসংগঠিত করে ঢেলে সাজাব।’
জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আব্দুল কাদির জানান, আমরা চাই জেলা আওয়ামী লীগে এখন নতুন নেতৃত্ব আসুক। যারা বর্তমান কমিটিতে আছে তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। সেই তাদের নেতৃত্বে যদি আবার বিতকির্ত কমিটি আসে তাহলে আগামী নির্বাচনে এর খেসারত দিতে হবে। তাই আমরা চাই ক্লিন ইমেঝের ব্যক্তিরা নতুন মুখ হিসেবে যারা আসতে চায়, তাদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠিত করা হোক।
জাতীয় পরিষদের সদস্য আনিসুর রহমান দিপু জানান, ‘আমরা চাই কর্মী-বান্ধব নেতা নেতৃত্বে আসুক। যারা দলের জন্য পরীক্ষিত ত্যাগী তারা দলের দায়িত্বে আসুক। কিন্তু যারা পদ বানিজ্য করে টাকার বিনিময়ে নিজের নৈতিকতাকে বিক্রি করে; হাই ব্রীড নেতাদের নাম কমিটিতে রাখে তারা যেন আসতে না পারে।
দলকে শক্তিশালী করার জন্য পরিচ্ছন্ন ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিলে দল এগিয়ে যাবে। সেই হিসেবে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে দায়িত্ব দিলে সারাদেশের থেকে নারায়ণগঞ্জকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করার জন্য কাজ করবো।’
জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ‘যখনি আওয়ামীলীগের সম্মেলন হবে তখনি আমি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক পদে প্রার্থী হিসেবে আছি। আমরা চাই স্বচ্ছ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে দলকে শক্তিশালী করা হোক। আমি এখনো বর্ধিত সভার চিঠি পাই নাই। কেননা বর্ধিত সভা হলে সভাপতি সেক্রেটারি আমাদের চিঠি দিবেন।’
জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদল জানান, ‘আগামী অক্টোবর মাসে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে দায়িত্ব দেন তাহলে আমি পালন করতে প্রস্তুত আছি। আর যদি না পাই তাহলে কর্মী হয়ে দলের জন্য কাজ করে যাবো।’
জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই জানান, ‘আগামী ১ অক্টোবর বর্ধিত সভায় সম্মেলনের বিষয়ে কথা হবে। তিনি আবারও সভাপতি পদে প্রার্থী হবেন কি না তা জানতে চাইলে, তিনি এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না; বলে জানান।’ এন.এইচ/জেসি


