ভূরিভোজ করিয়ে চাপ সামলানোর চেষ্টা শামীম ওসমানের
অর্ণব হাসান
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৩২ পিএম
# সিংহাম খ্যাত এসপি হারুন এর সময় থেকে কোণঠাসা তার কর্মীরা
# সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে ভেঙে দেওয়া হয় তার অনুগত বেশ কয়েকটি কমিটি
২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যুতে মেয়র আইভীর উপর হামলার ঘটনা ঘটে। তখন নারায়ণগঞ্জের এসপি ছিল মঈনুল হক। এরপর মাঝে এক এসপি বদলের পর নির্বাচনের আগ মুহুর্ত্বে এসপি হিসেবে আসেন বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ডিআইজি হারুন অর রশীদ। নারায়ণগঞ্জেই মূলত সিংহাম নামে খ্যাত হন তিনি।
নির্বাচনের পর এসপি হারুন নানা বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে আলোড়ন তৈরি করেন। এরমধ্যে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শামীম ওসমানের অনুসারীরা। শামীম ওসমানের শীর্ষ বেশ কয়েক নেতাসহ অনেকেই তখন এলাকাছাড়া ছিলেন। বেশ কয়েকজন নানা অপরাধে গ্রেফতারও হন।
কোণঠাসা হয়ে পড়েন শামীম ওসমান অনুসারীরা। এসপি হারুনের বিদায়ের পর কিছুটা স্বস্তি; শামীম শিবিরে ফিরলেও আগের জৌলুস অনেকটাই কমে যায়। এই বছরের শুরু থেকে নারায়ণগঞ্জ প্রভাবশালী নেতা ও সাংসদ শামীম ওসমান অনেকটা চাপে সময় কাটিয়েছেন বলে আলোচনা চলে রাজনৈতিক বোদ্ধামহলে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে শুরু এই আলোচনা। যা জেলা পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন পর্যন্ত ফলাওভাবে চলে। নারায়ণগঞ্জর আওয়ামী লীগ মানে উত্তর দক্ষিণের দুই নেতা নেত্রীর নাম। ক্ষমতাসীন দলে তাদের প্রভাবও রয়েছে। সেটা হোক নির্বাচন বা দলীয় কমিটি গঠনে।
উত্তর বলয়ের নেতারা শামীম ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তার বিপরীতে মেয়র আইভী বলয়ের নেতাদের বলে থাকেন দক্ষিনের নেত্রীর অনুসারী। দলীয় নেতাদের মাঝে আলোচনা রয়েছে নাসিক নির্বাচনে মেয়র আইভী যেন নৌকা না পায় তার জন্য হিন্দু সম্প্রদায় থেকে শুরু করে হেফাজত নেতাদের দিয়ে আইভীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হয়।
এমনি গত বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গা পূজায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপে আইভীর বিরুদ্ধে ভুমিদস্যুতা লেখে ব্যানার টানানো হয়। সর্ব শেষ নাসিক নির্বাচনে আইভীর নাম পর্যন্ত পাঠানো হয় নাই।
শহরের দেওভোগ জিউস পুকুর নিয়ে আইভীর বিরুদ্ধে জায়গা দখলের অভিযোগ তুলে চাষাঢ়া শহীদ মিনারে একাধিক সভা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে এই সব কিছুর পিছনে কলকাটি নেড়েছেন নারায়ণগঞ্জের একজন প্রভাবশালী সাংসদ। এই বছরে শুরুতে জানুয়ারি মাসে নাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, নাসিক নির্বাচনে শামীম ওসমানের অনুসারীরা নৌকার পক্ষে কাজ না করায় এখানকার ক্ষমতাসীন দলের অনেক সহযোগি সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তন্মধ্যে জেলা মহানগর সেচ্ছাসেবক লীগ কমিটি, মহানগর শ্রমিক লীগ, মহানগর ছাত্রলীগ কমিটি অন্যতম।
এই সবকটি কমিটিতে একক আধিপত্য বিস্তার করে গেছে শামীম ওসমান অনুসারীরা। কমিটিতে এই সাংসদের বলয়ের নেতারা না থাকায় তিনি অনেকটা চাপে ছিলেন; যা এখানো আছে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে এমপি শামীম ওসমানের বন্ধু ও মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বাবু চন্দন শীল দলীয় মনোনয়ন পান।
শামীম ওসমান অনুসারীদের বক্তব্য হলো এই সাংসদের কারিশমায় চন্দন শীল জেলা পরিষদেন মনোনয়ন পান। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে হঠাৎ করে গতকাল সন্ধ্যায় ভূড়িভোজ করে সেই চাপ কমানোর চেষ্টা হয়।
জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিরাট আকাড়ে নারায়ণগঞ্জ পৌর ওসমানী স্টোডিয়ামে ৪ থেকে ৫ হাজার লোকের ভূড়িভোজের আয়োজন করা হয়। দেখা যায় অনুষ্ঠানের মঞ্চে এমপি শামীম ওসমানের ডান পাশে বসা ছিলেন সদ্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বাবু চন্দন শীল।
তার বাম পাশে বসে ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহা। অনুষ্ঠানের ব্যানারে লেখা ছিল সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও দলের তৃনমূল নেতা কর্মীদের সংবর্ধনা। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান নিয়ে রয়েছে নেতা-কর্মীদের নানা সমালোচনা।
পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে কাউকে সংবর্ধনা দেয়াতো দূরের থাক; কাউকে তেমন ভাবে সম্মানিত পর্যন্ত করা হয় নাই। তাই রাজনৈতিক মহলের অনেকে এটা তার চাপ কামনোর কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন চন্দন শীল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় এটা তার ক্রেডিট তা বুঝিয়েছেন।
