গুরুর কৃতিত্ব ভুলে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত খোকা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৫১ পিএম
নারায়ণগঞ্জ জেলা ৫টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত। এই জেলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির সাথে মহাজোট গঠন করে নির্বাচন আসলে প্রায় সময়ই দেখা যেত ৪টি আসনেই নৌকা দেয়া হতো; বাকি একটি আসন জাতীয় পার্টিকে দেয়া হতো।
আর সেই আসনটি বরাবরাই জাতীয় পার্টি থেকে দেয়া হত প্রয়াত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি নাসিম ওসমানকে। কিন্তু ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ২টি আসন থেকেই লাঙ্গলের প্রতীক দেয়া হয়। নতুন সংযুক্ত হয় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন; যেখানে লাঙ্গল প্রতীকে মনোনয়ন দেয়া হয় নাসিম ওসমানের শিষ্য হিসেবে পরিচিত লিয়াকত হোসেন খোকাকে।
লিয়াকত হোসেন খোকা প্রথমবার এমপি হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই পরলোকগমন করেন নাসিম ওসমান। কিন্তু গুরুর মৃত্যুর পর গুরুর কৃতিত্ব ধরে রাখেনি খোকা। গুরুর মৃত্যুর পর জেলা জাতীয় পার্টির রাজনীতি খোকা একহাত নিলেও গুরুর অন্যান্য শিষ্যদের মূল্যায়ন করতে পারেনি। পাশাপাশি নাসিম ওসমানের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন থেকে প্রথম বারের মত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন লিয়াকত হোসনে খোকা। এর আগে তার নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন সোনারগাঁয়ে তার কোন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ছিল না এবং এই আসনে জনসাধরণের কাছে পরিচিত মুখ ছিলেন না।
কিন্তু তার এমপি হওয়ার পিছনে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ছিল নাসিম ওসমানের এবং নাসিম ওসমানের শিষ্য হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন; এটা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের জনসাধারণ অবগত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের রাজধানী দিল্লির দেরাদুন শহরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন নাসিম ওসমান।
নির্বাচনের কয়েকমাস পর গুরুর মৃত্যুর পর নতুন সাংসদ হিসেবে অনেকটা চাপে পড়ে যান খোকা। তারপর লিয়াকত হোসেন খোকার পরম বন্ধু নাসিম ওসমানের ছোট ভাই এমপি শামীম ওসমানের প্রেসক্রিপশনে এমপিত্ব করা শুরু করেন। কিন্তু গুরুর মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির রাজনীতি অনেকটা এমপি খোকার হাতে চলে যায়।
পরবর্তীতে তার সংসদীয় আসন সোনারগাঁ সহ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে তার একটা বলয় তৈরী করে ফেলেন। আর তখন থেকেই এমপি খোকার প্রেসক্রিপশনেই পরিচালিত হতে শুরু করে জাতীয় পার্টির রাজনীতি। আর তখন থেকেই জেলা মহানগর থানা সহযোগী অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন কমিটি গঠন হতো এমপি খোকার হস্তক্ষেপে।
আর এসব কমিটিতে ছিটকে পড়তে থাকেন নাসিম ওসমানের সাথে রাজনীতি করা নেতারা। পরবর্তীতে নাসিম ওসমান পত্নী জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়; কিন্তু নাসিম ওসমানের শিষ্য হিসেবে এমপি খোকা, গুরুর পত্নীকে রাজনীতিতে তেমন একটা সহযোগীতা করতে দেখা যায়নি।
২০২২ সালের ২৪ মার্চ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয় নাসিম ওসমানের পত্নীকে। সে প্রেসিডিয়াম মেম্বার হওয়া সত্ত্বেও জেলা ও মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সভা সমাবেশ সম্মেলনে রাখা হয় না নাসিম ওসমানের পত্নীকে। এসব বিষয় নিয়ে কোন রকম মাথা ব্যাথা নাই এমপি খোকার।
দীর্ঘ দুই যুগ পর ২০২২ সালের ১৭ জুন সম্মেলনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সেখানেও রাখা হয়নি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি নাসিম ওসমানের পত্নীকে।
পরবর্তীতে সম্মেলনে আংশিক কমিটি গঠন করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হিসেবে সানাউল্লাহ সানু এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাঈম ইকবালের নাম ঘোষণা করা হয়। সেই সাথে মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি হিসেবে মুদাসিরুল হক দুলাল এবং সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেনের নাম ঘোষণা করা হয়।
সেই কমিটি ঘোষণার পরও নানা রকম আলোচনা করা হয় যে এমপি খোকার ঘনিষ্ঠদের নিয়ে এসব কমিটি করা হয়। কারণ এমপি খোকার ঘনিষ্ঠ জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক করা হয় নাঈম ইকবালকে। পরবর্তীতে এই নাঈম ইকবাল নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা যে, সে সোনারগাঁ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির রাজনীতি করা বহু নেতা থাকা সত্ত্বেও জেলার সাধারণ সম্পাদক করা হয় নাঈম ইকবালকে পাশাপাশি সে সময় অভিযোগ উঠে সে নব্য জাতীয় পার্টি করা নেতা এক সময় আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত ছিল এমপি খোকার হাত ধরেই সে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে আসে এবং এই শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়।
২০২২ সালের ৩ আগষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হলে সে সময় অভিযোগ উঠে নাসিম ওসমানের পত্নীর সাথে রাজনীতি করা বহু নেতা কর্মীদের কমিটি থেকে মাইনাস করা হয়। তাদের মাইনাস করার কারণে নাসিম ওসমানের শিষ্যদের থেকে শুরু করে তার পত্নী পারভীন ওসমানের কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করে।
গত ১০ অক্টোবর নাসিম ওসমান সেতু উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন থেকে লিয়াকত হোসেন খোকা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সেলিম ওসমানকে অতিথি হিসেবে দেখা গেলেও দেখা যায়নি নাসিম ওসমানের পত্নী পারভীন ওসমানকে।
পারভীন ওসমানের অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বোধন অনুষ্ঠানেই ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াতই করা হয়নি। এ নিয়ে জাতীয় পার্টি সহ পারভীন ওসমান বলয়ের কর্মীদের মনে চরম ক্ষোভ দেখা দেয়।
কিন্তু সেখানে নাসিম ওসমানের একান্ত শিষ্য হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি খোকার উপস্থিতি দেখা গেলেও নাসিম ওসমানের পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতি নিয়ে ছিল না তার কোন প্রতিক্রিয়া। নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর এমপি খোকার কর্মকান্ডে সকলের নিকট একটি বিষয় পরিষ্কার যে, সে গুরুর কৃতিত্ব কোন ভাবেই ধরে রাখতে রাজি নয়; বরং সে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এন.এইচ/জেসি


