# বার্ধক্য বর্তমান এমপি সেলিম ওসমান ও সাবেক এমপি কালামের প্রধান বাধা
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি মানেই কয়েকজন ব্যক্তি পারিবার তান্ত্রিক রাজনীতি। পরিবারতান্ত্রিক দিক দিয়ে ক্ষমতাসীন দলে উত্তর দক্ষিন বলয় ঘিরে দুটি পরিবার রয়েছে। উত্তর বলয়ের অনুসারীরা হলেন, শামীম ওসমান তথা ওসমান পরিবারের অনুসারী। এই পরিবার থেকে বর্তমান দুই ভাই দুই আসনে জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন। অপর দিকে দক্ষিণ বলয়ে পরিবারতান্ত্রিক দিক দিয়ে মেয়র আইভীর বলয়ের নেতাকর্মীরা আছে। কিন্তু তাদের বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে নারায়ণগঞ্জে জালাল উদ্দিন হাজ্বীর পরিবার থেকে সাবেক এমপি আবুল কালামের অনুসারীরা রয়েছে। বিএনপিতে এই পরিবারেরও অনেক নেতাকর্মী অনুসারী রয়েছে। কেননা বিএনপির গোড়াপত্তন থেকে তাদের সুখ্যাতি রয়েছে।
ওসমান পরিবার এবং জালাল উদ্দিন হাজ্বী পরিবারেই ঘুরে ফিরে নারায়ণগঞ্জ-৫ সদর-বন্দর আসনে জনপ্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন। তার মাঝে নারায়ণগঞ্জ-৪ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে ওসমান পরিবারের তিন ভাই এমপি নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন। আবার তারা বিভিন্ন সময় নানা ইস্যুতে আলোচনা সমালোচনায়ও পড়েন। তবে নারায়ণগঞ্জের যে পরিবারটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগের জন্মের ইতিহাস, সেই খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবারের রাজনীতি তৃতীয় প্রজন্মে এসে এখন টালমাটাল।
আলামত বলছে, চতুর্থ প্রজন্মে কেবল ভরাডুবিই হয়ত অপেক্ষা করছে। এই দুই প্রজন্মের কাণ্ডকীর্তিতে ওসমান পরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও টান পড়েছে। কিন্তু এখন কৌশল পরিবর্তন করে বড় ভাই জাতীয় পার্টি প্রেসিডিয়াম সদস্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমান ২০১৪ সালে মারা যাওয়ার পরে একই আসন থেকে ব্যবসায়ী নেতা সেলিম ওসমান এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন বাগিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৫ সদর-বন্দর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। জানা যায়, প্রথমবার বড় ভাই নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর তার আসনে মায়ের নির্দেশে নির্বাচন করেছেন সেলিম ওসমান। দ্বিতীয়বার তিনি দাবি করেন আপার নির্দেশে আমি নির্বাচন করেছেন। কিন্তু আগামীতেও তিনি নির্বাচন করবো কি করবো না এটা মুরুব্বিরাই সিদ্ধান্ত দিবেন।
সেলিম ওসমানের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানাযায়, তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শামীম ওসমান সাংসদ থাকাকালে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি হয়েছেন। পরবর্তীতে শামীম দেশে ফেরার পর ২০১৩ তেও আবারও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি হন। দুই দফা নারায়ণগঞ্জ ক্লাবেরও সভাপতি হয়েছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) নির্বাচনেও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বর্তমানেও তিনি বিকেএমইএ সভাপতি হিসেবে আছেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এই জনপ্রতিনিধি আগামীতে নির্বাচন করবে কি না তা নিয়ে ব্যপক ভাবে আলোচনা চলছে। তবে তার ভাষ্যমতে জনগণ যদি চায় তাহলে তিনি নির্বাচন করবেন। কিন্তু রাজনৈতিক বোদ্ধমহলে আলোচনা হচ্ছে তিনি এখন যেই পরিমাণ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন তার জন্য আগামীতে জনপ্রতিনিধিত্ব করতে পারনে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার সচেতন মহল বলছে এই জনপ্রতিনিধি এখন অনেকটা বয়সের ভারে বার্ধক্যে চলে গেছে।
