# একই বছর দুইজন এমপি হলেও কাজেকর্মে বিস্তর ফারাক
ওসমান পরিবার মানেই রাজনৈতিক পরিবার। সেই বৃটিশ শাসন থেকেই রাজনীতির সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত আছেন নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এই ওসমান পরিবার।
৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশ স্বাধীনতার যুদ্ধেও জড়িয়ে আছে ওসমান পরিবারের নাম। এখন চলছে সেই ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের রাজনীতি।
অর তৃতীয় প্রজন্মের ওসমান পরিবারের তিন সহোদরের বড় ছেলে একেএম নাসিম ওসমান মারা যাবার পর বর্তমান আছে একেএম সেলিম ওসমান এবং তার ছোট ভাই একেএম শামীম ওসমান। এর মধ্যে সেলিম ওসমান বেশিরভাগ সময়ই ব্যবসায়ী সংগঠন কাটিয়েছেন এবং বড় ভাই নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর তার আসনে (নারায়ণগঞ্জ-৫) থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
তবে তিনি এখনও রাজনীতিবিদের তুলনায় ব্যবাসায়ী হিসেবেই পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যদিকে শুধু নারায়ণগঞ্জই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও একটি পরিচিত নাম শামীম ওসমান। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই রাজনীতিবিদের নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে রয়েছে একটি বিশাল কর্মীবাহিনী।
২০১৪ সালে উপনির্বাচনের মাধ্যমে সেলিম ওসমান এমপি নির্বাচিত হওয়ায় তারা রাজনৈতিক যাত্রার বয়স প্রায় ৮বছর। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এবং জনগণের সুবিধা অসুবিধায় পাশে দাঁড়ানোর জন্য বর্তমানে তিনি জনবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
অন্যদিকে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত থাকা শামীম ওসমান প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পান ১৯৯৬ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে এমপি নির্বাচন হন তিনি। তবে এতটা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও তার প্রভাব, ক্ষমতা এবং জনপ্রিয়তা অনুযায়ী ধারাবাহিক উন্নয়ন ছাড়া জনগণের জন্য বলার মতো তেমন কোন উন্নয়নমূলক চোখে পড়েনি।
তবে তিনি তার বিশাল কর্মীবাহিনীকে ঠিক রাখার জন্য তার বিশেষ ভক্তদের উন্নয়নে কোন ফাঁক রাখেননি। সেলিম ওসমানের এই ৮ বছরের জনহিতকর কাজের সিকিভাগ কাজও শামীম ওসমান তার দুই যুগে করতে পারেননি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে সেলিম ওসমান কৈশর থেকেই বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। এরপর ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর খুনীদের হাতে নির্যাতিত হন তিনি।
পরবর্তী সময় পিতা শামসুজ্জোহা যখন জেলে, বড় ভাই নাসিম ওসমান বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে যখন কাদের বাহিনীতে। যখন খুবই দুঃসময় চলছিল ওসমান পরিবারের। তখন সংসারের দায়িত্ব কাধে নিতে কি করেননি সেলিম ওসমান।
বাস এর ড্রাইভারের কাজ করেছেন, মাছ বিক্রি করেছেন, ফেরি করে মুরগী বিক্রি করেছেন, হোসিয়ারী শ্রমিকের কাজ করেছেন। এসব কষ্ট ও প্ররিশ্রমের ফসল হিসেবে এখন তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত নীট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
আর তাই রাজনৈতিক দক্ষতা খুব একটা না থাকলেও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ওসমান পরিবারের সন্তান সেলিম ওসমানের। অন্যদিকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর নিজস্ব তহবিল থেকে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও উন্নয়নে কাজ করাসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
যে সব বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সেলিম ওসমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো- নাসিম ওসমান সেতু দৃশ্যমান হওয়া, খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ ও ৫নংঘাট-বন্দর ঘাটে পৃথক দুটি ফেরী সার্ভিস চালু করা।
