# অবহেলাই পারভীন ওসমানের শক্তি যোগাবে
# অর্থ-বিত্ত ও চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেও নাসিম পরিবারের পাশে দাঁড়ান
নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টিতে এখন অনেক হাই প্রোফাইল নেতা আছেন যারা এক সময় ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের জৈ্যষ্ঠ সন্তান একেএম নাসিম ওসমানের ভক্ত হিসেবে তার চারপাশে ঘুরঘুর করতেন। এই নাসিম ওসমানের হাত ধরেই তারা এখন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ হয়েছেন। বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
যারা এক সময় নাসিম ওসমানকে পীরের ন্যায় মূল্যায়ন করতেন এবং তার কথায় উঠ-বস করতেন। শুধু জাতীয় পার্টি কেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগেরও উপরের সারির বহু নেতা আছেন, যারা নাসিম ওসমানের বদৌলতেই এখন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ।
নাসিম ওসমানের সেসব ভক্তরা সে সময় একটি মোটামুটি মানের পদের জন্যও নাসিম ওসমানের চারপাশে এমনভাবে বেষ্টনী তৈরি করে রাখতেন, যেন যেকোন কিছুর সাথে যুদ্ধ করেই তারা নাসিম ওসমানকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত আছেন। নাসিম ওসমানের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারলে তারা নিজেদের ধন্য মনে করতেন। এখন নাসিম ওসমান নাই।
২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের দেরাদুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যখন মারা যান। তারপর থেকেই যেন সব চিত্র পাল্টে যায়, সৃষ্টি হতে শুরু করে নতুন দৃশ্যপট। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা, চারবারের নির্বাচিত সাংসদ এবং ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সিংহ পুরুষ খ্যাত এই নেতার মৃত্যুর সাথে সাথে যেন তাদের সেই শিষ্যদের ভক্তিও হারিয়ে গেছে।
আর তাইতো তারা খুঁজে নেন ক্ষমতার নতুন সিঁড়ি। একই সাথে অনেককেই দেখা যায় সাধারণ কর্মী থেকে মহান নেতা সেজে কারিকারি টাকা কামাতে। বিলাস বহুল বাড়ি, বিলাস বহুল গাড়ি এবং ক্ষমতার দাপটে তাদের চোখ এখন এতটাই উঁচুতে উঠেছে যে, সেই নাসিম ওসমানের পরিবারের কি হলো তা তাদের চোখেই পড়ে না।
কিন্তু এর মধ্যেও কিছু কর্মী আছেন যারা এখনও কর্মী-ই রয়ে গেছেন। অর্থ বিত্তের চেয়েও তাদের কাছে নাসিম পরিবারের ভালবাসা বড় বলেই তারা সেগুলোকে তুচ্ছ করে নাসিম পরিবারের পাশে দাঁড়ান। বাঘা বাঘা নেতাদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তার পরিবারের ডাকে সাড়া দেন।
আর সেই কারণেই হয়তো নাসিম ওসমানের ভালবাসার সাথী, সহধর্মিনী পারভীন ওসমান এখনও কিছুটা ভরসা পান। এখনও অভিমান করার মতো, প্রতিবাদ করার মতো সৎ সাহস দেখাতে পারেন। সেসব ভক্তদের বিশ্বাস; সকল বাধা ও অবহেলা উপেক্ষা করে এগুলো থেকেই দৃঢ় শক্তি অর্জন করবেন পারভীন ওসমান।
একই সাথে এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বামীর রাজনৈতিক পেশা ও আদর্শকে সম্মান জানিয়ে মনের মধ্যে প্রবল ইচ্ছা শক্তির জন্ম নিবে এবং রাজনীতিতে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবেন তিনি।
জাতীয় পার্টি গঠনে ব্যাপক ভূমিকাসহ নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টিকে প্রতিষ্ঠিত করেন নাসিম ওসমান। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। আর রাজনৈতিক কারণে খুবই ব্যস্ত সময় পার করতেন একেএম নাসিম ওসমান।
এসব মেনে নিয়েই এসব কাজের স্বাক্ষী হিসেবে তার পাশে থেকে নিরবে সহযোগিতা ও উৎসাহ যুগিয়ে যান তার স্ত্রী পারভীন ওসমান। ২০১৪ সালে নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে হওয়া উপনির্বাচনে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় নির্বাচন বা রাজনীতির কথা চিন্তা করতে পারেননি পারভীন ওসমান।
তবে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হন তিনি। তবে সে সময় নাসিম ওসমানের সেই পরীক্ষিত ভক্তরা ঠিকই দাঁড়িয়েছিল তার সহধর্মিনীর পাশে। সে সময় ঢাকার সোহরওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটের মহাসমাবেশের আয়োজনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী পারভীন ওসমান নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দরের জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের বিশাল একটি মিছিল নিয়ে সেই সমাবেশে যোগদান করেন।
সেই শোডাউনে নাসিম ভক্তরা ঠিকই তার পাশে ছিলেন। পরিবার ও সার্থান্বেষী কিছু জাতীয় পার্টির নেতার কুটকৌশলের কারণে তখন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। অনেকের মধ্যেই হাড় কাঁপানো ভয় জাগিয়েছেন তিনি। সে সময় তিনি জাতীয় পার্টির বিভিন্ন জনসভায় উপস্থিত হতে শুরু করলে নাসিম ভক্তদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা শুরু হয়।
সেই সময় তার জনসমর্থনে ইর্ষান্বিত হয়ে পারভীন ওসমানকে নিয়ে টানাটানি করতে নেতা-কর্মীদের নিষেধ করে দিয়েছিলেন তারই পরিবারের সদস্য। তবে নির্বাচনে মনোনয়ন না দিলেও এরশাদের মৃত্যুর পর নাসিম ওসমানের বিশ্বস্ততার মূল্যায়ন করেছেন এরশাদের ভাই ও জাতীয় পার্টি ও পরবর্তী চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট পারভীন ওসমানকে জাতীয় মহিলা পার্টির উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচিত করার মাধ্যমে অনেকেরই আশায় বালি ঢেলে দেন। শুধু তাই নয়, পারভীন ওসসমানকে তিনি গত ২৪ মার্চ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত করেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর গত ২৬ মার্চ পারভীন ওসমানের নেতৃত্বে বিশাল শোডাউন করা হয়। সেখানেও তার সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে গত জুনে অত্যন্ত কৌশলে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির সম্মেলন করা হয় কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পারভীন ওসমানকে ছাড়াই। উদ্দেশ্য পারভীন ওসমানকে এড়িয়ে নিজেদের বলয়ের পাল্লাকে ভারি করা।
সেই অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির পক্ষ হতে পারভীন ওসমানকে দাওয়াতও করা হয়নি। প্রায় একই চিত্র দেখা গেল গত ১০ অক্টোবর একেএম নাসিম ওসমান সেতু উদ্বোধনের দিন। পারভীন ওসমানের স্বামীর নামে করা সেতুর উদ্বোধনের দিনও তাকে কিছুই জানানো হয়নি।
তাই বিষয়টিকে কাকতালীয় ভাবতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। তাদের মতে অত্যন্ত কুটকৌশলে বিষয়টি ঘটানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি পারিবারিক না হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যাকে ঘোষণা দিয়ে সম্মান প্রদান করেছেন।
সেখানে দায়িত্বরত কর্তারা সেই সম্মানিত ব্যক্তির অবর্তমানে তারই স্ত্রী বা সন্তানদের জানানোরই প্রয়োজন বোধ করেননি, কিংবা খোঁজ করারই চেষ্টা করেননি। বিষয়টি আইনগত কিংবা বাধ্যতামূলক বিষয় না হলেও খুবই অশোভনীয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ নাসিম ভক্তগণ। এন.এইচ/জেসি


