# সরকারই দেশটাকে জনগণের জন্য গরম তাওয়ায় পরিণত করেছে : সাখাওয়াত
# এই সরকারে সবকিছুই এখন খাতায় আছে গোয়ালে নেই অবস্থা : খোকা
# লাশের রাজনীতি আওয়ামী লীগেরই ট্রেডিশন : রনি
নারায়ণগঞ্জ এর রাজনীতিতে খুবই একটি পরিচিত নাম ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের তৃতীয় সন্তান একেএম শামীম ওসমান। শুধুমাত্র যে নারায়ণগঞ্জ তা নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেই বিশেষভাবে পরিচিত তিনি।
তার দীর্ঘ এই রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময় তিনি রাজনীতির সিংহ পুরুষ, গডফাদারসহ বিভিন্ন বিশেষণে ভূষিত হন একাধিকবার। তাই তিনি যখনই কিছু বলেন বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা সমালোচনাসহ চুলচেরা বিশ্লেষণের রেষ চলতে থাকে দীর্ঘ দিন ধরে। তাই অনেক সময় তিনি নিজেও মজা করে বলেন, আমরা কথা না বললে পত্রপত্রিকাগুলো সংবাদ পাবে কি করে। তাই যেটাই বলি সেটাই সংবাদ হয়ে যায়।
তবে এমপি শামীম ওসমানের বিভিন্ন গুনাবলীর মধ্যকার একটি বড় গুন হলো তিনি চমৎকার সাজিয়ে গুছিয়ে বক্তব্য দিতে পারেন। সেটা হোক রাজনৈতিক মঞ্চ কিংবা হোক ধর্মীয় মঞ্চ। তার মেধা, উপস্থিত জ্ঞান, সাজানো গোছানো ভাষা ও যুক্তিসহ যেকোন বিষয়ে আগাম সংকেত পাওয়ার বিশেষ ক্ষমতা আছে তার।
আর তাইতো যেকোন নির্বাচনের আগেসহ বিভিন্ন সময় সরকারী গোয়ান্দা সংস্থার পূর্বেই প্রশাসনকেও আগাম বিপদের সংকেত দিয়ে সতর্ক করে দেন এই জাদরেল নেতা। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবারও আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীসহ প্রশাসনকে একটি আগাম তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন এমপি শামীম ওসমান।
গতকাল রোববার নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়েও তিনি তার সেই চির চেনা সতর্কবার্তা ও উপদেশ দিয়েছেন তিনি। তবে বিএনপির নেতৃবৃন্দ তার এই উপদেশ ও সতর্কবার্তাকে একটি রাজনৈতিক স্ট্যন্টবাজি বলে উল্লেখ করেছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এই সাংসদ আরও বলেন, তারা কি করতে চায়, তারা লাশ চায়। যে তিনটা জায়গাকে টার্গেট করা হয়েছে তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ এক নাম্বারে। একই সাথে তিনি বিএনপির নেতাদের উদ্দেশ্যেও আগাম উপদেশ দিয়ে সাবধান করেছেন। বিএনপি নেতাদের বলতে চাই, আপনারা ক্ষমতার কাছেও আসবেন না।
আপনারা আপনাদের পলাতক নেতার নির্দেশে মাঠে লাফাচ্ছেন। মিষ্টির দোকানের সামনে বড় তাওয়া থাকে (পরোটা ছ্যাঁকার জন্য)। চুলায় সে তাওয়া বসিয়ে গরম করা হয়। গরম হওয়ার পরে সেটায় পরোটা দেয় আর এক সেকেন্ডে হয়ে যায়। আপনারা তাদের তাওয়া। আপনাদের গরম করে তারা খেলছে।
তিনি বলেন, অনেকে বলেন আমি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছি (২০০১-এর নির্বাচনে গিয়াসের কাছে হেরে যাওয়ার পর)। আমি যাইনি, আমি পঙ্গু ছিলাম। নেত্রীর নির্দেশে আমাকে যেতে হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে অনেক খুনীদের আস্ফালন দেখছি।
বিএনপি নেতা তৈমূর ভাইয়ের ছোট ভাই সাব্বিরকেও হত্যা করা হয়েছিল মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলায়। তিনি বলেন, আমি ভোটে পাশ করেছিলাম। নেত্রী বলেছিলেন ঢাকা বিভাগে একমাত্র তুমিই পাশ করেছো। ঢাকায় আমার বাড়ির পেছনে গর্ত করে ঢোকা হয়েছিল। পরে আমার ফলাফল বদলে দেয়।
শামীম ওসমানের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি বলেন, মানুষ মারার বিষয়ে বিএনপিকে নিয়ে শামীম ওসমান প্রায়ই যে বক্তব্যটি দেন এটা ওনাদের (দলীয়) বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড। ওনারা যখনই কিছু করে, তখন সেটাকে তারা সুন্দরভাবে গুছিয়ে করে, যাতে করে সেখান থেকে তারা পার পেয়ে যেতে পারে।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের যুবদলের কর্মী শাওনকে গুলি করে হত্যা করেছে, মুন্সীগঞ্জে আরেক শাওন, বরিশালের নূরে আলম, অনিক নামের এক বিএনপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, ব্রাহ্মনবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে ছাত্রদলের সহসভাপতি নয়নকে গুলি করে হত্যা করেছে। এগুলো আওয়ামী লীগের একটি ট্রেডিশন। ঐতিহ্যগতভাবেই তারা এগুলো করে থাকে।
এগুলো করে তারা বিএনপি নেতাকর্মীসহ মানুষের মনে একটি ভয় তৈরি করার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষ যেন রাস্তায় না নামে, কোন প্রতিবাদে বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেন কোন কথা না বলে সেজন্য তাদের এই প্রচেষ্টা। তবে আমি মনে করি এবার এধরণের খুন করে বা মানুষের রক্তের হলি খেলার মাধ্যমে তারা সামনে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করবে। আমরা সাধারণ মানুষকে নিয়ে এটা প্রতিহত করবো।
আমরা সাধারণ মানুষকে নিয়ে ১০ ডিসেম্বর সমাবেশে অংশগ্রহণ করব। তবে তিনি হয়তো তার বক্তব্যের মাধ্যমে তার নেতাকর্মীদেরকে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা বা নির্যাতন করা কিংবা খুন করার জন্য দিয়ে থাকতে পারে। তবে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি তার সহযোগী ও অঙ্গসংগঠন গুলোকে নিয়ে তা প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত আছে।
তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি অনেক কথাই এডভান্স বলে ফেলে। তবে সকল কর্মকাণ্ডের পিছনে ওনার হাত আছে। ওনারা দীর্ঘ ১৪ বছর যাবত ক্ষমতায় আছেন, আমি বিশ্বাস করি এই ১০ ডিসেম্বরের আগে বা পরে ওনার নেতাকর্মীরা ওনার নির্দেশ পালন করবে না। কেননা, কিছু হলে ওনিতো ওনার পরিবারবর্গ নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাবেন।
কিন্তু তারা (অন্যান্য নেতাকর্মীরা) কি করবে? তারাতো সবাই দেশের বাইরে চলে যেতে পারবে না। তাই আমাদের বিএনপি নেতাকর্মীদের যে, হামলা, মামলা বা নির্যাতন করবে এবার আওয়ামী লীগ যারা করে, তারা ওনার ফাঁদে পা দিবে না। আর ওনার দেশ ছাড়ার বিষয়ে যাই বলেন না কেন তা ওনার রাজনৈতিক বক্তব্য। এর বাস্তবতাটা আপনারা আমরা সবাই জানি।
বিএনপির লাশের রাজনীতি এবং ক্ষমতায় না আসতে পারার বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক লুৎফর রহমান খোকা বলেন, এ ধরণের বক্তব্য শামীম ওসমানের একটি রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। একটি কথা বানিয়ে বলে দিলাম আর তা চলে গেল। এই কথায় যে আধ্যাত্মিকভাব, তার আগা-গোড়া খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রয়োজন মত পরপর ব্যবহার করার জন্য একাধিক নাটক সাজিয়ে রাখে (দাবা খেলার মত)। তবে বিএনপি এসব দাবার গুটির মারপ্যাচে যায় না। তারা সরলভাবে রাজনীতি করে। মানুষের কল্যাণে আসে না, এমন কোন চর্চা বিএনপি করে না। যেখানে মানুষের কল্যাণ নিয়ে আমাদের কাজ সেখানে আমরা হারলাম নাকি জিতলাম সেই বিষয়টা আমাদের কাছে বড় না। মানুষের জন্য কাজ করি এটাই বড়।
