Logo
Logo
×

রাজনীতি

সম্মেলন ও পদ বাণিজ্য

Icon

করীম রেজা

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২২, ১১:২৭ পিএম

সম্মেলন ও পদ বাণিজ্য
Swapno


নারায়ণগঞ্জ নামটি বাংলাদেশ তথা ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের অংশ। কখনো ইতিহাস তৈরি করেছে, কখনো নিজেই ইতিহাসের অংশ হয়েছে। হতে পারে এই ইতিহাস রাজনীতির, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক আন্দোলন- চর্চা প্রভৃতি। একসময় অখণ্ড ভারতে ঢাকা কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের বলা যায় একমাত্র কেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জ।

 

 

রেলপথে কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ এসে স্টিমারে চড়ে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে নামতে হতো। নিতাইগঞ্জের জাহাজ ঘাট থেকে খুব কাছেই ছিল জিমখানা রেলস্টেশন, ঢাকায় ছিল গেন্ডারিয়া। নৌ যোগাযোগ, রেল যোগাযোগ, সড়ক পথ, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই নারায়ণগঞ্জ এগিয়েছিল।

 

 

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তনের সঙ্গেও। দেশের যাবতীয় রাজনৈতিক উদ্যোগ, আন্দোলন, সংগ্রাম ইত্যাদি নারায়ণগঞ্জের অংশগ্রহনেই সফলভাবে অনুষ্ঠিত হত। ঢাকা শহরের যে কোনও মিছিল, জনসভা হোক তা আওয়ামী লীগ বা অন্যান্য ছোটখাটো দলের সভা সমাবেশের সার্থকতার নিয়মক ছিল নারায়ণগঞ্জের জনতা।

 

 

গতকাল ২৩শে অক্টোবর ২০২২ তারিখে দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সিত্রাং দূর্যোগের জন্য অনুষ্ঠিতব্য মহানগর সম্মেলন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সম্মেলন উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতা।

 

 

সারা শহর জুড়ে জনসমাগম জানান দিয়েছিল আওয়ামী লীগ দল হিসেবে কতটা বড়। পূর্বের ন্যায় না হলেও জনগণের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগাযোগ এখনও আছে। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় হোটেল-রেস্টুরেন্ট, লঞ্চঘাট, বাস স্ট্যান্ড সবদিকেই ছিল বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকজনের চলাফেরা ও প্রাণ চাঞ্চল্য।

 

 

কারো মাথায় রঙিন টুপি, কারো গায়ে রঙিন টি-শার্ট, দলীয় নেতা অথবা জেলা সম্মেলনের তথ্য সম্বলিত রঙিন ছাপ দেয়া। সবকিছু মিলিয়ে উৎসবের আমেজে ভরপুর ছিল সারাদিন নারায়ণগঞ্জ। শহরের বুকে আওয়ামী লীগের জেলা সম্মেলনে যে পর্যায়ের জনসমাগম হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি; বলে অনেকেই মনে করেন।

 

 

পত্রিকার পাতায় ছবিও ছাপা হয়েছে। তাদের মত অনুযায়ী প্রান্তিক পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততার অভাবের দিকটি ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত এবারের জেলা সম্মেলনে। একটি বড় দলের বিশেষত দল যখন শাসনব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করছে; তখন তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা আরো ব্যাপক ও শক্তিশালী হওয়ার কথা।

 

 

অনেকেই মনে করেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে সাংগঠনিক চর্চা আর আগের মত নেই। তারই ফলশ্রুতিতে জনসমাগম ব্যাপক হয়নি বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ দলীয় জনসভায় অংশগ্রহণ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় নারায়ণগঞ্জের এ কে এম শামসুজ্জোহার পিতা ওসমান সাহেবের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের চর্চা ও প্রসার শুরু হয়।

 

 

শামসুজ্জোহা সাহেবের পরবর্তী প্রজন্ম আওয়ামী লীগের ঝান্ডা উড্ডীন রাখলেও সময় সময়ে নেতিবাচক আলোচনায় এসেছে। জোহা সাহেবের ত্রিরত্নের প্রথম সন্তান নাসিম ওসমান এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পরে দ্বিতীয় সন্তান সেলিম ওসমান সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। অন্যদিকে সর্বকনিষ্ঠ শামীম ওসমান আগা গোড়াই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।

