দক্ষিণের ক্ষমতা খর্বে বেড়েছে উত্তরের দাপট
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:৪২ পিএম
# সম্মুখসারিতে থাকারাই অনেকটা পিছিয়ে রইলেন
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানের বিরোধ অনেকটা পারিবারিকভাবেই। মেয়র আইভীর পিতা আলী আহাম্মদ চুনকা ও শামীম ওসমানের পিতা একেএম শামসুজ্জোহার আমল থেকেই এই দুই পরিবারের সাথে দ্বন্দ্ব ছিল বলে এর আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে অনেক সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
সেই সূত্র ধরেই মেয়র ও এমপির বর্তমান দ্বন্দ্ব বলে নারায়ণগঞ্জবাসীসহ সারা দেশবাসীর কানেই এসেছে। তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এই দ্বন্দ্বের সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। যা প্রকাশ্যে আসে ২০১১ সালের সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
এরই মধ্যে নামে কিংবা ইঙ্গিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে সেই দ্বন্দ্বটাকে জিয়িয়ে রাখেন বলে মনে করেন তারা। একই সাথে এর মধ্যে তারা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগকে উত্তর ও দক্ষিণ দুইটি বলয়ে বিভক্ত করেছেন। উত্তর বলয় শামীম ওসমান এবং দক্ষিণ বলয় আইভী বলয় নামে পরিচিতি লাভ করেন।
দুই পক্ষের মধ্যেই আওয়ামী বিরোধী লোকজনকে সঙ্গ দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ উঠে দুই পক্ষ হতেই। তবে এরই মধ্যে এবার নাসিক নির্বাচনের পর থেকেই সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
আগের ধারাবাহিকতায় এবারও দক্ষিণপন্থীদের ধারণা প্যানেল মেয়র ১ হিসেবে বিএনপি নেতা হাসান আহমেদের স্ত্রী এবং ১৬, ১৭ ও ১৮ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর আফসানা আফরোজ বিভা হাসান কিংবা ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা ছিল।
অনেকেই আবার ৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লাকে এবারের প্যানেল মেয়র ১ এর তালিকায় রেখেছিলেন বলেও জানা যায়। সব আশাকে নিরাশা বানিয়ে ২০ ভোট পেয়ে দাপটের সাথে এবারের প্যানেল মেয়র ১ নির্বাচিত হন ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রুহুল আমিন পেয়েছেন ১০ ভোট এবং সদ্য সাবেক প্যানেল মেয়র ১ আফসানা আফরোজ বিভা হাসান পেয়েছেন মাত্র ৪ ভোট। যা প্রভাবশালী এবং মেয়রের খুব কাছের লোক হিসেবে পরিচিত বিভা হাসানের সমর্থকদের জন্য খুবই হতাশার বলে মনে করেন ভক্তরা। গতবার এই বিভার কাছেই ৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন বাবু।
বিভা পেয়েছিলেন ১৬ ভোট এবং বাবু পেয়েছিলেন ১৩ ভোট। তাই এবারের এমন ভরাডুবিতে বিভার দাপট কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা নিয়েই বিস্মিত বিভার অনুসারিরা। অন্যদিকে নিজের ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন কাউন্সিলর রুহুল আমিন।
প্যানেল মেয়রের নির্বাচনের পর তিনি তার পোস্টে লেখেন, ‘মানুষ যে কত রূপের, প্রয়োজন পড়লে তা বুঝা যায়। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, কতটুকু ভালো মানুষ আমি আমরা। নাকি শুধু বাহিরের লেবেশ ধারি মানুষটা আমি।’
আগের বারের মতো এবারও প্যানেল মেয়র ২ নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। নাসিকের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহ্জালাল বাদল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় এই পদে নির্বাচিত হন। গতবার এই পদটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি।
মতি এক সময় এমপি শামীম ওসমানের খুব কাছের বলে এলাকায় বেশ প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এখন আর তার সেই দাপট নেই। সিরাজ মণ্ডল তার স্থানটি দখল করে নিয়েছেন বলে মনে করেন সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনৈতিক মহল। তাই মতি এবার আর প্যানেল মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। তার এই আসনটি দখল করেন শামীম ওসমানের আরেক শীষ্য শাহ্জালাল বাদল।
অন্যদিকে প্যানেল মেয়র ৩-এ অনেকটা দাপট দেখিয়েছেন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শারমিন হাবিব বিন্নি। বিন্নি ২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বন্দরের দুই নারী কাউন্সিলর শাওন অংকন ও শিউলী নওশাদ।
তারা যথাক্রমে ১১ ও ৩ ভোট পেয়েছেন। এরই মধ্যে এই তিনজনকে প্যানেল মেয়র নির্বাচিত করতে পেরে বেশ খুশি শামীমপন্থী নেতৃবৃন্দ। এরই মধ্যে তারা এই প্যানেল মেয়রদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে শুরু করে দিয়েছেন।
প্যানেল মেয়র ১ নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু বলেন, আমি দায়িত্ব পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। আমি এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। এই পদে যা যা দায়িত্ব আছে আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তা পালন করবো।
কাউন্সিলরদেরকে আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই আমার উপর আস্থা রাখার জন্য। আমি সব সময়ই চেষ্টা করেছি জনগণের সেবা করার জন্য। এখন আমাকে প্যানেল মেয়র ১ নির্বাচিত করায় আমার উপর দায়িত্ব বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জে ২৭টি ওয়ার্ডেই এখন আমার নিজের ওয়ার্ড। ১৭ নং ওয়ার্ডকে আমি উন্নয়ন দিয়ে যেভাবে সাজিয়েছি অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও আমার প্রয়োজন হলে এবং সুযোগ পেলে আমি দায়িত্ব পালন করবো।
সব কিছু মিলিয়ে মেয়রের খুব কাছের লোক হিসেবে পরিচিত কাউন্সিলররা যারা এতদিন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে খুব দাপটের সাথে কাজ করছিলেন বলে জানা যায়, তাদের এমন হোচটে বিস্মিত তাদের ভক্তসহ দক্ষিণপন্থী সমর্থকগণ। অন্যদিকে উত্তরপন্থীদের বিজয়কে নাসিকে নতুন হাওয়ার পূর্বাভাস বলেই ধরে নিয়েছেন তারা।
এমনকি এতদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জেলা জুড়ে শামীমপন্থীদের দাপট থাকলেও আওয়ামী লীগের শহরের রাজনীতিতে দক্ষিণ বলয়ের সাথে শক্তি ভাগাভাগির বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জায়গায় আবারও দাপটের সাথে অবস্থান নিয়ে দক্ষিণের আস্তানায়ও হানা দিয়ে তাদের শক্তিমত্তা আবারও বাড়িয়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
এস.এ/জেসি


