দুদকের তদন্তের আওতায় শামীম ওসমানের দুই ঘনিষ্ঠ
রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২২, ০৫:১৬ পিএম
# শওকত চেয়ারম্যানের বিষয়ে তদন্ত চলমান
# জেলা আদালতের সাবেক পিপির বিরুদ্ধে দুদকে মামলা
# লম্বা হতে পারে দুদকে অভিযোগের তালিকা
বিভিন্ন সময় নানা ইস্যুতে আলোচনা সমালোচনায় থাকেন এমপি শামীম ওসমান কিংবা তার ঘনিষ্ঠজনরা। এবার নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানের দুই ঘনিষ্ঠজনকে নিয়ে নগর ছেলে জেলা জুরে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা সমালোচনা তৈরী হওয়া দুই ব্যক্তিকে নিয়ে দূদকে অভিযোগ হয়েছে। তার মাঝে একজনকে নিয়ে দূর্নীতি দমন কমিশন দূদক মামলা করেন।
এমনকি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়। আর একজনকে নিয়ে এখনো তদন্ত চলমান আছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্যতা পাওয়া গেলে তিনিও আইনের আওতায় এসে দুদকের জালে আটকে যেতে পারেন। তার মাঝে জেলা আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এস এম ওয়াজেদ আলী খোকন ও তার স্ত্রী সেলিনা ওয়াজেদ মিনুর বিরুদ্বে পৃথক ভাবে ২০২১ সনের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে দুদক মামলা করেন।
অপরদিকে সম্প্রতি মাস দূয়েক আগে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকতের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দূদকে অভিযোগ দেয় স্থানীয়রা। যদিও তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবী করেছেন। পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন এবং বক্তাবলীর নৌকার চেয়ারম্যান শওকত আলী দুজনেই এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই সাংসদের আশীর্বাদেই তারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসেন।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক এড. ওয়াজেদ আলী খোকন ও তার স্ত্রী সেলিনা ওয়াজেদ মিনুর বিরুদ্ধে গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বাদী হয়ে মামলা দু’টি দায়ের করেন।
প্রথম মামলার অভিযোগে বলা হয়, এসএম ওয়াজেদ আলী খোকন, পাবলিক প্রসিকিউটর, নারায়ণগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে তার নিজ নামে ও তার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে ৮৫ লাখ ৩২ হাজার ৩৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য প্রদর্শন না করে গোপনপূর্বক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দেন।
তা স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে গোপন করা সম্পদসহ মোট ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৫ টাকার জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে দখলে রাখায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
একই সাথে অপর আরেক মামলায় বলা হয়, মিসেস সেলিনা ওয়াজেদ মিনুর দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে তার নিজ নামে ২৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৬১ টাকার সম্পদের তথ্য প্রদর্শন না করে গোপনপূর্বক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করে। স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে গোপন করা সম্পদসহ মোট ১ কোটি ১ লাখ ৫৬ হাজার ১৭৪ টাকার জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার অভিযোগে মামলা করা হয়।
অপরদিকে মাস দুয়েক আগে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যূতে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক কার্যালয়ে এলাকা-বাসি অভিযোগ দেয়। যার অভিযোগের প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট তদন্ত করছেন। দূদকে শওকত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে করা অভিযোগে উল্লেখ্য করা হয়, মানুষের জমি কেটে ইট ভাটা মাটি নেন এই আওয়ামী লীগ নেতা।