 

 

দেখা গেছে বঙ্গবন্ধু যখন জেলখানায় তখন নারায়ণগঞ্জের উদীয়মান আওয়ামী লীগের আরেক নেতা খাজা মহিউদ্দিনও জেলখানায় আটক ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু খাজা মহিউদ্দিনের কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীকালে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নাম জানা যায়।

 

 

সমসাময়িক কালে যারা যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেন যেমন খোকা মহিউদ্দিন, আলি আহমদ চুনকা আরো পরে মফিজুল ইসলাম, আবুল হাসনাত, মোবারক হোসেন, আনসার আলীসহ অনেক নেতা। আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা দেখে বলা যায়; অতীতে উল্লেখিত নেতৃবৃন্দ দল সুসংগঠিত করতে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন এবং সফল হয়েছেন। উপরিতলে যাই থাকুক ভেতরে ভেতরে এক ধরনের দূরত্ব ছিলই অর্থাৎ নেতাদের ব্যক্তি প্রভাবে উপদলীয় ব্যক্তিবলয় বিস্তৃত হয়েছিল। সমন্বয়ের অভাবে দলের স্থানিক দুর্বলতাগুলো দূর করা যায়নি।

 

 

তারই ফলশ্রুতি স্বাধীনতার ৫ দশক পরেও এসে লক্ষ্য করা যায়। এমনও দেখা যায় নেতা আছে কর্মী নাই। কর্মী আছে কিন্তু নেতৃত্বের বিভক্তির জন্য নির্দেশনা দেয়ার মত নেতা পাওয়া যায় না। তবে নারায়ণগঞ্জে বর্তমান আওয়ামী লীগে দুই বলয় কেন্দ্র করেই আওয়ামী লীগের যাবতীয় দলীয় চর্চা।

 

 

উপদলীয় প্রভাব বিস্তারের আগ্রাসনে সবকিছুই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। এবারের জেলা সম্মেলনে সাধারণ মানুষ তথা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের আশাভঙ্গ হয়েছে কি হয়নি তেমন কিছু বিশেষভাবে আলোচনা না করেও বলা যায় যেই লাউ সেই কদু। জেলার নেতৃত্বে আগে যারা ছিলেন তাদেরকেই রেখে দেওয়া হল।

 

 

দলীয় কাউন্সিলরের দলের নেতা নির্বাচনে কোনও ভূমিকা থাকে না। অতিথি হিসেবে আগত কেন্দ্রীয় নেতা অনেকটা পূর্ব নির্ধারিতরূপে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা দিয়ে বিদেয় হন। পূর্নাঙ্গ কমিটি গড়ার দায়িত্ব পায় নব ঘোষিত দুই কর্তা। সুযোগ তৈরি হয় পদ বাণিজ্যের। সম্মেলনে পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠন না করা এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 

সব রাজনৈতিক দলের হাল কমবেশি একই রকম। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে চলছে বর্জন,পাল্টা বক্তব্য,বিবৃতি এমনকি ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে সভা সমাবেশ শোভাযাত্রা। সম্মেলনে বিধি মোতাবেক কাউন্সিলর থাকে। থাকে না কমিটি গঠনে অংশগ্রহণের সুযোগ।

 

 

হাত তোলা, সমর্থন জানানোই হয় কাউন্সিলরের প্রধান ভূমিকা। কখনো আবার তারও দরকার হয় না। কেন্দ্রীয় নেতাদের সিদ্ধান্ত বিনাবাক্যে কাউন্সিলরদের মেনে নিতে হয়। অন্য কথায় সিদ্ধান্ত উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কথিত পদ-পদবী বিক্রয়ের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়।

 

 

পরিবার, স্বজন, অর্থ প্রীতি পুরো ব্যবস্থা গ্রাস করে প্রান্তিক পর্যায়ের দলীয় সমর্থকদের সঙ্গে যোজন দূরত্ব তৈরি করে। ত্যাগী নেতা-কর্মীরা এই দল-নেতৃ-প্রিয় ব্যবস্থার দ্বারা বঞ্চিত হচ্ছেন, হবেন। অর্থাৎ সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার দ্বারা পদ বেচাকেনার আয়োজন করে দেয়া হয়।

 

 

