না’গঞ্জ আওয়ামী লীগকে সতেজ ও চাঙা রাখার দায়িত্ব কার
লতিফ রানা
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২২, ১২:১২ পিএম
# সম্মেলনের তুলনায় শামীম ওসমানের জনসভায়ই লোক সমাগম বেশি
# কেন্দ্রীয় কর্মসূচী না থাকায় নিশ্চুপ বলে মনে করেন শামীম ভক্তরা
গত ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হলো নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। এই সম্মেলনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ছিল ব্যাপক ব্যস্ততা। এর একদিন পরই হওয়ার কথা ছিল মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে, জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন থেকেই তা স্থগিত ঘোষণা করে নতুন করে সময় নির্ধারণ করা হবে বলে জানানো হয়।
দীর্ঘ প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় পর হতে যাওয়া জেলা আওয়ামী লীগের এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কর্মতৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘ এই সময় একই নেতৃত্বের কারণে অতিষ্ঠ নেতাকর্মীরা; এবার নতুন নেতৃত্ব আসবে ভেবেই হয়তো; এবারের সম্মেলনকে কেন্দ্র তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল বাধ ভাঙা জোয়ারের মতো।
অন্যদিকে খুবই ব্যস্ত সময় পার করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান ও তার অনুগতরা। যেদিন থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের বিষয়টি আলোচনায় আসে; তারপর থেকে কমিটির নেতৃত্বে, শামীম ওসমানের আসার বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ছিল টক অব দ্য টাউন।
বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হচ্ছিল; যা বিষয়টিকে আরও বহুগুন বৃদ্ধি করে আলোচনার ঝড় তুলতে শুরু করে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে লক্ষ্য করা যায় পদ প্রত্যাশী নেতৃবৃন্দের ভীড়।
কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সেই পূর্বের কমিটির নেতৃত্বকেই বহাল রাখায়; নেতৃবৃন্দ কতটা হতাশ। তারই যেন বহি:প্রকাশ ঠিক তার পর থেকেই দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হঠাৎ করে চুপটি মেরে যাওয়া।
রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে গত ইউপি নির্বাচন ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় অনেক নাটকীয়তা ও অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের ঘটনার পর এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করেই গত কয়েক মাস যাবত আওয়ামী লীগের মাঠকে গরম করে রেখেছেন বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী এই নেতা।
এরই মধ্যে তিনি বিভিন্ন অপশক্তির নাশকতা ও ষড়যন্ত্র ঠেকাতে একাধিক কর্মসূচীও পালন করেন। তবে সম্মেলনের পর থেকেই শামীম ওসমানকে আর কোন রাজনৈতিক কর্মসূচীর নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা না যাওয়ায় একই সাথে চুপ হয়ে গেছেন তার বিশাল সমর্থক ও বাহিনী। যাতে স্পষ্ট হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের কর্মসূচীতে সাংসদ শামীম ওসমানের কতটা প্রভাব।
তবে সম্মেলন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কর্মসূচীও শেষ হয়েছে বলে, মেনে নিতে নারাজ সাংসদ শামীম ওসমান সমর্থিত নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে কেন্দ্র থেকে আপাতত কোন কর্মসূচী নির্ধারিত না থাকায় নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের কোন কর্মসূচীর দেখা মিলছে না।
তবে তাদের নেতা শামীম ওসমান তাদেরকে বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটিগুলোর সাথে যোগাযোগ রেখে এবং কর্মী সমাবেশ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান তারা।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র মতে দেশে করোনা মহামারি হানা দেওয়ার আগে থেকেই; যখন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের বিষয়টি আলোচনায় আসে তখন থেকেই এর নেতৃত্ব গ্রহণের ইচ্ছে প্রকাশ করে দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামে দৌরঝাঁপ শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা এমপি শামীম ওসমান।
এক পর্যায়ে শামীম ওসমান সেখান থেকে নেতৃত্বের বিষয়ে সবুজ সংকেত পান বলেও মনে করেন অনেকে। নেতৃত্বের জন্য দৌড়ঝাঁপের বিষয়ে একাধিকবার বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদও প্রকাশ করা হয়।
এরপর একদিকে করোনা দাপটে সব কিছু স্থবির হয়ে পড়ে এবং তারপর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে অনেক নাটকীয় ঘটনার অবতারণা হয়।
এই দুটি নির্বাচনে শামীম সমর্থকদের দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে জোরালো কোন ভূমিকা না রাখার অভিযোগ উঠে আসে। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তারা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয় বলেও অভিযোগ করেন; একাধিক আওয়ামী প্রার্থী ও তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।
সিটি নির্বাচনে শামীম ওসমানের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। আর সেই সময় অর্থাৎ সিটি নির্বাচন চলাকালীন সময় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
অনেকেরই ধারণা যেসব কমিটিগুলো (নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগ, জেলা-মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর শ্রমিক লীগ) বিলুপ্ত করা হয়েছে সেগুলোতে শামীম ওসমানের সমর্থকদের নেতৃত্ব ছিল। আর নির্বাচনে অসহযোগিতার কারণেই এগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে।
তবে এরপর থেকে শামীম ওসমান তার সমর্থিত নেতা কর্মীদের চাঙা রাখতে এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ রাখতে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন ইস্যুতেই সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে রাজনীতির মাঠ গরম রাখেন তিনি। যেসব কর্মসূচীতে কেন্দ্রের কোন ভূমিকা নেই বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
এরইমধ্যে গত ২৭ আগস্ট শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে এক সমাবেশের আয়োজন করে তার সমর্থকদের জড়ো করেন তিনি। এরপর গত ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সকল নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় যে লোকের সমাগম ঘটানো হয় শামীম ওসমানের একক ডাকে অনুষ্ঠিত ২৭ আগস্টের জনসভায় তার চেয়েও অনেক বেশি লোকসমাগম ঘটানো হয়েছে।
তবে সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বর্ধিত সভা, প্রস্তুতিমূলক সভা, মাইকিং ও পোস্টারিংসহ মিছিল, র্যালি ও ব্যাপক শোডাউনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে একটি ব্যস্ত আওয়ামী লীগের চিত্র লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সম্মেলন শেষ হতে না হতেই কোথায় যেন মির্লিয়ে গেল নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ।
যেখানে কর্মসূচীর পর কর্মসূচী দিয়ে মাঠ গরম করে যাচ্ছে তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি, সেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে আওয়ামী লীগের টিকিটিরও দেখা নেই। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সম্মেলনে হয়তো সমর্থকরা হতাশ হয়েছেন। আর তাই সেই হতাশা থেকেই এখন নিজেদের লুকিয়ে রেখেছেন তারা। এন.এইচ/জেসি


