২৫ বছর পর অনুষ্ঠিত কাউন্সিল, যে কারণে নিষ্প্রভ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২২, ১১:৫৮ এএম
# প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি তৃণমূলে পৌঁছে যাওয়াটা প্রধান কারণ
# শামীম-আইভী-দিপু-বাবু-বাচ্চু-আরজু-জাহাঙ্গীর আগ্রহে ছিল
যতটা আনন্দ উচ্ছাস আর আগ্রহ তৈরি করেছিলো জেলা আওয়ামী লীগের ২৫ বছরের সম্মেলন, পরক্ষণেই তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। স্থানীয়ভাবে তো বটেই জাতীয়ভাবেও এই সম্মেলন বিশেষ আগ্রহ তৈরি করায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে এখনো।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর আয়োজিত জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন কেন নিষ্প্রভ হয়ে পড়লো এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও নানা কারণ খুঁজতে ব্যস্ত। এই সম্মেলনে আওয়ালীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ আবদুর রাজ্জাকসহ অনেক ডাকসাইটের আওয়ামীলীগ নেতারা ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান, জনপ্রিয় মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রিয় এমপি নজরুল ইসলাম বাবু, মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের প্রায় সকল নেতা উপস্থিত থাকলেও সম্মেলনে কেন আশানুরূপ প্রাণ পেলনা এনিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অথচ কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সড়কে ২নং রেলগেটের সামনে ডাকা শামীম ওসমানের সমাবেশ হয়ে পড়েছিলো লোকেলোকারণ্য। তাহলে জেলা আওয়ামী লীগের মতো বড় সম্মেলনে আশানুরূপ নেতাকর্মী কেন উপস্থিত হলো না সেই প্রশ্নই কুঁেড় কুুঁড়ে খাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
অথচ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় যখন এই সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয় তখন গোটা জেলাতেই আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীদের মাঝেও প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গিয়েছিলো। সম্মেলনে অনেক নেতাই ধৈর্য্য হারানোর চিত্রও ফুটে উঠেছে। কেন এতো এলোমেলো কাণ্ড ঘটল সেটির কারণ খুঁজতেই সবাই ব্যস্ত।
সূত্র জানিয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভাতেই এর কারণ লক্ষ্য করলে খুঁজে পাওয়া যাবে সামান্য। কেননা সেই সভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের উপস্থিতিতেই আগের কমিটির সহ-সভাপতি আদিনাথ বসু জেলা আওয়ামী লীগের প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে এমন কথা তোলেন।
তিনি বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই তারাই হচ্ছেন সম্মেলনে আবারো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তার মানে কি জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলনের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। বর্ধিত সভায় আদিনাথ বসুর এই প্রশ্নের কোন সদূত্তর দেননি মির্জা আজম।
আরেকটি সূত্র জানায়, এক পর্যায়ে মির্জা আযম তার বক্তব্যে আভাস দেন জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন দশ মিনিটের মধ্যেই সম্পন্ন করা যাবে। তখন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আরজু রহমান ভূঁইয়াও বলে উঠেন, সোনারগাঁ আওয়ামীলীগের সম্মেলন যদি আপনি ৫ মিনিটে শেষ করে দিতে পারেন; তবে জেলা আওয়ামী লীগেরটাও ১০ মিনিটে শেষ করে দিতে পারেন।
যেহুতু আপনি বড় নেতা, অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে আপনার। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া এসব তথ্যের সত্যতাই মিলেছে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আবদুল হাই ও ভিপি বাদল পুনরায় স্বপদে ফেরার মাধ্যমে।
সূত্র জানিয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আবদুল হাই ও ভিপি বাদলকে অস্পষ্টভাবে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের জনসম্মুখে ভৎসনা করার বিষয়টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রাধান্য পেয়েছে। কেননা গত ৫ বছর যাবৎ কমিটি বাণিজ্য, পদ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা, মনমাফিক সংগঠনের পদ ব্যবহার, মর্জি অনুযাযী তৃণমূল নেতাকর্মীদের বহিঃষ্কার, চাপে আবার গ্রহণ, বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব তৈরি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্পষ্টতা, কার্যকরী সভা আয়োজনে অনীহা ও লুকোচুরি, বিতর্কিত অনেক ব্যক্তিকে কমিটিতে গ্রহণের চেষ্টাসহ অভিযোগের পাহাড় ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
কিন্তু সেসবের বিচার কিংবা ব্যবস্থা তো দূরের কথা বিন্দু পরিমাণ শুনতেও অনাগ্রহতাই সম্মেলনকে তৃণমূলের কাছে আশানুরূপ করতে পারেনি, যার চিত্র স্টেজেও মেলে। ওবায়দুল কাদের তাদের নাম উচ্চারণ না করেই তারাই বহাল থাকবে বলেই তাদের ভৎর্সনা শুরু করেন। সম্মেলন শেষে যখন তারা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে যান আবদুল হাই ও ভিপি বাদল তাদের বরণ করে নিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কোন বিশেষ আগ্রহও দেখা যায়নি।
মূলত ওবায়দুল কাদের বহাল শব্দটি বলার পরপরই তৃণমূল সমাবেশস্থল ছাড়তে শুরু করে। এমনকি ওবায়দুল কাদের যখন সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদল বহাল রয়েছেন বলে ঘোষণা করলে; সেই মুহুর্তে সমাবেশস্থলে কোন করতালি কিংবা উচ্ছাস প্রত্যক্ষ করা যায়নি।
অনেকে বলছেন, এবারে সম্মেলনে তৃণমূলের অনাগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগের পাহাড় থাকা ব্যক্তিদেরকেই জেলা দলের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মনে করছে তৃণমূল। কিন্তু শাস্তি কিংবা সাংগঠনিক পদক্ষেপের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেনা।
এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তৃণমূল কর্মীদের উচ্ছাসে ভাটা এবং উপস্থিতি আশানুরূপ না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বর্ধিত সভায় আদিনাথ বসু প্রশ্নফাঁসের প্রসঙ্গটি টানলেও এরপর উপকমিটিগুলো গঠন হয়।
শামীম ওসমান,ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, এড. আনিসুর রহমান দিপু সভাপতি পদে আর সাধারণ সম্পাদক পদে এমপি নজরুল ইসলাম বাবু, জাহাঙ্গীর আলমসহ আরো বেশ কিছু নাম উচ্চারিত হচ্ছিল। শামীম ওসমান শিবিরে তো শামীম ওসমান জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসছেন বলে তার নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রচারণাও চালিয়েছিল।
আইভীর নেতাকর্মীরাও আশান্বিত ছিল আইভী গুরুত্বপূর্ণ পদে আসছেন। এছাড়া আরজু রহমান ভূইয়া, আবদুল কাদির, মিজানুর রহমানসহ আরো বেশ কয়েকজন নেতার নাম সম্মেলনকে নিয়ে একটা টানটান উত্তেজনা তৈরি করেছিল। কিন্তু সম্মেলনের দিন যত কাছে গড়িয়েছে ততই সম্মেলনকে নিয়ে আগ্রহ হারিয়েছে তৃণমূল। আর এটি তখন ঘোষণার সম্মেলনে পরিণত হয়।
তবে শেষ আগ্রহটিও শেষ হয়ে যায় । যখন শামীম ওসমান অনেক আগ্রহ নিয়ে বেশ কয়েকটি কর্মীসভা করার পর রাইফেলস্ ক্লাবে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন, তিনি সভাপতি প্রার্থী নন, এটি ৯৯ দশমিক ৯৯ পার্ন্সট সত্য। এরপরই তার নেতকর্মীরাও ব্যাপকহারে সম্মেলনকে নিয়ে আগ্রহ হারান।
যেখানে শামীম ওসমান মাস খানেক আগে ব্যক্তিগত সম্মেলনে তৃণমূল কর্মীদের নিয়ে লোকে লোকারণ্য করতে পারলেন; সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সকল হাইভোল্টেজ আওয়ামী লীগ নেতারা একত্রিত হয়েও সম্মেলনে আশানুরূপ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলেননা।
এই সম্মেলনে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শামীম ওসমান যেই আগ্রহ প্রথমে দেখিয়েছিলেন বিশেষ করে রাইফেলস্ ক্লাবে চট্টগ্রামের বিএনপির সমাবেশের ছবি দেখিয়ে তাতে বোঝাই যায় তার ব্যাপক প্রস্তুতি ও আশা ছিলো এই সম্মেলনকে ঘিরে। যদিও তিনি জেলা আওয়ামীলীগের কোন পদে নেই, তিনি মহানগর আওয়ামীলীগের সদস্য।
কিন্তু যখনই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি, তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ে তখন অনেকেই নাম রক্ষার সম্মেলনে নিজেদের উপস্থিত থাকার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। একথা অনস্বীকার্য যে আওয়ামী লীগের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল হতাশাজনক।
অনেকে মনে করেন, বর্ধিত সভায় যখন আদিনাথ বসু মির্জা আজমের সামনে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি উত্থাপন করেন তখন তিনি মৌনতা অবলম্বন করেছিলেন। মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ এটি ভেবেও জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমানে পদে থাকা ব্যক্তিরা নিরাশ হয়েছিলেন। সম্মেলন নিয়ে তাদেরও আগ্রহে ভাটা পড়েছিল।
পুরনো কমিটি আসছে বলে যে প্রচারণা চালানো হয়েছে, তার কারণেই জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন নিয়ে উচ্ছাস, আগ্রহে ভাটা নেমে আসে বলে মনে করে তৃণমূল। এছাড়া অভিযোগের পাহাড় জমা ব্যক্তিদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পুনরায় পুরস্কৃত করাটাকেও হতাশ করেছে তৃণমূলকে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এন.এইচ/জেসি


