# সকল বাধা এড়িয়ে জনগণের সমাবেশ সফল করাই বড় প্রাপ্তি : মামুন মাহমুদ
# সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির বার্তা জনগণ গ্রহণ করেছে : সাখাওয়াত
# এই সমাবেশ কর্মসূচীর প্রথম ধাপের বিজয় : গোলাম ফারুক খোকন
# এই সমাবেশের প্রমাণিত হয়েছে যে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি : সেন্টু
গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে দেশের ১০ বিভাগীয় শহরে কর্মসূচী শুরু করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
ধারাবাহিকভাবে ৯টি বিভাগের সমাবেশ সম্পন্ন করার পর এই কর্মসূচীর সমাপনী করার কথা ছিল ঢাকা বিভাগীয় কর্মসূচীর মাধ্যমে। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরাই বিএনপির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তাই ৯টি বিভাগীয় সমাবেশ সম্পন্ন করার পর এই সমাবেশটি ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিএনপির অভিযোগ এই কর্মসূচী বাস্তবায়নে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল সমাবেশের স্থান নিয়ে।
অন্যদিকে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় বিএনপির এই কর্মসূচীতে নাশকতা ও নৈরাজ্যমূলক কর্মকাণ্ড হতে পারে বলে সমাবেশের আগের দিন দুপুরে সমাবেশের স্থান নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর গোলাপবাগ এলাকায় এই আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।
এরপর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন মহল থেকে এই সমাবেশ থেকে বিএনপির প্রাপ্তির বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। তবে সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ রাজনৈতিক বোদ্ধামহল থেকে প্রশ্ন উঠে।
দেশব্যাপী এত ঘটা করে এত সভা-সমাবেশ, মিছিল মিটিং, পরিবহন ধর্মঘট, সমাবেশের ২/৩দিন আগে থেকেই বিভিন্ন বিভাগ থেকে কর্মী সমর্থকদের উপস্থিতি এবং সবশেষে ১০ ডিসেম্বরের ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে গত ৭ ডিসেম্বর বিএনপি নেতাকর্মীর সাথে পুলিশের সংঘর্ষ, হতাহত ও গ্রেফতারসহ বিভিন্ন নাটকীয়তার পর অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ থেকে বিএনপির প্রাপ্তি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই দেশব্যাপী একটি আলোচনা শুরু হয়।
মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সবুর খান সেন্টু বলেন , এই আন্দোলন সংগ্রামে আমরা একশত ভাগ সফল করার জন্য আমাদের নেতা খন্দকার মোশারফ হোসেন যে দাবি ঘোষণা করেছেন সেই ১০টি দাবি সরকারকে মানানোর জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে একটি যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়েছে।
যার প্রথম কর্মসূচী শুরু আগামী ২৪ ডিসেম্বর থেকে। সেদিন আমাদের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও কর্মসূচী থাকবে। একটি রাজনৈতিক সফলতা তখনই আসবে যখন এই অবৈধ সরকারের পতন ঘটবে। সেই পতনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের জনগণের আশা আকাঙ্খা প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এই দেশের জনগণের গণবিপ্লবের মাধ্যমেই এই সরকারের পরিবর্তন ঘটবে। তবে এই গণবিপ্লব শান্তিপূর্ণ হবে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন ১০ ডিসেম্বর গোলাপবাগে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের হাতে কোন লাঠিসোটা ছিল না। তারা খালি হাতেই রাজপথ মিছিল ও স্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলেছে। এই সমাবেশের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি।
আমাদের যেসব নেতাকর্মী শারীরিকভাবে অসুস্থ তারাও এখানে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে একটি সমাবেশকে বাস্তবায়নে আয়োজনের কয়েকদিন আগে থেকেই এধরণের দল প্রেমিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে বাস্তাবায়ন করেন।
তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও আছে কি না, আমার জানা নাই। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্নভাবে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে জানতে পেরেছি সরকারী দলের লোকেরা তল্লাশীর নামে সাধারণ নিরাপরাধ মানুষের টাকা পয়সাও লুট করে নিয়ে গেছে।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব গোলাম ফারুক খোকন জানান, বিএনপির বড় একটি বিজয় হলো এত বাধা বিঘ্ন উপেক্ষা করে ধরপাকড়ের পরও এই সমাবেশটা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওয়ারীতে যুবদলের নেতাকে ধরতে গিয়ে তার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। নারাণয়গঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে বাসায় না পেয়ে তার সন্তানকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ।
পাড়া-মহল্লায় লোক বসিয়ে বাধাসহ এরকম অনেক ঘটনা ঘটানোর পরও তারা সমাবেশকে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। এর চেয়ে বড় বিজয় আর কি হতে পারে।
