# উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন দীর্ঘসময় সরকার দলীয়দের আস্থাভাজন ছিলেন তিনি
বহুদিন যাবত নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে একটি ধারণা প্রচলণ হয়ে আসছে যে, মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল সরকারের সকল ধরণের চাপের বাইরে।
বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সরকারের দমন-পীড়ণে বিএনপির অন্যান্য নেতাকর্মীগণ যেভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়; অজানা এক রহস্যময় কারণে মুকুল সবসময় অনেকটা নিরাপদ ছিলেন; বলে বিএনপি এবং বিএনপির বাইরের অনেক রাজনীতিবিদই বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে আসছিলেন।
তবে সম্প্রতি মহানগর বিএনপির আহবায়ক কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর যখন দুই পক্ষের মধ্যে কাঁদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয় তখন থেকে এই বিষয়টি আরও বেশি পরিমান আলোচনায় আসে। মহানগর বিএনপির আহবায়ক কমিটির আহবায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুও এই বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে বারবার অভিযোগ করছিলেন।
তাদের অভিযোগ আওয়ামী লীগ সরকারের এই তিন মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বিভিন্ন নেতা কর্মীর উপর হামলা, নির্যাতন ও মামলা হলেও আতাউর রহমান মুকুল সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন। এর কারণ হিসেবে তারা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে মুকুলের আঁতাত বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানসহ বন্দর আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হিসেবে মুকল ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকেন বলে মনে করেন তারা।
আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে আঁতাত করে তিনি দলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে এমনকি দলের ক্ষতি সাধন করেও তিনি তার নিজের স্বার্থ হাসিল করেন বলে জানান তারা। আর সে জন্যই বিএনপির নেতৃবৃন্দ যত নির্যাতনেরই শিকার হোন না কেন; তার উপর কোন আঁচ পড়ে না। তার বিরুদ্ধে দু’একবার মামলা করা হলেও সেগুলো নামে মাত্র।
আওয়ামী লীগের বন্ধুদের বদৌলতে তিনি নিরাপদ থাকেন বলে মনে করেন তৃণমূল বিএনপিসহ একাংশের নেতৃবৃন্দ। তবে এবার নাকি ফাঁদে পড়েছেন আতাউর রহমান মুকুল ও তার অনুসারীরা। আর বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নেতৃবৃন্দের মধ্যে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
যদিও বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে সন্দেহজনক অনেক রকমের কথাই শোনা যাচ্ছে। বিষয়টিতে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন তারা। মুকুল পন্থী নেতাদের মতে হিংসাত্বকভাবে তাদেরকে দমানোর জন্য এই সাজানো নাটকে ফাঁসানো হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপি সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানসহ যে ৭১ জনের নাম উল্লেখ করে বিএনপির ৫ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয় সেই তালিকায় ছিল আতাউর রহমান মুকুলের নাম।
তবে এবারের মামলায় মূল আসামীই করা আতাউর রহমান মুকুলকে। অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদের ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন।
গতকাল ১৯ নভেম্বর বন্দরে নাসিক ২৩নং ওয়ার্ডের কবিলার মোড়ে অবস্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাংচুরের অভিযোগ এনে বন্দর থানায় মামলাটি দায়ের করেন মো. সোহেল নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী। সেই মামলায় আতাউর রহমান মুকুলকে প্রধান আসামীসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২৫-৩০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর, মারপিট, সাধারণ জখম, অগ্নিসংযোগ, হুমকি, সোহেলকে মারধর, মোবাইল লুট ও নগদ টাকা লুটের অভিযোগ করা হয়। এমনকি আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিএনপির মহাসমাবেশে উপস্থিত থাকার জন্য বিভিন্ন সময় বল প্রয়োগ এবং হুমকি ধামকি প্রদান করেন বলে জানানো হয়।
এই ঘটনায় বন্দর থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ পনেছ (৫২), ধামগড় এলাকার সজীব হোসেন (৩৩), কদমরসূলের আজিজুল হক রাজীব (৪৪) ও সোনাচরার হুমায়ুন কবীর বুলবুল (৫০)কে গ্রেফতার করা হয়।
কবিলার মোড় এলাকায় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয় এবং মামলার এক নম্বর আসামি আতাউর রহমান মুকুলের বাড়ি ও তার রাজনৈতিক কার্যালয় খুব কাছাকাছিই অবস্থিত। তবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া বাদীর বক্তব্য এবং মামলার বিবরণে অনেকটাই অসঙ্গতি ছিল বলে জানা গেছে। এই মামলা ও অভিযোগের কথা অস্বীকার করেছেন আতাউর রহমান মুকুল।
একই সাথে মিথ্যে ও সাজানো মামলা দাবি করে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মহানগর বিএনপির নেতা এডভোকেট জাকির হোসেন, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সবুর খান সেন্টু ও সাবেক সহ-সভাপতি হাজী নুরু উদ্দিন আহম্মেদসহ মহানগর কমিটি থেকে পদত্যাগ করা নেতৃবৃন্দসহ কমিটির একাংশ।
তবে আতাউর রহমান মুকুলের উপর নাখোশ আছেন বিএনপিরই বিরাট একটি অংশ। এর আগে বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে দল বিরোধী কার্যক্রম করাসহ সরকারী দলের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার কথা আলোচনায় আসে। মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ ও বিভিন্ন সময় বিএনপির নেতৃবৃন্দর অভিযোগ থেকে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর যাবত ক্ষমতার বাইরে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি।
এই দীর্ঘ সময়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীদের আর্থিক ও শারীরিকসহ বিভিন্নভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন নেতৃবৃন্দ। তবে এই সময়ে বিএনপির যে কয়জন নেতা লাভের তালিকায় ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়, তাদের মধ্যে আতাউর রহমান মুকুলের নামটিও খুব জোরেশোরে উঠে আসে।
অথচ দলীয় আন্দোলন সংগ্রামসহ কোন কর্মসূচীতেই তার জোরালো কোন ভূমিকা ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিএনপি নেতৃবৃন্দের যে অভিযোগ তাহলো, বিএনপি ক্ষমতায় না থাকলেও আতাউর রহমান মুকুল ঠিকই তার উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ধরে রেখেছেন।
দলীয় কোন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ না করলেও সরকারি দলের কর্মসূচিতে তিনি ঠিকই অংশগ্রহণ করতেন। শুধুই কি তাই! সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুকুল খুবই বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেন বলে ক্ষোভ রয়েছে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়েও।
দলীয় সমর্থনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঐক্যজোটের প্রার্থী এসএম আকরাম, মুকুলের বিরুদ্ধে কেন্দ্র থেকে বিএনপির সমর্থকদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেন, বলে জানা যায়।
ফলে তূণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ধারণা, মুকুলরা ক্ষমতায় না থেকেও লাভবান হতে পারেন। দলের কঠিন মুহুর্তে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীরা বিভিন্নভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হলেও তারা ঠিকই ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। এন.এইচ/জেসি