আজকে ব্যাংক, ব্যবসা, বিদেশী ঋণসহ দ্রব্যমূল্যের যে অবস্থা তা খুবই শোচনীয়। শ্রীলঙ্কার যে অবস্থা আমরা তার চেয়েও আরও কঠিন অবস্থায় আছি। কিন্তু বিষয়টা ধরা দিচ্ছে না। দেশের অবস্থা এখন কাজী সাহেবের গল্পের মতো। খাতায় আছে গোয়ালে নেই। এই সরকারে সবকিছু খাতা-পত্রে ভরপুর। যা জনগণের কাছে প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই জাতি এখন খুবই মুমূর্ষ অবস্থায় আছে।
স্বাধীনতার পর দেশের এমন অবস্থা আর হয়নি, মানুষ সব নীরব কান্নায় আছে। এমনিতেই বৈশ্বিক সমস্যা, তার সাথে সাথে তাদের দুর্নীতি ও লুটপাটের খেলামেলায় পৃথিবীর সকল দেশকেই পিছনে ফেলে দিয়েছে। যার মাধ্যমে দেশের ১৭ কোটি মানুষকে রক্তাক্ত করে ফেলছে। এর মধ্য থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই আমরা সরকারকে বাধ্য করার জন্য চেষ্টা করছি। আর আমাদের পাশে থেকে জনগণও আমাদের সভা-সমাবেশ সফল করার চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে মহানগর বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, শামীম ওসমানের এই বক্তব্য একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। সে তার দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এমন বক্তব্য দিয়েছে। তবে আমরা মনে করি এই সরকারই আজ এই দেশটাকে জনগণের জন্য একটি গরম তাওয়ায় পরিণত করেছে। তাই এই সরকারের উপর আজ জনগণ দারুনভাবে ক্ষুদ্ধ এবং এই সরকারের কার্যকলাপে জনগণ আজকে দিশেহারা।
দ্রব্যমূল্যের আজকে এমন অবস্থা যে, দেশ আজ একটি দুর্ভিক্ষজনক অবস্থানে যাওয়ার পরিস্থিতির সৃৃষ্টি হয়েছে। এখন বিএনপি কিংবা তারেক রহমানের নেতৃত্ব ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করছে না। আমাদের আন্দোলন এই দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা কায়েম করা। যেখানে নিরপেক্ষ একটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেই নির্বাচনে জনগণ যাকে চাইবে তাকেই সরকারের দায়িত্ব অর্পণ করবে।
ক্ষমতা দখল করে রেখে দিনের ভোট রাতে করার নির্বাচনের কারণেই আজকে দেশের এই অবস্থা। আর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপিদের দুর্নীতির কারণেই এই দেশটিকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যার জন্য দেশে ডলার সংকটসহ বিদেশী পণ্য আমদানী করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, যত স্বৈরাচারী সরকারই থাকুক না কেন, জনগণের শক্তির কাছে কোন শক্তিই কিন্তু টিকেনি। তাই আওয়ামী লীগ যত ক্ষমতাই দেখাক, এ ক্ষমতাও ক্ষণস্থায়ী। এরা জনগণের চাহিদার কাছে আন্দোলনের কাছে পরাজিত হবেই। এদেশে জনগণের ভোটের অধিকার এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।
শামীম ওসমানের লাশ চাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপির আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। এখানে কোন হিংসাত্মক, ধ্বংসাত্মক বা আইন ভঙ্গ করার উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপিসহ দলের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য শুনলে বুঝা যায়, তারা চাইতেছে বিএনপিকে টেনে ভায়োলেন্সে জড়াতে।
তবে আমরা এবং আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সরকারের সে অবস্থানটা বুঝতে পেরেছি। তাই আমরা সরকারের পাতা ফাঁদে পা দিব না। আমাদের সকল আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ এবং জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।
এস.এ/জেসি