তিনি বলেন সমাবেশকে কেন্দ্র করে এর আগে সারা বাংলাাদেশেই অভিযান চালিয়ে বিএনপির মহাসচিব থেকে শুরু করে অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে আটক করলো। তারপরও এর কোন প্রভাব সমাবেশে পরেনি। তাদের এধরণের কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ আরও আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী হচ্ছে।
এবং আমাদের দু’একটি দলীয় দাবি ছাড়া (দলীয় প্রধানসহ সকল নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি) বাকি সবই যে জনগণের দাবি, দেশের মানুষের দাবি। এগুলো তারা বুঝতে সক্ষম হয়েছে।
আমাদের প্রতিটি সমাবেশের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে একদিনের কর্মসূচী আটকাতে সরকার তিনদিন আগে থেকেই ধর্মঘট (পরিবহন ধর্মঘট) দিয়ে রেখেছে। নদীর খেয়া পারাপার বন্ধ করে দিয়েছে মানুষ সাঁতরিয়ে, কলার ভেলা বানিয়ে হাজির হয়েছে। বাস-ট্রেন বন্ধ করে দেওয়ার পরও মানুষ হেটে এসে হাজির হয়েছে।
চিড়া-মুড়ি নিয়ে তিনদিন আগে থেকেই সেখানে হাজির হয়েছে। তারপরও সমাবেশের স্থান নির্ধারণ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা যে জনগণের কথা ভাবি, জনগণকে নিয়ে কাজ করতে চাই তা তারা বুঝতে পেরেছে। এই বিজয় কর্মসূচীর প্রথম ধাপের বিজয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মহানগর বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, এই সমাবেশ থেকে বিএনপির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো জনগণের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে একটি বার্তা পৌছেছে। সরকার এই জনসভাকে নস্যাৎ করার জন্য এমন কোন হীন কর্মকাণ্ড নেই যেটা তারা করেনি।
সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে সমাবেশের স্থান দেওয়া হয়েছে। রাস্তা-ঘাটে বিভিন্ন যানবাহন বন্ধ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন নেতাকর্মীর নামে মামলা মোকাদ্দমা করা হয়েছে, সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় করা হয়েছে, ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, ঢাকাসহ এর আশেপাশের জেলাগুলোতে অস্ত্রের মহড়া হয়েছে।
এতকিছু করার পরও লক্ষ লক্ষ লোক সরকারের সকল প্রকার বাধাবিপত্তি এড়িয়ে এই সমাবেশে যোগদান করেছে। এই যোগদানের মধ্য দিয়ে জনগণ সরকারসহ বিশ্ববাসিকে একটি বার্তা দিয়েছে যে, জনগণের এই সরকারের প্রতি এখন আর আস্থা ও সমর্থন নাই। তাই এই সমাবেশে আমাদের নেতাকর্মীদের তুলনায় জনগণের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি।
জনগণকে যে আমরা অংশগ্রহণ করাতে পেরেছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখানে সকল পেশা-শ্রেণির মানুষ একত্রিত হয়ে যোগদান করেছে। এই সভা থেকে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য কর্মসূচী দেওয়া হয়েছে। সেই কর্মসূচীর মাধ্যমে আমি মনে করি বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এই কর্মসূচী দুর্নীতি লুটপাট বন্ধসহ দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় বৃদ্ধি বন্ধে সহায়ক হবে।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ৯টি বিভাগে ধারাবাহিক গণসমাবেশ সফল করার পর এই ঢাকার সমাবেশ সফল সবকিছু মিলেই একটি প্রাপ্তি। প্রায় দুই মাস আগে থেকে ঘোষিত এই সমাবেশগুলো ঢাকা সমাবেশের মাধ্যমে সফল সমাপ্তি ঘটেছে।
এই সমাবেশগুলো করতে গিয়ে সারাদেশেই অনেক বাধা বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তারপরও মানুষ কিন্তু সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছে এবং সফল করেছে। বিএনপির এটাই চাওয়ার ছিল এবং উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে সম্পৃক্ত করা, দাবি আদায়ে জনগণকে একটি ছাতার তলে নিয়ে আসা।
তাই আমি মনে করি বিএনপির সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। সারাদেশের জনগণকে বিএনপি একটি ছাতার নিচে এনে দাঁড়াতে পেরেছে। এখানে সরকারের পক্ষ হতে যত বাধা বিপত্তিই এসেছে মানুষ কিন্তু নদী-নালা সাঁতরিয়ে কিংবা নৌকায় পার হয়ে ট্রেনে কিংবা হেটে যে যেভাবে পেরেছে সবাই কিন্তু উপস্থিত হয়ে সমাবেশকে সফল করেছে। এটাই বিএনপির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তিনি আরো বলেন, সাজানো মামলায় খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রেখেছে, তারেক রহমানকে দেশে আসতে দিচ্ছে না, গণতন্ত্রকে হরণ করেছে, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, গ্যাস বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না, পাশাপাশি দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করা হচ্ছে
বিদেশে অর্থ পাচার করে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয়েছে, এই বিষয়গুলো জনগণকে জানিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি তৈরি করে এই সরকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা এই সমাবেশগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল। আমার মনে হয় বিএনপি সেখানে সফল হয়েছে।


