# দুই বছর আগেই দুজনেই ফাইল পাঠান
# রূপগঞ্জ-আড়াইহাজারে সভাপতি দুই সাংসদ
টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। তবে প্রায় এক যুগের বেশি ক্ষমতায় থেকেও কোনো এক রহস্যময় কারণে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে নাই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। তবে না হওয়ার পিছনে রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করেন, প্রথমত: হচ্ছে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে তৃনমূলে দীর্ঘ দিন কমিটি না থাকা এবং দ্বিতীয়ত: দলীয় কোন্দল নিরসন না হওয়া।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে দলীয় কোন্দলে উত্তর দক্ষিন মেরুর, ক্ষমতাসীন দলে প্রভাব থাকা। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই মেরুর প্রভাব বিস্তারের কারণে দলের কমিটি গুলোতে জটিলতা তৈরী হয়ে থাকে। একই সাথে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি না হওয়ায়, নতুন নেতৃত্ব তৈরীতে বাধার সৃষ্টি হয়েছে।
তাছাড়া বর্তমান কমিটিতে যারা আছেন তাদের বিরুদ্ধেও কমিটি বাণিজ্য, স্থানীয় নির্বাচনে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ কমিটি নব উদ্যোমে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনতে কেন্দ্রে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কারা নতুন করে নেতৃত্বে আসছে তা নিয়ে চলছে জল্পনা কল্পনা। তবে বর্তমান কমিটির ব্যক্তিরা বাদ পড়তে পারে বলে ফলাও করে আলোচনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিনক্ষণ নির্ধারণ হয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, আগামী ২৩ অক্টোবর শহরের ওসমানী পৌর স্টোডিয়ামে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সম্মেলনকে সফল করার লক্ষ্যে বর্ধিত সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেই সাথে কয়টি গেইট হবে গতকাল শুক্রবার ওয়ার্কিং কমিটিতে তা নির্ধারণ করা হয়। তবে ওয়ার্কিং সভাটি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে হলেও জেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ এখানে ওয়ার্কিং সভা হোক, তা চাননি। না চাওয়ার পরেও শামীম ওসমান পন্থিদের জোরাজোরিতে সেখানেই ওয়ার্কিং সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নির্ধারিত দিনেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনকে ঘিরে সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে সম্মেলনের স্থান পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ টি গেইট হবে বলে জানান খোদ দলীয় একাধিক সূত্র।
সাইনবোর্ড মোড়ে গেইট হবে, চাষাড়া, ওসমানী স্টোডিয়ামের প্রবেশ মুখে, তাছাড়া জালকুড়ি মোড়সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গেইট বসানো হবে। প্রতিটি গেইটের সামনে বঙ্গবন্ধুর ছবি এক পাশে থাকবে; অপর পাশে থাকবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টানানো ফেস্টুন ব্যানার।
অন্যদিকে এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানও আলোচনায় রয়েছে বলে জানান একাধিক নেতৃবৃন্দ। তবে গুঞ্জন উঠেছে তার বিপরীতে মেয়র আইভীও এবার ছাড় না দিয়ে সভাপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন।
কেন্দ্রীয় একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানান, গত বছর দুয়েক আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ চেয়ে জেলার উত্তর বলয়ের প্রভাবশালী নেতা এবং সাংসদ শামীম ওসমান একটি ফাইল পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। তখন ওই ফাইলে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ চেয়েছেন।
কিন্তু তার বিপরীতে জেলার ক্ষমতাসীন দলের দক্ষিন বলয়ের নেত্রী ও নাসিক মেয়র আইভী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে একটি ফাইল পাঠান। কিন্তু তখন তাদের কাউকে এই ফাইলে কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হয় নাই। তাই এখন দলীয় নেতাদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে তারা তারা দুজন আগে থেকেই সভাপতি পদে আগ্রহী হয়েছেন।
কিন্তু নব্বই দশকে যখন নাজমা রহমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তখন শামীম ওসমান সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। নাসিক মেয়র আইভী বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তাই তাদের দুজনকে নিয়েও দলে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা যাকে দায়িত্ব দিবেন তাকেই তারা মেনে নিবেন।
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের অধীনে রূপগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে রয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী সেখানকার তথা নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রূপগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদটি দখল করে নেন গোলাম দস্তগীর গাজী।
সেই সাথে গত ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সহ-সভাপতি হিসেবে জায়গা করে দিয়েছেন তার ছেলে গাজী গোলাম মর্তুজা পাপ্পাকে। তিনি একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি আবার তার এলাকার আওয়ামী লীগের পদটিও তার দখলে রেখেছেন।
একই সাথে আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট তথা নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু। ২০১৯ সালের ২২ জুলাই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি এই সভাপতি পদে জায়গা করে নেন।
সেই সাথে ২০২১ জানুয়ারিতে ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও তার অনুসারিদের জায়গা করে দিয়েছেন। টানা তিন মেয়াদ ধরে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি থানা উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদটিও তার দখলে রেখেছেন।
পাাশপাশি সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে জায়গা করে নিয়েছেন সেখানকার নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত।
গত ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে জায়গা করে নিয়েছেন। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারপরেও তিনি তার এলাকার শীর্ষ পদে রয়েছেন।
বিপরীতে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের কোনো পদেই নেই এখানকার তথা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তবে নব্বই দশকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তবে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগে সভাপতি হিসেবে রয়েছেন এম সাইফউল্লাহ বাদল এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন শওকত আলী। তারাও শামীম ওসমানের অনুসারী।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর আবদুল হাইকে সভাপতি, সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহ-সভাপতি এবং আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট জেলা আওয়ামী লীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র।
এর ১৩ মাস পর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ৭৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। এই কমিটি সভাপতি আব্দুল হাই এবং ভিপি বাদলকে নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা।
তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেয়া থেকে শুরু করে কমিটি বানিজ্য, মনোনয়ন বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে। একই সাথে তিনি নানা কর্মকান্ডে বিতর্কিত হয়ে আছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার থেকেই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল একের পর এক নানা ঘটনায় বিতর্কিত হতে থাকেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাদেরকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
সবশেষ জেলা আওয়ামী লীগের অধীনে থাকা বিভিন্ন থানা উপজেলা কমিটি গঠনেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল তৃণমূলের মন জয় করতে পারেনি। তারা তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা দেখাতে পারেনি। সবসময় প্রভাবশালী নেতাদের মতামতের উপরই নির্ভর করতে হয়েছে।
তাই রাজনৈতিক বোদ্ধামহলে আলোচনা হচ্ছে এবার ক্ষমতাসীন দলের উত্তর দক্ষিণ বলয় নিয়ে কমিটি হতে পারে। তাই এই দুই বলয়ের শীর্ষ পযায়ের নেতারা আসতে পারে তা নিয়েও দলীয় নেতাদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে।
সব কিছুর অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে এলো বলে, উত্তর মিলবে অনেক জানা-অজানা কথার। কেননা এই সম্মেলনেই জেলা কমিটির দায়িত্বে কারা আসবে; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাদের হাতে তুলে দিবেন আগামী দিনে নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব তা নির্ধারণ হবে; আগামী ২৩ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মাধ্যমে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা নিরন্তর....... এন.এইচ/জেসি


