Logo
Logo
×

রাজনীতি

ঠাঁই হলো না শামীম ওসমানের

Icon

অর্ণব হাসান

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৫৮ পিএম

ঠাঁই হলো না শামীম ওসমানের
Swapno

 

নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের চমকপ্রদ ইতিহাস রয়েছে। প্রগতির পক্ষে সব লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকে নারায়ণগঞ্জে যে পরিবারটির উত্থান হয়েছিল তা হলো ওসমান পরিবার। এই পরিবারের বর্তমানে দুই সহোদর ভাই নারায়ণগঞ্জের প্রধান ২ টি আসনে এমপি নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন। তার মাঝে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ ৪ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। অপর দিকে তার পার্শবর্তী নারায়ণগঞ্জ সদর বন্দর ৫ আসন জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে এমপি হন সেলিম ওসমান। কিন্তু রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে শামীম ওসমানের প্রভাবে এমপি তারই বড় ভাই সেলিম ওসমান।

 

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান বিভিন্ন সময় নানা ইস্যুতে আলোচনায় থাকেন। তিনি নিজেও আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। কখনো গরম বক্তব্য দিয়ে আবার কখনো তার অনুসারীদের বিতর্ক কর্মকান্ডের কারনে বিতর্কিত হয়ে আলোচনায় থাকেন। ক্ষমতাসীন দলের নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি মানেই ঘুরে ফিরে শামীম ওসমান নাম আলোচনায় থাকে। তার অনুসারীরাও রাজপথে স্লোগান দিয়ে থাকেন আমার ভাই তোমার ভাই শামীম ভাই, শামীম ভাই। রাজপথ ছাড়ি নাই শামীম ভাইয়ের ভয় নাই এমন স্লোগানে মুখরিত হয়ে থাকে নারায়ণগঞ্জের রাজপথ।

 

সদ্য অনুষ্ঠিত হলো কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ২২ তম সম্মেলন। এই সম্মেলনে তেমন একটা কোন পরিবর্তন নেই। বিশেষ করে দশম বারের মত আওয়ামী লীগের সভাপতি হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং টানা তৃতীয় বারের মত দলের সাধারণ সম্পাদক হন ওবায়দুল কাদের। কিন্তু এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারায়ণগঞ্জের একাধিক নেতাকে নিয়ে স্থানীয় ভাবে আলোচনায় উঠলেও জেলার পর্যায়ের কোন নেতা স্থান পাননি। এখানেও শামীম ওসমানের নাম উঠে কিন্তু সর্বশেষ সেই আলোচনার হতাশ হন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তার অনুসারীরা।

 

দলীয় সূত্রমতে, স্থানীয় রাজনীতে বার বার শামীম ওসমানের নাম আলোচনায় আসে। তাকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কমিটিতে পদ দেয়া দাবী তুলে তার অনুসারীরা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রদান করেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয় নাই। এছাড়া তাকে মন্ত্রীত্ব দেয়ার জন্য দাবী তুলেছেন তারই অনুসারীরা। অনেক সময় মন্ত্রীত্ব পাবে এমন আশাও করেছিলেন। ২০২০ সনে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই মন্ত্রি সভার রদবদল নিয়ে আলোচনা তৈরী হয়। তখন ওই রদবদলে আলোচনায় উঠেছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের নাম। যদিও দু’বার তাকে মন্ত্রীত্ব সাধা হয়েছে, কিন্তু নেননি বলে দাবি করেছেন তিনি নিজেই।

 

খোজঁ নিয়ে জানা যায়, ওসমান পরিবারের সুখ্যাতির মূলত শুরু হয় ১৯৯৬ সালে শামীম ওসমানের এমপি হওয়ার পর থেকে। সাংসদ নির্বাচিত হয়েই নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনীতিবিদের তকমা লাগে তার গায়ে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে এক কথায় বলতে গেলে প্রায় পুরো নারায়ণগঞ্জ ছিল তার করায়ত্তে। এছাড়া তখন তিনি এমপি হওয়ার পর সারাদেশে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের টানবাজার পতিতালয় উচ্ছেদ করে আলোচনায় আসেন। সেই সাথে ব্যপক প্রশাংসা অর্জন করেন এই জনপ্রতিনিধি।

 

এছাড়া ১৯৯৭ সনে এমপি শামীম ওসমান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান। তবে অভিযোগ রয়েছে শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে নারায়ণগঞ্জবাসী। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পাশা পাশি শামীম ওসমানও বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিনের কাছে পরাজিত হন। তখন প্রথমে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে তিনি যান কানাডায়। পরবর্তিতে ২০০৬ সালে ফিরে এসে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হলেও ২০০৭ সালের ওয়ান ইলিভেনের পট পরিবর্তনে আগের দিন তিনি দেশত্যাগ করেন।

 

ফিরে আসেন ২০০৯ সালের এপ্রিলে। ততদিনে তার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের নাসিক মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার পক্ষে কাজ করলেও সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন এই প্রভাবশালী সাংসদ শামীম ওসমান। এর পরে কিছু দিন তিনি অনেকটা বেকায়দায় সময় কাটান। তখন একদিকে নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনে এমপি হিসেবে জনপ্রতিনিধিত্ব করেন তারই চাচি প্রয়াত সারাহ বেগম কবরী। অপর দিকে নাসিক নির্বাচনে আইভীর সাথে মেয়র পদে পরাজিত হন। দুই নারীর যাতা কলে পরে যান তিনি।