দেখা গেছে সম্মেলনে ঘোষিত নব নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অতীতে নানা রকম অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বিশেষ করে পদ বাণিজ্যের।  ব্যাপক আলোচিত সমালোচিত হয়েছে। সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সমন্বয় দেখা যায়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে নানা রকম পারস্পরিক অসহযোগিতার খবরও।

 

 

সেই দুইজনকেই আবারও দায়িত্ব দেয়া হল। নিজেদের অন্তর্কলহ ঘুচিয়ে আসন্ন নির্বাচন লক্ষ্য রেখে কিভাবে দল সংগঠিত করেন, তা দেখতে এখন সময়ের জন্য অপেক্ষা। জেলা সম্মেলনে সভাপতি আবদুল হাই সাহেবের শারীরিক ভঙ্গি থেকেও অতীতের পদ বাণিজ্যের স্বীকারোক্তি পাওয়া গেছে। তিনি এবার অঙ্গীকার করেছেন ভবিষ্যতে পদ কেনাবেচায় নিজেকে জড়াবেন না।

 

 

তার মানে এই নয় পদ-পদবি বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বিরত থাকলে অন্য কেউ করবেন। যেহেতু পদ বেচাকেনা একটি বাস্তব রাজনৈতিক পণ্য। বেচাকেনা তো হবেই, আর যদি তেমন সুযোগ, আয়োজন সৃষ্টি করে দেয়া হয়, তা রুখবে তার সাধ্য কার। এতে করে দলের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুন্ন হয় তেমনি সাংগঠনিক শক্তি দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়।

 

 

তার প্রমাণ জেলা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশিত সংখ্যার চেয়ে কম উপস্থিতি। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নেতা-কর্মী শোভাযাত্রা সহকারে সম্মেলন উপলক্ষে আহুত জনসভা স্থল পর্যন্ত এসেছে ঠিকই। কিন্ত নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ না করে অনেকেই সভাস্থল ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায় অথবা ইতস্তত ঘোরাফেরায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

 

 

তাছাড়া শামীম ওসমান এবং মেয়র সেলিনা হায়াত আইভির মধ্যে দূরত্ব বহুল আলোচিত বিষয়। দলীয় কর্মসূচিতে একমঞ্চে উপস্থিত হলেও তাদের মধ্যে বাক্য বিনিময় হয় না। তাছাড়া সাংগঠনিক কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা সবসময়ই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অন্যতম দুর্বলতা বলে চিহ্নিত হয়।

 

 

এই দুই নেতাকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি এবং দলীয় নেতা-কর্মীরা মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায় প্রায়ই। এসব রসায়নও জনসম্পৃক্ততায় যথেষ্ট প্রভাব ফেলে বলেই ধারণা করা হয়। কেউ কেউ এমনও ধারণা করেন শামীম ওসমানের সাংগঠনিক তৎপরতার উপর নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ অনেকাংশেই নির্ভরশীল। এই সুযোগে অন্যান্য বিরোধীদলের শক্তি সঞ্চয় সহজ হয়।

 

 

একটা সময় ছিল যখন আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন দল কর্মী তৈরিতে নিয়মিত রাজনৈতিক ক্লাসের ব্যবস্থা করত। বর্তমানে কিছু ডানপন্থী দল এই চর্চা অব্যাহত রাখলেও প্রগতিশীল দলসমূহ ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা, বাণিজ্যের বিস্তার, প্রভাব প্রতিষ্ঠার মহড়ায় নিজেদের ব্যতিব্যস্ত রাখে। যার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ আগের মত জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান হারিয়েছে।

 

 

এত উন্নয়নের পরও মানুষের মাঝে আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ। এই অবস্থা চলতে থাকলে জেলা সম্মেলন বা অন্য যে কোনো সমাবেশেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের অংশগ্রহণ দিন দিন কমবে ছাড়া বাড়বে না। দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই সমস্ত কোন্দল, ত্রুটিবিচ্যুতি চিহ্নিত করে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা আওয়ামী লীগের অন্যতম কর্মসূচি হওয়া উচিত।

 

 

কেননা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচনের আগে আগে নির্বাচনী কর্মসূচির সঙ্গে সাংগঠনিক তৎপরতায় রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির উপায় সংযুক্ত রাখা দরকার বলেই আওয়ামী লাগের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনমানুষ প্রত্যাশা করে। এন.এইচ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন