পদ-মন্ত্রিত্ব দূরে ঠেলে দৌড়ঝাঁপ শামীম ওসমানের
রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২, ০৩:২৯ পিএম
# চাপে পরে দেশও ছেড়েছেন তিনি
# নব্বই দশকে সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন
নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ মানে সাংসদ শামীম ওসমান এবং সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে বুঝে থাকেন দলীয় নেতারা। সেই অনুযায়ী দলের মাঝে তাদের প্রভাবও রয়েছে। সেটা হোক দলীয় কমিটি বিষয় বা স্থানীয় নির্বাচনে।
সব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের মাঝে তাদের প্রভাব রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের জেলার উত্তর দক্ষিণ মেরুর চাপাচাপি বা প্রভাব বিস্তারের কারনে অন্যান্য নেতারাও এখানে বলয় তৈরী করতে চাইলেও তা পারছেন না। ঘুরে ফিরে তাদের কাছেই ধর্ণা দিতে হয়।
আর এজন্য অন্যান্য নেতাদের মাঝে একটা নিরব ক্ষোভ রয়েছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে নেতা কর্মীদের মাঝে ব্যপক আলোচনা তৈরী হয়েছে। আগামীয় ২৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এই সম্মেলন ঘিরে পদপ্রত্যাশী নেতারা নিজেদের মত করে দৌরঝাপ করে যাচ্ছেন। এই দৌরঝাপ নেতাদের মাঝে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপিরাও রয়েছে বলে জানান দলীয় একাধিক সূত্র।
দলের মাঝে আলোচনা হচ্ছে জেলার উত্তর বলয়ের নেতা কর্মীদের অনুসারী সাংসদ শামীম ওসমানকে এবার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেখতে চানা তৃণমূল আওয়ামী লীগ।
কিন্তু দলীয় বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, দুই বছর আগে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ চেয়ে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবার গনভববে দুই মেরু থেকে দুটি ফাইল যায়।
তার মাঝে উত্তর মেরুর প্রভাবশালী নেতা ও ৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান সভাপতি পদ চেয়ে একটি ফাইল পাঠান। তার বিপরীতে দক্ষিনের নেত্রী ও নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীও সভাপতি পদ চেয়ে একটি ফ্ইাল পাঠান।
তবে তাদের অনুসারীরা চাইলেও কিন্তু দল থেকে কাদের দেয়া হবে তা সমে¥লনের আখ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছে না কর্মীরা। তবে নেত্রী যাদেরকে দিবে তাদেরকেই মেনে নিতে হবে সকলকে।
অন্যদিকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে সাংসদ শামীম ওসমান আলোচনায় থাকেন। তবে তা পজিটিভের চেয়ে নেগেটিব আলোচনা হয়। আবার বিভিন্ন সময় চাপেও সময় কাটান। তখন নারায়ণগঞ্জেও কম আসেন।
দলীয় সূত্রে জানায়, নাজমা রহমান সভাপতি থাকালে তখন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন শামীম ওসমান। পরে ১৯৯৬ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
সেসময় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন দিয়েছিলেন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালিন সভাপতি সিদ্ধিরগঞ্জের মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনকে। পরে অজানা কারনে তা বদল করে শামীম ওসমানকে দেয়া হয়।
তখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর দেশের সবচেয়ে আলোচিতদের মধ্যে ছিলেন শামীম ওসমান। প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে, নারায়ণগঞ্জের কয়েকশ’ বছরের কলঙ্ক টানবাজার পতিতাপল্লী উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন করে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি।
তখন তিনি একটি আসনের এমপি হয়েও জেলার অন্য ৪টি আসন শাসন করতেন। তার একেক অনুসারী ছিলেন একেক পাড়া মহল্লার কর্তা। যা বর্তমানে আছে। গোটা ৫ বছর দাপিয়ে বেড়ানোর পর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করার পর শামীম ওসমান সহ তার অনুগতরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রবাসে অবস্থান করেন।
তখন নারায়গঞ্জের ৪ আসন বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিনের সাথে পরাজিত হন শামীম ওসমান। পরবর্তিতে ওয়ান ইলেভেনের পর ৯ম সংসদ নির্বাচনে বিদেশে থাকা শামীম ওসমানকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ।
এই ৪ আসনে থেকে ২০০৮ সনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৯ সনে শামীম ওসমান দেশে ফিরেন। তখন কখনও তৎকালিন এমপি সারাহ বেগম কবরী, কখনও সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পরেন তিনি।
এই দুজনের সাথে লড়তে গিয়ে তিনি অনেকটা চাপে পরে যান। ওই সময়ে কেউ কেউ মনে করতো, শামীম ওসমানের রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে। এই চাপ থেকে বের হওয়ার জন তিনি ২০১১ সনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমান দলীয় সমর্থন নিয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হন।
২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আইভীর কাছে লক্ষাধিক ভোটে হারার পর রাজনীতি অঙ্গনে তার পতনের কথাই বেশী শোনা যেতো। সেই সাথে তার ইমেঝ সংকটে পরে।
এই সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য ২০১৪ সালে ১০ম সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ ৪ থেকে শামীম ওসমানকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ায় সব ধারণা পাল্টে দেয়। সেই থেকে নানা বাধা বিপত্তি ওসমান পরিবারের আধিপত্য নতুন রূপ নেয়।
পরে কয়েক বছর ভালো সময় কাটালেও সেই ভালো সময়ে চাপ ফেলে দেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি হারুন। বর্তমানে তিনি ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ডিবির প্রধান হিসেবে আছেন। জানা যায়, এই এসপি হারুন ২০১৮ জাতীয় একাদশ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জে যোগদান করেন।
নির্বাচনের পরে তিনি চাদাঁবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদককারবারি বিরদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেন। সেই সাথে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে প্রভাবশালী লোকদের গ্রেপ্তার করেন। তখন এই সাংসদ শামীম ওসমানসহ তারা অনুসারীরা চাপে পরে যান।
অভিযোগ রয়েছে কয়েকজজনকে ছাড়িয়ে আনার জন্য এই সাংসদ এসপি অফিসে ছুটে গেলেও তার কথায় কোন কাজ হয় নাই। তখন তিনি সহ তার অনুসারীরা নারায়ণগঞ্জে আসাও কমিয়ে দেয়। তখন শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীরা চাপে সময় পার করেন।
এই চাপ ছুটানোর জন্য তিনি শহর ব্লক করে একাধিক সমাবেশ করেন। তার পরেও চাপ কমাতে পারেন নাই। পরে এসপি হারুন বদলি হয়ে নারায়ণগঞ্জের এসপি হন জায়েদুল আলম। এই চাপ কাটতে না কাটতেই এই বছরের শুরুতে ২০২২ জানুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নাসিক নির্বাচনে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী যেন মনোনয়ন না পায় তার জন্য সবধরনের চেষ্টা করে উত্তর বলয়ের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান। এমনকি তিনি যেন আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা মনোনয়ন না পায় তার জন্য মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবোত্তর সম্পত্তি দখলে অভিযোগ এনে একাধিকবার সমাবেশ করা হয়।
সেই সাথে হেফাজত নেতাদের দিয়ে মসজিদের জায়গা দখলের অভিযোগ তুলা হয়। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবী করেন মেয়র আইভী। নাসিক নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী তখন মেয়র আইভী অভিযোগ তুলেন তার বিপক্ষে নারায়ণগঞ্জের গডফাদারের সেল্টারে বিএনপি নেতা তৈমূর আলম প্রার্থী হন।
তখন দলীয় নেতারা অভিযোগ তুলেন নৌকার প্রার্থীর পক্ষে শামীম ওসমান অনুসারীরা কাজ করে নাই। তখন নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের সহযোগি সংগঠনের একাধিক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এই কমিটি গুলো নাসিক নির্বাচনের সময় বিলুপ্ত হয়।
তার মাঝে নির্বাচনের দিন জেলা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তার পরের দিন অর্থাৎ মহানগর শ্রমিক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তার আগে মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া মহানগর কৃষক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
আর এই সকল কমিটিতে বেশির ভাগ নেতা ছিলেন শামীম ওসমানের অনুসারী। রাজনৈতিক বোদ্ধামহলের মতে তখন থেকে আবার এই সাংসদ শামীম ওসমান চাপে পরে যান। এই চাপ ছুটানোর জন্য তিনি জেলা পরিষদ নির্বাচনে তার বন্ধু চন্দন শীলকে নৌকা প্রতীক এনেদেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
তখনর কিছুটা চাপ কমলেও এবার তার নজর পরেছে জেলা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে। তাছাড়া জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি পদে এই সাংসদের আসা নিয়ে শহর জুরে আলোচনা চলছে। তার অনেক অনুসারী তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেখতে চান এমন লেকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়েন।
বিভিন্ন সভা সামাবেশে বক্তব্য কালে এমপি শামীম ওসমান বলেছেন, আমি কোন পদ পদবী চাই না। আমরা দলেল কর্মী হয়ে থাকতে চাই। আমাকে মন্ত্রীত্ব দিতে চেয়েছিল কিন্তু আমি নেই নাই। তবে দলীয় নেতাদের মাঝে গুঞ্জন উঠেছে পদ পদবী না চাওয়া এ্ই শামীম ওসমান এখন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার জন্য দৌরঝাপ করছেন।
এককি বিশ্বস্ত সূত্রে জানাযায় দুই বছর আগে থেকে সভাপতি পদ চেয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বরাবর গনভবনে ফাইল পাঠন। কিন্তু সেই ফাইল নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে তাহলে কি চাপ কমানোর জন্য এবং জেলার নিয়ন্ত্রনের জন্য তিনি এবার আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আসতে চাচ্ছেন। তাহলে কি জেলা আওয়ামী লীগ এবার আবার তার নিয়ন্ত্রনে চলে যাবে এমন প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক বিষেøশকদের মাঝে।
সচেতন মহল মনে করেন তিনি যদি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন ক্ষমতাসীন দল আবারও তার নিয়ন্ত্রনে চলে যাবে। কিন্তু দক্ষিন বলয়ের নেতা কর্মীরাও ছেড়ে দিবে না। তবে সব কিছু ক্লিয়ার হয়ে যাবে আগামী ২৩ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিন। ওই দিন জানা যাবে কে আসছে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। এন.এইচ/জেসি