 

কিন্তু শামীম ওসমানের বিরোধিতার কারণে মেয়র পদে থেকেও প্রথম মেয়াদে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে হয় আইভীকে। পরে দাপটের সাথে কাজ করে যান মেয়র আইভী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীকে বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমানকে মনোনয়ন দেয়। একতরফা এই নির্বাচনে এমপি হয়ে নারায়ণগঞ্জে নিজের ভিত্তি আবারও শক্তিশালী করেন শামীম ওসমান। এর পরে তাকে আর পিছনের দিকে তাকাতে হয় নাই। তবে তার আগে নারায়ণগঞ্জে স্কুলছাত্র ত্বকী হত্যাসহ চাঞ্চল্যকর সাত খুনে ওসমান পরিবারের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল ওঠায় তখন কিছুটায় ব্যকফুটে সময় অতিবাহিত করেন তিনি। কিন্তু ২০১৪ সনে এমপি হওয়ার পর তা কাটিয়ে উঠেন।

 

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে ২০১৮ সনে হকার ইস্যুতে নাসিক মেয়র আইভীর উপর গুলি চালানোর ঘটনা নিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের নাম। কেননা তখন শামীম ওসমানের অনুসারী নিয়াজুল আইভীর উপর হামলা চালান। এমনকি তার বিরুদ্ধে পিস্তল তাকিয়ে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তখন তিনি কিছুটা আড়ালে আপডালে থাকে তিনি সহ তার অনুসারীরা। এছাড়া ২০১৮ সনের জাতীয় নির্বাচনেও সহজে জয় পান এমপি শামীম ওসমান। তখন বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাওলানা মনির হোসেন কাশেমী নির্বাচন করে শামীম ওসমানের কাছে পরাজিত হন।

 

ওই নির্বাচনে জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে ছিলেন বর্তমান ডিএমপি ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ। ডিবি প্রধান এই হারুন নারায়ণগঞ্জে যতো দিন এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তখন সাংসদ শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা ব্যকফুটে সময় কাটান। তখন এসপি হারুনকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান শহরে একাধিক সভা করে প্রশাসনকে নিয়ে গরম বক্তব্য রাখেন। তাছাড়া বছর খানিক অনেকটা আবারও আড়ালে আবডালে থাকেন তারা। সূত্রমতে গত বছরের ১৬ জানুয়ারি নাসিক নির্বাচনে যেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী যেন নৌকা না পান তার জন্য তার অনুসারীরা শহরের সমাবেশ করে নানা বিরুপ মন্তব্য করে বক্তব্য রাখেন।

 

এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা আইভীর বিরুদ্ধে জায়গা দখলের অভিযোগ তুলেন। তাছাড়া হেফাজত নেতারা শহরে আইভীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সভা করেন। কিন্তু তাদের কোন বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কাজে আসে নাই। সকল সমালোচনা আলোচনা ভেদ করে আইভী নৌকা প্রতীক নিয়ে তৃতীয় বারের মত মেয়র নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে আইভীকে বার বার ঠেকাতে গিয়ে শামীম ওসমান ব্যর্থ হন। সদ্য শনিবার বিকেলে বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত মিছিলের মুখোমুখি হন সাংসদ শামীম ওসমান। এটা নিয়েও শহরে ব্যপক আলোচনা তৈরী হয়। এতে করে বুঝা যায় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তিনিই ঘুরে ফিরে আলোচনায় থাকেন।

 

সূত্রমতে, ২০২০ সনে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর এই মন্ত্রণালয় পদটি শূন্য হওয়ার পর সেখানে শামীম ওসমানের নাম দাবী তুললেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয় নাই। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। ২০২০ সনের ২৩ জুন জাতীয় সংসদে শামীম ওসমানকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি তুলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি সমর্থিত এমপি হারুনুর রশীদ। সেখানে তার অনুসারীরা আশা মেললেও তাতেও হতাশ হন।

 

সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি পদে এমপি শামীম ওসমানের নাম জোরালো ভাবে আলোচনায় উঠে। তার অনুসারীরা অনেকটা ধরেই নিয়েছেন তিনিই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদের দায়িত্ব পাবেন। কিন্তু সেখানে যখন পূর্বের কমিটির নাম ঘোষনা করা হয় তখন নেতা কর্মীরা হতাশ হয়ে সম্মেলন স্থান ত্যাগ করেন। সর্বশেষ ২৪ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

 

এই কমিটিতে পদ পাওয়া নিয়ে শামীম ওসমানের নাম দাবী করা হলেও সেখানেও হতাশ হতে হয় স্থানীয় নেতা কর্মী থেকে শুরু করে তার অনুসারীদের। এতে করে প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের না পাওয়ার বেদনা যেন থেকেই গেল। সেই সাথে কোন রকম জনপ্রতিনিধি ছাড়া তার কোন জায়গায় ঠাই হলো না। যদিও তিনি মিছিল মিটিংয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন তার কোন পদ পদবী লাগে না। শেখ হাসিনার স্বাচ্ছা কর্মী হয়ে থাকতে চান। সব কিছুর পরেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে প্রশ্ন উঠে শামীম ওসমানের না পাওয়ার বেদনা কবে পূরণ হবে।  

এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন