# এমন চর্চা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে
# সুস্থ্য রাজনৈতিক পরিবেশে বাড়বে সম্প্রীতি
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি আওয়ামীলীগ ও বিএনপি বড় দুই দলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নানা ঘটনা-অঘটন, চড়াই-উৎরাই প্রত্যক্ষ করেছে এই নারায়ণগঞ্জ শুধু মাত্র রাজনীতিকে ঘিরে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচারী সরকারের পতন আন্দোলন থেকে শুরু করে আরো শত আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছে নারায়ণগঞ্জের মানুষ। বাম রাজনীতিরও তীর্থস্থান এই নারায়ণগঞ্জ। রাজনীতির এসব আন্দোলনে পথিকৃৎদের কখনোই তাদের পরিবারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। তবে গত কয়েকবছরের রাজনীতিতে রাজনীতিক ব্যক্তিরাও নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়।
এই চর্চাটা শুরু করায় রাজনীতিকদের মনে ঘৃণার উদ্রেক হয়েছে। রাজনীতিক শুধু নয় ঘৃণার চোখে দেখছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবির ছেলেকে আটক ও পরে গ্রেফতারের পর বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে। শুধু রবির ছেলে নন, এর আগে বাবার রাজনীতির কারণে রাজনীতিতে যুক্ত না থেকেও প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন এমন ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে। সাবেক সাংসদ ও বর্তমান জেলা বিএনপির আহবায়ক মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল এবং মহানগর বিএনপির বর্তমান আহবায়ক এড.সাখাওয়াত হোসেন খানের ক্ষেত্রেও এমন চিত্র দেখা গেছে।
সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সম্প্রতি এই চর্চা হতে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের মধ্যেও। ২০১৯ সালের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে যখন বিএনপি-আওয়ামীলীগ প্যানেলের মধ্যে লড়াই তুঙ্গে। তখন বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন এড. সাখাওয়াত হোসেন খান। ঠিক ওই মুহুর্ত্বে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের ছেলে শাহরিয়ারকে তুলে নেওয়ার পর ছেড়ে দেয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২৪ জানুয়ারী সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শহরের চাষাঢ়া এলাকা থেকে শাহরিয়ারকে তুলে নেওয়া হয় জানান সাখাওয়াত। তবে রাত সোয়া ৭টায় নারায়ণগঞ্জ ডিবির একটি গাড়িতে করে শহরের খানপুর কাজীপাড়া এলাকাতে সাখাওয়াতের বাসার সামনে গিয়ে নামিয়ে দিয়ে আসে।
‘ওইদিন আমি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আদালতপাড়ায় নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলাম। সন্ধ্যায় আমার স্ত্রী জানান ছেলে শাহরিয়ার শহরের চাষাঢ়ায় গ্রুপ পরীক্ষার জন্য স্টাডি করতে গিয়েছিল। এক বন্ধুর বাসায় ওই কাজ শেষে বের হওয়ার পরে একটি মাইক্রোবাসে করে তিনজন তুলে নিয়ে যায়।’ পরে ছেলে শাহরিয়ারের বরাত দিয়ে সাখাওয়াত জানান, বিকেলে চাষাঢ়ায় রামবাবুর পুকুর পাড় এলাকাতে বন্ধুদের বাড়িতে যায় শাহরিয়ার। এক পর্যায়ে একটি হাইএইচ গাড়িতে করে কয়েকজন ডিবি সদস্য বাসায় এসে চার জনকে গাড়ি তুলে নিয়ে যায়। গাড়িটি তাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে।পরে পুলিশের লোকজন অভিভাবকের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেয়।
২০১৮ সালে তৎকালীন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালের বাসায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ১৪ ডিসেম্বর (শুক্রবার) রাতে এটিএম কামালের বাসা শহরের মিশনপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান চালায় ডিবি ও পুলিশের সম্মিলিত দল। এসময় এটিএম কামাল বাসায় ছিলেন না। তাকে না পেয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে নাহিন মুজতবা সোহানকে পুলিশ আটক নিয়ে যায় বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানায়।
তারা দাবি করেন, আটক নাহিন মুজতবা সোহান কোন প্রকার রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। এটিএম কামালকে না পেয়েই সোহানকে নিয়ে যায় পুলিশ। সোহানের মাস্টার্স পরীক্ষা চলছে। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা নেই। নিয়ে যাওয়ার ১২ ঘন্টা পর নাহিন মুজতবা সোহানকে ছেড়ে দেয়া হয়। এটিএম কামাল তখন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ঐক্যজোটের প্রার্থী এসএম আকরামের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন। তবে বাবার রাজনীতির কারণে অরাজনৈতিক হয়েও দৌড়ের উপর থাকতে হয়েছে সবচাইতে বেশি সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের দুই ছেলেকে। বড় ছেলে গোলাম মোহাম্মদ সাদরিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বে আছেন। তবে রাজনীতিকের ছেলে হলেও তিনি সামাজিক কাজেই ব্যস্ত এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
গিয়াসউদ্দিনের ছোট ছেলে গোলাম মোহাম্মদ রিফাত সম্প্রতি কৃষকদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছেন। তবে সাদরিল এখনো সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত নন। তবে বাবার রাজনীতির কারণে গিয়াসউদ্দিনের দুই ছেলেকেই নানা সময় আটকের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া গিয়াসউদ্দিনের বড় ছেলে সাদরিল এবং ছোট ছেলে রিফাতকে মামালার আসামিও করা হয়েছে। তবে গিয়াসউদ্দিনের ছেলে সাদরিলকে ২০১৯ সালে আটক ও পরবর্তীতে মামলার বিষয়টি তখন সারাদেশেই আলোচনায় আসে। ওই সময় ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের ওমরপুর এলাকা থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সেলিনা ইসলামের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে বিএনপির সাবেক এমপি মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের ছেলে নাসিক কাউন্সিলর গোলাম মোহাম্মদ সাদরিলসহ ১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পরবর্তীতে সেটি মামলায় রূপান্তরিত হয়। এবং সেই মামলায় সাদরিল জামিনও নেন। গিয়াসউদ্দিনের দুই ছেলে সাদরিল ও রিফাতের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে।
সর্বশেষ ২০২২ সালে এসে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশের আগে আবারো একই রকম ঘটনা ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে না পেয়ে তার ছোট ছেলে প্রীতমকে (২০) আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বুধবার (৭ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ২ টায় সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল আবাসিক এলাকার প্রিয়ম টাওয়ারে অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি জানান, রাতে হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শতাধিক সদস্য আমার বাড়ি ঘিরে ফেলে। এসময় তারা বাসার ভেতরে ঢুকে আমাকে খুঁজতে শুরু করে।
বাসায় তল্লাশি চালিয়ে সেখানে আমার কোন সন্ধান না পেয়ে আমার ছোট ছেলে প্রীতমকে ধরে নিয়ে চলে যায় পুলিশ। এসময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে তারা এবং আমার বাড়িঘর ভাংচুর ও তছনছ করে। মনিরুল ইসলাম রবির সহধর্মিনী নিলুফার ইয়াসমিন জানান, রাতে শতাধিক পুলিশ বাসায় এসে আমার ছোট ছেলেকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেছে। আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না। তাহলে কেনো পুলিশ আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেলো? যদিও পুলিশ পরবর্তীতে জানায়, বিষ্ফোরক আইন মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে মনিরুল ইসলাম রবির ছেলে প্রীতমকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পরেরদিন (৮ ডিসেম্বর) দুপুরে গ্রেফতারকৃত প্রীতমকে নারায়ণগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে এটা নেতিবাচক প্র্যাকটিস নিঃসন্দেহে। প্রতিষ্ঠিত চার রাজনীতিবিদ নিঃসন্দেহে প্রভাব বিস্তার করেন রাজনীতিতে। তবে বাবাকে খুঁজে না পেয়ে ছেলেকে আটকে ঘটনা সমাজে নেতিবাচক ম্যাসজটাই প্রতিষ্ঠিত করবে। আর এমন নেতিবাচক চর্চা অব্যাহত থাকলে সমাজে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। এমন নেতিবাচক চর্চাটা কোনক্রমেই কাম্য নয়।
এস.এ/জেসি


