# সভাপতির সাথে সম্পাদকের সমন্বয়হীনতায়ই চলে আ’লীগের কমিটিগুলো
# মহানগর বিএনপির পদ নিয়েও চলছে বিদ্রোহ, সমর্থন আদায়ের চেষ্টা
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন ভরা মৌসুম চলছে। বিশেষ করে অন্যতম বৃহৎ দুটি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে নেতৃত্বের দৌড়ে অনেকটাই সরগরম রাজনৈতিক অঙ্গন। সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসলে এমনিতেই রাজনৈতিক ময়দান গরম থাকে।
তার উপর দল দুটোর জেলা ও মহানগর কমিটিগুলো নিয়ে চলছে বিচার বিশ্লেষণ। একদিকে আগামী অক্টোবরে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার কথা। তাই কমিটিগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদসহ বিভিন্ন পদে নিজেদের অবস্থান পাকা করার জন্য যার যতটুকু সামর্থ্য আছে সে অনুযায়ী লবিং করে পদ বাগিয়ে নিতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমর্থনের চেষ্টা তদবীরে চালিয়ে যাচ্ছে দৌড়-ঝাঁপ।
অন্যদিকে দেশের আরেক বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির ঘোষিত জেলা ও মহানগর আহবায়ক কমিটির পদ পদবী নিয়েও চলছে চরম উত্তেজনা। সম্প্রতি মহানগর বিএনপি থেকে ১৫ জনের পদত্যাগের বিষয়ে কথা উঠার পর পদ নিয়ে এই উত্তেজনা আরও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়।
এই দুই কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিবসহ বিভিন্ন পদ নিয়ে চলছে রেষারেষি। প্রত্যেকেই তাদের চাহিদানুযায়ী পদ পেতে চালাচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদবীরসহ কর্মী সমর্থকদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা। সব মিলিয়ে পছন্দের পদে অধিষ্ঠিত হতে একদিকে যেমন চলছে দলীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা।
তেমনি উঠে আসছে নেতৃবৃন্দের ক্ষমতায় থাকাকালীন আমলনামা। আওয়ামী লীগের কমিটিগুলোতে পূর্বে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারাও তাদের পদগুলো ধরে রাখতে চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখছেন না। আবার বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে যারা পদ পেয়েছেন তারাও চেষ্টা করছেন তাদের পদটি ধরে রাখার জন্য।
তৃণমূলের বক্তব্য কেন্দ্র যাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন তারা তাদের হয়েই কাজ করবেন, কিন্তু কমিটিতে যদি তাদের মতামতের প্রকাশ ঘটে তাহলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে তাদের মানসিক মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আকরামকে আহ্বায়ক ও মফিজুল ইসলামকে (মরহুম) যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করার পর ২০১১ সালের সিটি কর্রপোরেশন নির্বাচনের পর অভিমান করে আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ান এসএম আকরাম।
এরপর যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুল ইসলামও বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেলে অনেকটা অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়ে জেলা আওয়ামী লীগ। এর প্রায় দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময় পর ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর আবদুল হাইকে সভাপতি, নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহসভাপতি এবং আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন সদস্যের জেলা আওয়ামী লীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
২০১৭ সালের ২৫ নভেম্বর একটি সহসভাপতি, দুটি সম্পাদক ও পাঁচটি সদস্য পদ খালি রেখে আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে থেকেই নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডসহ কমিটির সভাপতি এবং সম্পাদকের সমন্বয়হীনতার মধ্যদিয়ে এই কার্যকলাপ চলে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে।
২০১৫ সালের শেষের দিকে আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি এবং এডভোকেট খোকন সাহাকে সাধারণ সম্পাদক করে ঘোষণা করা হয় ৭১ সদস্য বিশিষ্ট মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি। এখানেও সভাপতি এবং সম্পাদকের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিল না বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
তবে অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কমিটির পুরোনো নেতৃবৃন্দসহ একাধিক পদ পেতে আগ্রহী নেতৃবৃন্দ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সভাপতি সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদের জন্য। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারিতে কাজী মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এরপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে চলে যায় আরও দুই বছর। ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্র। এই কমিটি গঠনের পর থেকেই নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণসহ সরকারি দলীয় নেতাদের সাথে গোপন সখ্যতার একাধিক অভিযোগ উঠে।
এরপর ২০২১ সালের ১ জানুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের তৎকালীন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে আহ্বায়ক এবং মামুন মাহমুদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেখানেও আসে নানা নাটকীয়তা। বিভক্তি ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে জেলা বিএনপি।
এরপর সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিএনপির সকল ধরণের পদ থেকে বহিস্কার করা হয় তৈমুর আলম খন্দকারকে। ভারপ্রাপ্ত আহবায়কের দায়িত্ব নেন সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবি। রাজনৈতিক কারণে তিনি আটক হলে গত ১৯ জানুয়ারি সেই দায়িত্ব নেন আরেক যুগ্ম আহবায়ক নাসিরউদ্দিন।
জেলার ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব নেয়ার পরেই তড়িঘড়ি করে জেলার ইউনিট কমিটি ঘোষণা করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন নাসির। এর কিছুদিন পর আবারও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়কের দায়িত্ব বুঝে নেন মনিরুল ইসলাম রবি। তবে এই আহবায়ক কমিটি নিয়েও চলে নানা বিতর্ক।
অনেকেই এই কমিটি ভেঙ্গে নতুন করে তাদের পদ দিয়ে কিংবা আরও উপরের পোস্টে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে দৌড়-ঝাঁপ চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এমনকি এই আহবায়ক কমিটি ভেঙ্গে আবারও নতুন করে আহবায়ক কমিটি গঠনের জন্যও নাকি চলছে চেষ্টা তদবীর। তবে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি তাহলো কাজী মনিরুজ্জামান, তৈমুর আলম খন্দকার কিংবা মনিরুল ইসলাম রবি কারও সাথেই তেমন একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে না মামুন মাহমুদের।
তবে দলের উচ্চ পর্যায়ে তার বেশ লবিং থাকায় নির্ভার থেকে যান তিনি।অন্যদিকে চলতি মাসের ১৩ সেপ্টেম্বর সাখাওয়াত হোসেন খানকে আহবায়ক এবং আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সদস্য সচিব করে গঠন করা হয় মহানগর বিএনপির ৪১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি। সেখানেও পদ নিয়ে চলে চরম উত্তেজনা। এক সপ্তাহ না পেরুতেই কমিটি থেকে ১৫ জন পদত্যাগ করে বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, পদ নিয়ে বিভক্ত দুই গ্রুপের মধ্যে চলে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়।
এখানেও পদায়ন নিয়ে এখন দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে চলছে দৌড়-ঝাঁপের খেলা। তবে জেলা ও মহানগর বিএনপির নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতা জানান, এই দুই কমিটিতে চলছে এখন মাইনাস করার রাজনীতি। কে কাকে মাইনাস করবে, সেজন্য দলের সর্বোচ্চ ফোরামে নেতারা চেষ্টা তদবীর চালাচ্ছেন তাদের সাধ্য অনুযায়ী। এন.এইচ/জেসি