আমরা বক্তাবলী এলাকার নদী বেষ্টিত এলাকার সাধারন হত দরিদ্র জনগোষ্ঠি আমরা বেশীর ভাগ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের বক্তাবলী রহমান মুন্সির ছেলে ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী,ক্ষমতার দাপটে এলাকার জনসাধারনের কৃষি আবাদী জমির মাটি কেটে, তার নিজের ইটের ভাটায় জোরপূর্বক নিয়ে যায় এবং অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একই সাথে আবাদী জমি ১০/১৫ ফুট গভীর করে জমিগুলিকে চিরতরে চাষাবাদের অনপুযোগী করে ফেলছে ।
নদীর পাড়ে জেগে উঠা চর অত্যাধূনিক ক্রেন ব্যবহার করে মাটি কেটে ইট ভাটায় নিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা বিক্রয় করে বাণিজ্য করছে প্রায় ৫ বছর যাবত। আর এতে করে গত ৫ বছরে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। বি.আই.ডব্লিউ.টিএ প্রতি বছর বার্থিং এর যে টেন্ডার হয় তখন তিনি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অন্য কাউকে সিডিউল ক্রয় করতে না দিয়ে তাতে বাধাগ্রস্থ করে এককভাবে তার লোক দিয়ে ৩ লক্ষ টাকায় বার্থিং টেন্ডার নেন।
বক্তাবলী এলাকায় প্রায় ৭২টি ইট ভাটা রয়েছে। প্রতিটি ইটভাটা থেকে বার্থিং এর জন্য ২ লক্ষ টাকা নেয়া হয়। এতে মোট টাকা দাড়ায় ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা। এখানে সরকারী ভাবে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এলাকার ৭২ টি অবৈধ ইটভাটার সভাপতি এই প্রভাবশালী শওকত চেয়ারম্যান ।
তার ক্ষমতার দাপটে এই ১৫ বৎসর যাবত এই পদ দখল করে আছেন এবং প্রতিটি ইট ভাটা থেকে প্রতিবছর পরিবেশ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ইটভাটা চলাকালীন সময়ে ভেকু দিয়ে ইটভাটা ভাঙ্গার ভয় দেখিয়ে প্রতিটি ভাটা থেকে ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন। আর পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা শাখায় দেয় ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা । বাকী ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকা তিনি নিজে আত্মসাৎ করে । এতে ৭২টি ইটভাটা থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেন এই প্রভাবশালি আওয়ামী লীগ নেতা।
দরিদ্রদের টাকা আত্মসাৎ প্রসঙ্গ টেনে উল্লেখ্য করা হয়: গত ১৫ বছর যাবত শওকত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থেকে প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের বিশেষ বরাদ্ধকৃত হতদরিদ্রদের টাকা তাদেরকে না নিয়ে নিজে আত্মসাৎ করে। অন্যদিকে বক্তাবলীর তহসিল অফিসের তহশিলদারদের যোগসাজসে সাধারন মানুষের জমি খারিজ মিউটেশন নামে বেনামে তৈরি করে সেই জমি তার নিজস্ব কেডার বাহিনী দিয়ে জমি দখল করে শত শত কৃষককে নিঃস্ব করেছে ।
বক্তাবী ঘাট প্রসঙ্গে: বক্তাবলী খেয়াঘাটের টেন্ডার প্রায় ১৫ বছর যাবত তার নিয়ন্ত্রনে চলছে। তার প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে সিডিউল কিনতে না দিয়ে তাঁর ছেলের নামে নামমাত্র টাকায় ডাক নিয়ে আসে। অথচ সবাই যদি ওপেন সিডিউল কিনতে পারতো তবে প্রতি বছর ডাক আসতো প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা। অথচ তিনি তার ছেলের নামে ৭ থেকে ১০ লক্ষ টাকায় টেন্ডার নিয়ে আসে। এখানে সরকার প্রতিবছর রাজস্ব হারাচ্ছে ২৫ লক্ষ টাকা।
এমনিভাবে ১৫ বছরে সরকারের ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সে আত্মসাৎ করে আসছেন। এছাড়া বক্তাবলী ফেরিঘাট প্রায় ১০ বছর যাবত কাউকে সিডিউল কিনতে না দিয়ে তার ক্ষমতা অপব্যবহার করে তার পিএস বাধন এন্টারপ্রাইজ এর প্রোপ্রাইটর আনোয়ারের নামে মাত্র ১৯ লক্ষ টাকা দিয়ে ডাক আনে।
অথচ ওপেন সিডিউল কিনার সুযোগ থাকলে তা ১ কোটি টাকা দাঁড়াতো। সওজ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে প্রতি বছর ডাক নেওয়ার নিয়ম থাকলেও সে প্রভাব খাটিয়ে ৩ বছরের ডাক একসাথে নিয়ে আসে। এতে করে ১০ বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা সরকার রাজস্ব হারিয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়: বক্তাবলী ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ড নির্বাচন এলে প্রতিটি মেম্বার প্রার্থীকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রতিজনের নিকট হইতে ৪/৫ লক্ষ টাকা করে উৎকোচ নেন বলে অভিযোগে বলা হয়। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তাদের টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ৩০ জন প্রার্থী হয়।
সকলের কাছ থেকে প্রায় ১ থেকে দের কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় । তাছাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ নিয়ে ক্ষমতার দাপটে তাঁর ইচ্ছা মত নেতা কিমিটিতে পদ দেয় বলে অভিযোগ উঠে। আর এমপি সাহেবের দোহাই দিয়ে পকেট কমিটি তৈরী করে। এতে প্রায় ১ কোটি টাকার উপর আত্মসাৎ করে।
জায়গা দখল প্রসঙ্গে: বক্তাবলী খেয়াঘাটের সন্নিকটে জোরপূর্বক জায়গা দখল করে তার ছেলে হৃদয় এর নামে হৃদয় স্টীল মিলস স্থাপন করেছে। অথচ এই জায়গা তার বংশের কোন ওয়ারিশকেই বিন্দু পরিমাণ দখল দেয় নাই এবং তার পাশেই আরেকটি বালির ব্যবসা দিয়েছে, জোর পূর্বক জায়গা দখল করে। যার ফলে পরিবেশের অনেক ক্ষতি সাধান হচ্ছে।
এলাকায় সে তার নিজস্ব সিন্ডিকেট বাহিনী গড়ে তুলে। তাদের দিয়ে সাধারণ মানুষের জমির অংশ কিনে মানুষকে হয়রানি করে এবং বিচার শালিশের নামে অন্যায়ভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয় । সাধারন মানুষ তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এছাড়া এলাকার এল.জি.ই.ডি কাজ ও ইউনিয়নের ১% কাজ তার পিএস আনোয়ারকে দিয়ে নিম্ন মানের কাজ সম্পন্ন করে সে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় ।
এলাকাবাসির মতে এই শওকত চেয়ারম্যানের বর্তমানে তার ৪/৫টি বাড়ী, ৫/৬টি শিপিং জাহাজ এছাড়াও নামে বেনামে অনেক ইটভাটা রয়েছে। তার সঠিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দাবী জানিয়ে স্থানীয়রা দূদকে অভিযোগ দেন তার বিরুদ্ধে।অথচ গত ২৫ বছর আগেও তিনি এত সম্পদের মালিক ছিলেন না। তিনি একজন সাধারণ পরিবারের লোক হয়ে সাদা মাটা জীবন যাপন করতেন।
জেলা আদালতের সাবেক পিপি ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এস এম ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, তখন আমাকে সরানোর জন্য মিথ্যা মামলা করা হয়। দুদক ৯০ দিনের মাঝে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও তারা সেই প্রতিবেদন এখনো জমা দেয় নাই। এমনকি আমাকে সহ আর আদালতে ডাকানো হয় নাই। আমার বিরুদ্ধে করা মামলা মিথ্যা হওয়ায় তারা আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে পারে নাই।
এদিকে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত আলী জানান, তার বিরুদ্ধে দুদকে করা অভিযোগ সম্পুর্ণ মিথ্যা। অভিযোগ গুলোর উপর তদন্ত চলছে। মিথ্যা অভিযোগ করে তার সুনাম ক্ষুন্ন করার একটি কুচক্রী মহল উঠে পরে লেগেছে। তিনি বলেন, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমার সুনাম ক্ষুন্ন করতে পারবে না কেউ। তার বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হবে না বলেও তিনি জানান। এন.এইচ/জেসি