এছাড়াও সম্প্রতি যুগের চিন্তাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে সেলিম ওসমান জানান, আমার আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সেগুলো হলো বন্দরের মদনগঞ্জের শান্তিচরে নীটপল্লী নির্মাণ, বন্দরের লাঙ্গলবন্দ এলাকাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।
যার কাজ চলমান আছে, করোনার কারণে আটকে গিয়েছে। আর আরেকটি হলো বন্দরবাসীর স্বপ্নের কদম রসুল সেতু। তাছাড়া এরই মধ্যে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান তার ব্যক্তিগত অর্থায়নে শহর ও বন্দরে গড়ে তুলেছেন ৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য তার ব্যক্তিগত তহবিল কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। নির্মাণ করেছেন নারায়ণগঞ্জ কলেজে নতুন ১০তলা ভবন, শহরের মর্গ্যাণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বঙ্গমাতা ফজিলেতুন্নেছা মুজিব ভবন, নবীগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় স্থানান্তরে জমি কেনা থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ সবই সেলিম ওসমানের অর্থায়নে হয়েছে।
এছাড়াও বন্দরের শেখ জামাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভবনের উন্নয়ন, কলাগাছিয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, দেওভোগে বিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধু অডিটোরিয়াম নির্মাণসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের লেপটপ প্রদান থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমস্যায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সেলিম ওসমান।
বিপরীতে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যেই নামটি বেশি উচ্চারিত হয় সেই শামীম ওসমান সংসদ সদস্য হওয়ার পর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের তালিকা প্রায় শূন্য। যেগুলো হয়েছে তা সরকার ও বিভিন্ন দপ্তরের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের আওতায়।
এরই মধ্যে তার খুব প্রিয় এলাকা হিসেবে পরিচিত ফতুল্লায় তার নেতাকর্মী ও সুবিধাবাদী ছাড়া আর কারও তোমন উপকার বা উন্নয়ন করেননি বলে জানান স্থানীয় জনগণ। ফতুল্লার দীর্ঘ দিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা দূরীকরণেও এমপি শামীম ওসমানের কোন প্রকার উদ্যোগ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
শুধু ডিএনডি-ই নয়, ফতুল্লার বিসিকি শিল্প নগরী এলাকার মানুষও ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনায় ভূগছে স্থানীয় জনগণ। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার জনগণের মতে, এই এলাকার স্মরণকালের সেরা উন্নয়নের রূপকার হিসেবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন।
সিটি কর্পোরেশন এদিকে দৃষ্টিপাত না করলে এখানকার মানুষকে এখনও অজপাড়াগায়ের মতো বাস করতে হতো বলে দাবি করেন তারা। এসব এলাকার মানুষের মতে শামীম ওসমান শুধু বক্তৃতায় এবং নিজের তোষামোদী কর্মীদের কথাই ভাবেন। জনগণের কথা ভাবেন না।
তিনি হিসেব করেন কোন এলাকা থেকে কোন লোক কতজন কর্মী নিয়ে হাজির হতে পারবেন। আর তার নামে স্লোগান দিতে পারবেন। এই এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০১৪ সালে শামীম ওসমান দ্বিতীয় দফায় সাংসদ হওয়ার পর থেকে উন্নয়নে তেমন মনোযোগী নন, যেমনটি সেলিম ওসমান ছিলেন।
শামীম ওসমান কালেভাদ্রে কয়েকটি স্কুলের সংস্কার কাজও করিয়েছেন এমনটিও দেখা যায়নি। বক্তাবলীর যে দীর্ঘদিনের দাবি সেতু নির্মাণ সেটিতেও কোন কার্যকরী ভূমিকা তিনি রাখেননি। মোদ্দাকথা ফতুল্লার দিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির অবহেলার কারণেই ঢাকার সবচাইতে কাছের থানা হয়েও উন্নয়ন বঞ্চিত রয়ে গেছে ফতুল্লা। ফতুল্লাবাসী এই অভিযোগ কার কাছে করবেন সেটিও অজানা। এন.এইচ/জেসি