জানা যায়, এই বছরে তিনি কয়েকবার অসুস্থ্য হয়ে বিদেশের মাটিতে চিকিৎসার জন্য পাড়ি জমান। দীর্ঘ ১ বছর যাবৎ মেরুদন্ডজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এমপি সেলিম ওসমান। গত ২৮ অক্টোবর ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। মেরুদণ্ড ও পায়ে দুটি পৃথক অস্ত্রোপচার শেষে ২৪ নভেম্বর তিনি দেশে এসে পৌছান। তার আগে এই বছরের মার্চ মাসে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। তখন তার অনুসারীসহ জাতীয় পার্টির নেতারা এই জনপ্রতিনিধির জন্য দোয়ার আয়োজন করে তার সুস্থ্তার জন্য দোয়া চান।
রাজনীতি মহলে তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এই জনপ্রতিনিধি এখন বার্ধক্যের কারণে নানা সময়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। আর এতে করে তিনি তার নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কাজ তদারকি করতে পারেন না। এছাড়া তাকে ছাড়া তার দলীয় কার্যক্রমও স্থবিরতা হয়ে আছে। তাছাড়া তিনি অসুস্থ থাকায় তার নির্বাচনী এলাকার চেয়ারম্যানরাই বা তাকে কতটুকু পান। সেই সাথে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে জনগণই বা কি সার্ভিস পান। কেননা তিনি ব্যবসায়ীদেরও নেতা হিসেবে আছেন। সচেতন মহলের মত তিনি কি আসলের জনগণকে সেবা দিতে পারেন।
তার বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয়তাবাদী বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে ৩ বার এমপি নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন সাবেক এমপি আবুল কালাম। এছাড়া তিনি বিএনপির সদ্য মহানগর বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আবুল কালামের পিতা জালাল উদ্দিন আহমেদ সদর বন্দর আসনে এমপি নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
নির্বাচিত হয়েই তিনি নারায়ণগঞ্জের সকল রাজনীতিবিদদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার মানুষের প্রাণের দাবি খানপুর হাসপাতাল (বর্তমান ৩’শ শয্যা), গণবিদ্যা উচ্চ বিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল টার্মিনাল, বন্দর হাজী সিরাজুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজ, নারায়ণগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠা করে নানা উন্নয়নমুলক কাজ করেন। তারই নির্বাচনি এলাকায় পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার এমপি নিবার্চিত হন। পরে ১৯৯৬ এর খন্ডকালিন নির্বাচনেও এমপি নিবাচিত হন।
সর্বশেষ ২০০১ সনের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর-বন্দর আসনে এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০৮ সনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাসিম ওসমানের সাথে পরাজিত হন। সেই থেকে তিনি জনপ্রতিনিধিত্বে না আসতে পারলেও এই বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সভাপতি পদে নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় নেতা কর্মীদেরে মাঝে আলোচনা রয়েছে তিনি বিভিন্ন সময় অসুস্থ্যতার কারণে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন নাই।
আর এতে করে দলীয় নেতারা তার কাছ থেকে তেমন একটা সার্ভিস বা সেবা পান নাই। কেননা জনপ্রতিনিধিরা কিংবা রাজনীতিবিদরা তাদের বক্তৃতায় বলে থাকেন দলীয় কর্মী এবং মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করেন। মানুষের কল্যাণের জন্য তারা জনপ্রতিনিধিত্ব করেন। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে এই দুই ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি হয়ে বিভিন্ন সময় শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে তাদের কাছ থেকে মানুষ ও নিজ দলের কর্মীরা তেমন একটা সার্ভিস পায়না।
তাই আগামীতে তারা আবারও জনপ্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচনে আসবেন কি না তা নিয়ে এখন থেকেই নানা গুঞ্জন উঠেছে। আর সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে আসছে বছরের শেষে যখন জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। তখনই বুঝা যাবে কে নির্বাচন করবে আর কে করবে না। যদিও আবার তাদের মাঝে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসে তাহলে জনগণকেই কতটুকু সার্ভিস দিতে পারবে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এস.এ/জেসি


