নারায়ণগঞ্জ মানেই আওয়ামী লীগের ঘাটি। ইতিহাস বলে এই নারায়ণগঞ্জই আওয়ামী লীগের সূতিকাগার। তাই এই জেলার কোন জায়গায় আওয়ামী লীগের কোন প্রকার অবনতি বা পরাজয় হয়ে উঠে সংবাদের শিরোনাম।
তবে বিভিন্ন কারণে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় আসলেও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বন্দর ও সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও সমর্থকদের মধ্যে বেশি হতাশা লক্ষ্য করা যায়।
এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটি গঠনের বিষয়েও এই দুটি উপজেলা কমিটি গঠন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। পরে অবশ্য সোনারগাঁও আওয়ামী লীগের কমিটিকে বিতর্কমুক্ত করার জন্য কিছু সমন্বয় করার মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়।
তবে সোনারাগাঁয়ের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির মিশেলে গড়ে উঠা রাজনৈতিক মাঠে ত্যাগী ও পোড় খাওয়া আওয়ামী লীগের নেতাদের এখন দৈন্য দশা। নেতৃবৃন্দের মধ্যে সৃষ্ট অন্তর্দ্বন্দ্বই এখানকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে।
যার প্রমাণ গত জেলা পরিষদ নির্বাচন। যদিও জেলা পরিষদ নির্বাচন কোন দলীয় প্রতীকে হয়নি, তারপরও যারা নির্বাচনের অংশগ্রহণ করেছেন তারা দলীয় সমর্থন নিয়েই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
জেলা পরিষদের সদস্য পদের জন্য সোনারগাঁ উপজেলা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করেন উপজেলা ও জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম ইকবাল ও সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম।
নির্বাচনে আবু নাইম ইকবালের পক্ষে কাজ করছেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকাসহ জাপার স্থানীয় নেতাকর্মীগণ। অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমান মাসুমের পক্ষে আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সারসহ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।
তাই বিষয়টিকে সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ একটি এসিড টেস্ট হিেেসব নিয়েছিলেন। কেননা এই নির্বাচনে যারা ভোটার হিসেব করলে সোনারগা উপজেলায় অবস্থিত ১০টি ইউনিয়ন পরিষদের ৮টিতেই আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান।
অধিকাংশ ইউপি সদস্যই আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মাসুমের জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন তিনি এবং তার সমর্থকগণ। কিন্তু সেখানে দেখা গেল জাতীয় পার্টির ইকবালের পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাদের কাজ করতে।
ফলে সকল জল্পনা কল্পনা শেষে বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির ইকবাল। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে যা ছিল খোকার কাছে কায়সারের হার। ইকবালের তালা প্রতীক যেখানে পান ৮৩ ভোট মাসুমের হাতি প্রতীক পান মাত্র ৪৯ ভোট।
দলীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সংকট শুরু হয় ২০১৪ সালের পর থেকে। অর্থাৎ যখন থেকে রাজনৈতিক জোটের কারণে এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয় তারপর থেকেই এখানকার রাজনৈতিক নেতৃত্বও চলে যায় জাতীয় পার্টির হাতে।
আর এই বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের একটি প্রভাবশালী পরিবার পরিকল্পিতভাবে তাদের নিজেদের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য করেছেন বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। স্থানীয় আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রমতে এখানকার আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের প্রাণ পুরুষ হিসেবে পরিচিত আবদুল্লাহ আল কায়সার।
যিনি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপি থেকে তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হারিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে এই আসনটি জাতীয় পার্টির জন্য ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ।
সে সময় কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিনা বাধায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। এরপর ২০১৮ সালেও এই আসনটি জাতীয় পার্টির জন্য ছেড়ে দিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে দাবি উঠে নির্বাচনে অংশ নেয়ার।
উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী, উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবারের সন্তানসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে কায়সারকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য অনেকটা চাপ সৃষ্টি করলে অনেকটা বাধ্য হয়েই সে সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেন আবদুল্লাহ আল কায়সার।
পরে বিভিন্ন নাটকীয়তার মাধ্যমে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তবে এবার যেহেতু পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্য থেকে দাবি উঠেছে যে, এখানকার আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও এবার নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসন থেকেই যেন আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী দেওয়া হয়।
তাই সোনারগাঁয়ের এই আসনটিতে যদি এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়া হয় তাহলে দীর্ঘ দিনের জাতীয় পার্টি প্রীতির মাসুল হিসেবে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়তে হবে সোনারগাঁ আওয়ামী লীগকে।
অন্যদিকে এখানকার আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির একটি অংশ নারায়ণগঞ্জের একটি প্রভাবশালী পরিবারের বলয়ে কাজ করায় দলীয় রাজনীতির কথা ভুলে গিয়ে বলয়ের রাজনীতির জন্য কাজ করায় এখানে তাদের প্রভাব অনেক বেশি।
অন্যদিকে সোনারগাঁ জাতীয় পার্টির কান্ডারী হিসেবে পরিচিত এবং জাতীয় পার্টি সমর্থিত বর্তমান এমপি লিয়াকত হোসেন খোকাও সেই প্রভাবশালী পরিবারের আশির্বাদপুষ্ট। আর তাইতো এবারের সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে আওয়ামী পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিত কায়সারকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
যাতে আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জাতীয় পার্টি সেই সুযোগ নিতে পারে। খোকা মূলত রাজনীতির সাথে পুরোপুরি যুক্ত হন ২০০৮ সালে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগ এখানে কোন প্রার্থী না দেওয়ায় এবং কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিনা বাধায় নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে দ্বিতীয় বারের মতো তিনি একই আসন থেকে নির্বাচিত হন। সেই বার কায়সার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে খোকার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান। তবে এবার নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ থেকে যেভাবে ৫টি আসনেই প্রার্থী দেওয়ার দাবি উঠেছে এবং কেন্দ্র থেকেও প্রাথমিক সায় দিয়েছে বলে জানা গেছে।
তাতে করে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের শক্তি যদি কাজে লাগানো সম্ভব হয় তাহলে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে দাঁড়াতে পারবে না বলে মনে করেন সোনারগাঁ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সম্মিলিত শক্তির সামনে কোন বলয় শক্তিও দাঁড়াতে পারবে না বলে মনে করেন তারা। এন.এইচ/জেসি


