# হার্ডলাইনে প্রশাসন, উদ্বিগ্ন জনগণ
# রাতেই সমাবেশস্থলে জড়ো হচ্ছেন বিএনপি কর্মীরা
প্রায় মাস দুয়েক আগেই ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ভেন্যু নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ করা নিয়ে আওয়ামীলীগ-বিএনপি-প্রশাসনের ত্রিপাক্ষিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসন থেকে দেয়া ভেন্যুতে বিএনপি ঢাকার সমাবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এদিকে বিএনপির দাবি করা ভেন্যুতে সমাবেশ করার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখায়নি প্রশাসন। এদিকে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএনপির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামীলীগ কর্মীরা। ফলে সমাবেশের রাজনীতি এখন সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসন এখন যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মির্জা আব্বাসকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে আটক করেছে বলে দাবি করেছে তাদের পরিবার। এই পরিস্থিতিতেও বিএনপির নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১০ ডিসেম্বর যে কোন মূল্যে ঢাকায় সমাবেশ করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যেও আতঙ্ক এবং উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর কী কী হতে পারে তাই নিয়ে এখন মশগুল সর্বস্তরের মানুষ। এদিকে সর্বশেষ গোলাপবাগ খেলার মাঠের কোনো ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে বিএনপিকে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)।
শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) রাত ১০টা ৩৭ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স গোলাপবাগ খেলার মাঠ ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আকরামুজ্জামান শর্ত সাপেক্ষে এই অনুমতি দেন।
রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের। রাতেই শনিবারের গণসমাবেশ উপলক্ষে আগত বিএনপি নেতাকর্মীরা গোলাপবাগ ছাড়িয়ে ধলপুর, মানিকনগর ও সায়েদাবাদে অবস্থান করছেন। ঢাকা মহানগর বিএনপির তত্ত্বাবধানে নির্মিত হচ্ছে মঞ্চ। রাত সাড়ে ৭টায় শুরু হয় মঞ্চ নির্মাণ।
মাঠের পশ্চিম পাশে নির্মাণাধীন মঞ্চের কাজে ডেকোরেটরের লোকজন ছাড়াও দলীয় কর্মীরা সহযোগিতা করছেন। বিএনপির এক নেতা জানান, রাত ১২টার পর থেকে মাইক লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে। বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ ও আশেপাশের জেলায় ঢাকার এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই নানাভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের টার্গেট করেছে প্রশাসন।
একের পর এক মামলায় বিএনপি কর্মীদের ঢোকানো হয়েছে। আতঙ্কে বাড়ি ছাড়া বিএনপির কর্মীরা। জেলার অধিকাংশ নেতা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বাড়িতে অবস্থান করেননি। এরপরেও জেলা বিএনপির আহবায়ক মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, যুগ্ম আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবি, সদস্য সচিব গোলাম ফারুক খোকনসহ অধিকাংশ নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনিকে পল্টন থেকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডিসেম্বরের শুরু থেকে দিন যতই গড়িয়েছে ততই বিএনপি কর্মীদের নাশকতা মামলায় ধরতে তৎপর হয়েছে প্রশাসন অভিযোগ বিএনপি কর্মীদের। তারা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, বিএনপি নেতাদের না পেয়ে তাদের স্বজনদেরও হয়রানি করা হচ্ছে।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে না পেয়ে তার ছেলেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদিকে কয়েকদিন আগে বিএনপি নেতা মামুন মাহমুদের ব্যক্তিগত সহকারী, ড্রাইভারকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আবদুস সবুর খান সেন্টুর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে।
তাছাড়া মহানগর বিএনপির আহবায়ক এড.সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে খুঁজছে পুলিশ। যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরাই গ্রেফতার আতঙ্কে গাঁ ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। তবে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশকে সফল করতে আহবান জানিয়ে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেফতার এবং নতুন করে ঢাকায় আরো কয়েকটি মামলার পরেও বিএনপি কর্মীরা ঢাকার সমাবেশ সফল করতে চাইছেন। গ্রেফতারকৃত বিএনপি কর্মীদের জামিনের জন্য আইনজীবীদের বেশ কয়েকটি প্যানেলও গঠন করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যে কোন ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে দুই তিনদিন আগেই সতর্কতা অবলম্বন করছেন। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। তাছাড়া কাউকে সন্দেহ হলেই তল্লাশী করছেন তারা। ঢাকায় প্রশাসন থেকে বেধে দেয়া সমাবেশের ভেন্যু বিএনপি গ্রহণ না করায় আরো উত্তেজনা বেড়েছে রাজনীতির মাঠে।
প্রশাসনের সাথে সাথে বিএনপির এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে তৎপরতা বাড়িয়েছে আওয়ামীলীগ। ১০ ডিসেম্বর পাড়া-মহল্লায় পাহারা বসানোর কথা বলছে আওয়ামীলীগ নেতারা। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ মহানগর ও জেলা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় সভাও করছেন। প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে আওয়ামীলীগের কর্মীরাও স্থানীয়ভাবে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন।
ফলে রাজনৈতিক মাঠের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার শহরের ২নং রেলগেট এলাকায় আওয়ামীলীগ নেতারা দফায় দফায় গোপন বৈঠক করেছেন। জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবদুল হাই, জাতীয় পরিষদের সদস্য এড. আনিসুর রহমান দিপু, আওয়ামীলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাতসহ বেশ কয়েকজন জেলার শীর্ষ নেতারা বিএনপিকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান আওয়ামীলীগের কর্মীদের হুঁশিয়ার থাকার আহবান জানিয়েছেন। যার দরুণ মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম, জিএম আরমান, মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকনসাহা, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ নেতারাও ১০ ডিসেম্বর বিএনপির সমাবেশকে নিয়ে হুঁশিয়ার থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ শহরে বিএনপির সমাবেশের দিন একটি ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগের সম্মেলন করারও কথা রয়েছে। এদিকে বিএনপির সমাবেশকে সমর্থন করে ১০ ডিসেম্বর মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। উদ্ভুত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা নিয়ে সংশয়ে সাধারণ মানুষ।
এস.এ/জেসি