শামীম ওসমান অনুসারীরা বলেন, এই সাংসদের কারিশমায় চন্দন শীল নৌকা পেয়ে বিনা ভোটে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা গান গেয়ে মঞ্চমাতিয়ে একটা ব্যতিক্রম ধর্মী বিনোদন সময় কাটিয়েছেন কালকের এই ভূরিভোজ অনুষ্ঠানে। সেই সাথে নেতা কর্মীরা পোলাও মুরগি খেয়ে খুশি হয়ে বাড়িতে যান। অভিযোগ রয়েছে কেউ কেউ না খেয়েও চলে যান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখাযায়, পুরো অনুষ্ঠানে এমপি শামীম ওসমান ২৬ মিনিট বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যে নেতা-কর্মীরা নতুন কোন মেসেজ পান নাই। এমপি গত মাসের ২৭ আগষ্ট বিশাল সমাবেশে যা বলেছে, আজকেও তাই বলেছে। কিন্তু আজকে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলার কথা থাকলেও এই বিষয়ে কিছুই বলা হয় নাই।
এছাড়া নেতা কর্মীরা ভেবেছিলেন জেলা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে তিনি কথা বলবেন। কিন্তু তা নিয়েও কিছু বলা হয়নি। তবে বিএনপিকে মোকাবেলার জন্য সকলকে প্রস্তুত থাকার আহবান জানান তিনি।
শামীম ওসমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘দেশকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তা মোকাবেলা করতে কর্মীদের প্রস্তত থাকার আহবান রেখেছেন এমপি শামীম ওসমান। তিনি বলেছেন, দেশে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এছাড়া আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জকে টার্গেট করা হচ্ছে। তাই নারায়ণগঞ্জেও নানা ধরনের খেলা হবে। আপনাদের কাছে অনুরোধ এ জায়গাগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে; আমরা মোকাবিলা করব।
শামীম ওসমান বলেন,আজকের এ আয়োজন আমাদের কর্মীদের জন্য। তাদের সম্মানিত করা। আগামী ২৩ তারিখ জেলা ও ২৫ তারিখ মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। ইতোমধ্যে আমি কেন্দ্রীয় নেতাদের বলেছি এখনো বলছি ত্যাগীদের মূল্যায়ন করুন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত যারা আওয়ামী লীগার তাদের মূল্যায়ন করুন। মূল্যায়ন মানে শুধুই পদ পদবি বা টাকা নয়, সম্মান দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যে কর্মীদের মূল্যায়ন করেন, পছন্দ করেন, ভালোবাসেন সেটা তিনি বার বার উদহারণ দেখিয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় প্রমান চন্দন শীল। তার দুই পা নেই, বোমা হামলায় পঙ্গু হয়েছে। শেখ হাসিনা তাকেই জেলা পরিষদের মনোনয়ন দিয়েছেন। এই মনোনয়ন তৃণমূলের সকল ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মনোনয়ন।’
শামীম ওসমান বলেন, ‘আমাদের দেশ বাঁচানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কারে ভয় দেখান আমরা কাউকে ভয় পাই না। আমরা রাজপথে ছিলাম রাজপথে আছি এবং থাকবো। আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়; কি কারনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এই সেদিন আমাদের সেনাবাহিনীর তিনজন সৈনিক শহীদ হয়েছেন।’
তিনি মেয়র আইভী বলয়ের নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি আজকের অনুষ্ঠানের জন্য সকল নেতাদের দাওয়াত করেছি। কিন্তু অনেকে এখানে আসেন নাই। কিন্তু কেন আসেন নাই, তা আমি জানিনা। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি বাদলের মা অসুস্থ্য থাকায় সে আসতে পারে নাই। কিন্ত বাকিরা কেন আসলো না আমি তা জানিনা। আমি সকলকে থাকার জন্য দাওয়াত দিয়েছি।
এদিকে মেয়র আইভী বলয়ের নেতারা তার এই অনুষ্ঠানে যান নাই। এমনকি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনও এই অনুষ্ঠানে ছিলেন না।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এড খোকন সাহা, সিনিয়র সহ সভাপতি বাবু চন্দন শীল, যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাবেক সহ সভাপতি রবিউল হোসেন, বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান ও সভাপতি এম এ রশিদ, সাধারণ সম্পাদক কাজিম উদ্দিন, সোনারগাঁ উপজেলা চেয়ারম্যান সামসুল ইসলাম ভূইয়া।
সোনারগাঁ ৩ আসনের সাবেক সাংসদ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কায়সার হাসনাত, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, সদর থানা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এসটি আলমগীর সরকার, সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি এহসানুল হাসান নিপু, সাফায়াত আলম সানি সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এন.এইচ/জেসি


