Logo
Logo
×

রাজনীতি

দলীয় রাজনীতি নাকি বলয়ের রাজনীতি

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০৯:৫২ পিএম

দলীয় রাজনীতি নাকি বলয়ের রাজনীতি
Swapno

 

আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মুখে ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ বলে একটি বাক্য শোনা যায়। শিক্ষার্থীরা যেমন বাড়িতে লেখা পড়ায় কতটুকু সক্রিয়, শিক্ষকদের কাছে তার প্রমাণ দেওয়ার জন্য শ্রেণি কক্ষে মুখস্থ পাঠ করেন। তেমনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের দল ও দেশের প্রতি ভক্তি দেখানোর জন্য এই বাক্যটি মুখস্থ বলে থাকেন।

 

 

তবে কতজন এই বাক্যটিকে অনুসরণ করেন, তা বলা মুশকিল। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলার রাজনীতিবিদরা দেশের জন্য কে কতটুকু রাজনীতি করেন সে বিষয়টি নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে জনগণ খুবই ভাল উপলব্দি করতে পারেন। কিন্তু রাজনীতি করতে গেলে প্রত্যেক নেতাকেই একটি প্ল্যাটফর্ম বা নির্দিষ্ট একটি দলে অন্তর্ভূক্ত হতে হয়, সেই জন্যেই দলের মধ্যে যুক্ত হওয়া।

 

 

তবে বেশিরভাগ নেতারা, নেতা হওয়ার জন্য দলের আগে খোঁজ নেন বলয়ের। অর্থাৎ কোন দলে গেলে বেশি সুবিধা হবে তার চেয়েও বেশি প্রাধান্য দেন; তার রাজনৈতিক এলাকায় কোন নেতার দলে গিয়ে এবং কার বলয়ে গিয়ে কাজ করলে বেশি ফায়দা বা ক্ষমতাবান হওয়া যাবে সেই বিষয়টিতে।

 

 

আর সেই জন্যই হয়তো কোন রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পরও দলের প্রতি অনুগত হওয়াটা আর হয়ে উঠে না। আর এতে করে যারা মনে প্রাণে একটি দলকে ভালবেসে নিজেদের সবকিছু সপে দেন, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন তারা। তারা দলকে বেশি ভালবাসার কারণে না পারেন দলকে ছাড়তে, আবার দলীয় হাইব্রীড ও কাউয়া মার্কা নেতাদের অনিয়ম, অত্যাচার এবং দল বিরোধী কার্যক্রমে না পারেন প্রতিবাদ করতে।

 

 

কারণ এ ধরণের ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতারা দলের জন্য যতই নিবেদিত প্রাণ হোক না কেন, তাদের যোগাযোগ দলের উচ্চ পর্যায়ের কিংবা নীতি নির্ধারক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত পৌছতে পারে না। অন্যদিকে হাইব্রীড ও কাউয়া মার্কা নেতারা যেহেতু দলে যুক্ত হন বিশেষ সুবিধা হাসিলের জন্য, তাই রাজনীতিকে তারা ব্যবসা হিসেবে মনে করে; এখানে পুঁজি খাটাতে তারা দ্বিধাবোধ করেন না।

 

 

তারা নিজ পকেটের টাকা পয়সা খরচ করে লোক ভাড়া করে মিছিল সমাবেশে লোকজন জড়ো করার নাটকীয়তাও করেন। অন্যদিকে সুবিধাবাদী এসব নেতাদের সুবিধা নিয়ে আবার লাভবান হন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তারা আবার সেসব অনুগত নেতাকর্মীদের সুবিধা নিয়ে কেন্দ্র বা তাদের উপরের সারির নেতৃবৃন্দর কাছে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রকাশ করতে ব্যস্ত হন।

 

 

আর এর বিনিময়ে সেসব নেতাদের আস্থাভাজনের তালিকায় অন্তর্ভূক্তি করেন। যারা বছরের পর বছর দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে বিভিন্ন নির্যাতন ও জেল জুলুমের শিকার হন, তাদের কোন মূল্যায়ন না হলেও সেসব সুবিধাবাদী নেতাদের দলীয় বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত করাসহ উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সুদৃষ্টি থাকে তাদের পক্ষে। এই বিষয়গুলো সব দলের মধ্যে থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এর প্রাধান্য থাকে বেশি।
 

 

এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন এলাকার মধ্য সারির নেতা ও তৃণমূলের কর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্দর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আপনারা যতই লেখালেখি করেন না কেন, যারা সুবিধাবাদী, বিশেষ সুবিধার জন্য রাজনীতি করে তারা গায়ে মাখবে না। কেননা, গায়ে মাখলেতো সুবিধা পাওয়া যাবে না।

 

 

আমাদের দলীয় বড় বড় নেতারাও দেখেন না, নিজ উদ্যোগে তারা দলীয় কোন কাজ করেন না। বরং সাধারণ নেতা কর্মীরা যদি কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করেন, সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বক্তৃতা দিতে তাদের অসুবিধা হয় না। তাছাড়া এখানকার বড় সারির নেতাদের বেশিরভাগই একটি বিশেষ পরিবারের হয়ে কাজ করেন। তাদের কাছে দলের কি হলো তাতে কিছু আসে যায় না।

 

 

তাদের কাছে দলের চেয়েও বড় দায়িত্ব; সেই পরিবারের গুণগান করা। দলীয় কোন কর্মসূচীতে দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকলেও সেখানে তাদের উপস্থিত না হওয়ার জন্য তাদের বিভিন্ন উছিলা থাকে। কিন্তু সেই বিশেষ পরিবারের দলের বাইরের কোন নেতার ডাকেও তারা সবার আগে সেখানে উপস্থিত থাকার প্রতিযোগিতায় নামেন।

 

 

এখানকার ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতারা আরও অভিযোগ করে জানান, সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনসহ নাসিকের নির্বাচনে তাদের ভূমিকা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাবস্থায়ও এখানকার বড় বড় পদগুলোতে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির নেতৃবৃন্দ কেন অবস্থান করছেন তা একটু তলিয়ে দেখলেই স্পষ্ট বুঝতে পারবেন।


 

 

নারায়ণগঞ্জ শহরের বাস করা আওয়ামী লীগের আরেক সদস্য হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এখন রাজনীতিতে আর রাজনীতিবিদরা নাই। যারা আছে তারা সুবিধাবাদী। অনেকেই তাদের পূর্ব পুরুষের অবদান ও খ্যাতি বিক্রি করে এখন রাজনীতি করছেন। তা নাহলে আমাদের ফতুল্লায় একজন চিহ্নিত বিএনপি নেতা, হুট করে কিভাবে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে পারেন? 

 

 

বন্দরে কীভাবে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে ভোট চাইতে পারেন। এমনকি আমাদের কাছে খবর আছে বন্দরে ইউনিয়ন নির্বাচনে রাজাকার পরিবারের একজন চিহ্নিত সদস্যর পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতারা ভোট চেয়েছেন। এটা কি করে সম্ভব হয়! 

 

 

নারায়ণগঞ্জে একটি পরিবারের ডাকে কোন সভা-সমাবেশে এত লোকের উপস্থিতি থাকলেও কেন একটি সম্মেলনে যেখানে দলীয় কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ সারির নেতাদের উপস্থিতিতেও কেন এত ছোট একটি স্টেডিয়ামও খালি থাকে।
 

 

এই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি প্রতিবাদ করতে দেখা যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। গত ২৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ ওসমানী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যখন বিভিন্ন বলয়ের বিভিন্ন ভাইদের নামে মিছিল নিয়ে লোকজন আসতে থাকেন; তখন এর তীব্র প্রতিবাদ জানান মেয়র।

 

 

তিনি বলেন, ‘এখানে (সম্মেলনে) আসার পর থেকেই দেখছি শুধু ভাইদের নামে স্লোগান দিতে। নেত্রীর (শেখ হাসিনার) নামেতো একবারও স্লোগান দিতে দেখালাম না। শেখ হাসিনা না থাকলে এ বাংলাদেশ থাকবে না, এখানে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলতে পারবে না সেই নেত্রী আমাদের ভরসাস্থল; তার কথা বলুন। নামে নামে স্লোগান নয়, শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দিন।’

 

 

তিনি আরও বলেন, ‘নেতা-কর্মীরা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করবেন না, দরকার নাই। আওয়ামী লীগের সকল কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে তুলে ধরুন। আওয়ামী লীগের এই ক্রান্তিকালে সকল ভেদাভেদকে ভুলে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। মেয়র শুধু যে সেদিনই প্রতিবাদ করেছেন তা নয়, এর আগেও তিনি দলীয় প্রীতি বাদ দিয়ে; ভাই প্রীতি করার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এন.এইচ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন