বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা পূর্ব এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অঙ্গনেও নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা অপরিসীম। রাজধানী সংলগ্ন এই জেলাটি শিল্প ও ব্যবসায়ীক কারণ ছাড়াও স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতার যুদ্ধেও নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই শিল্প বাণিজ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ধনী জেলা হিসেবে স্বীকৃত এই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি নিয়ে সবসময় দেশবাসীর একটি আলাদা দৃষ্টি থাকে।
তবে নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৫ আসন। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন শহর ও বন্দর নিয়ে গঠিত হওয়ায় শীতলক্ষ্যার পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পারের জনগণের সমর্থনের প্রয়োজন হওয়ায় এই আসনটি নারায়গঞ্জের মধ্যে একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এরশাদ সরকারের ক্ষমতাকালীন সময়ে নারায়ণগঞ্জকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করার পর অর্থাৎ ১৯৮৬ সাল থেকে বর্তমান ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন যুগের মধ্যে মাত্র এক মেয়াদের জন্য এই আসনের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশের বৃহত্তর ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এছাড়া প্রতিবারই এই আসন থেকে নেতৃত্বে দেন হয়তো বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে জানা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন আবুল খায়ের মো. শামসুজ্জোহা (বর্তমান এমপি শামীম ওসমানের পিতা), আফজাল হোসেন (বাবুরাইল এলাকার), মোহাম্মদ মোবারক হোসেন (আব্দুল্লাহ আল কায়সারের চাচা) ও আড়াইহাজারের ডাক্তার সাদত আলী সরদার। ১৮৮২ সালে নারায়ণগঞ্জকে মহাকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। এরশাদ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জেলা ঘোষণার পর ১৯৮৬ সালের ৭ই মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে এই আসনের সাংসদ নির্বাচিত হন একেএম শামসুজ্জোহার বড় ছেলে একেএম নাসিম ওসমান। এরপর এই আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে একে একে নির্বাচিত হন হাজী জালালউদ্দিনের ছেলে এডভোকেট আবুল কালাম (বিএনপি), সাবেক অতিরিক্ত সচিব বন্দরবাসী এসএম আকরাম (আওয়ামী লীগ) এবং সর্বশেষ নাসিম ওসমানের ছোট ভাই একেএম সেলিম ওসমান (জাতীয় পার্টি)।
এর মধ্যে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন একেএম নাসিম ওসমান। বয়স ও অসুস্থতার কারণে গণসংযোগ থেকে অনেকটাই দূরে সরে আছেন এডভোকেট আবুল কালাম ও একেএম সেলিম ওসমান। এরই মধ্যে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন থেকে এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ। তবে এবার আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই সর্বদলীয় নির্বাচন হলে এই আসন থেকে এবারের প্রার্থী নিয়ে হিসেব নিকেশ করছেন নারায়ণগঞ্জ এর রাজনৈতিক বোদ্বাসহ বিভিন্ন মহল।
দলের মধ্যে একেএম শামসুজ্জোহা, আলী আহাম্মদ চুনকা, অধ্যাপিকা নাজমা রহমান কিংবা মফিজুল ইসলামের মতো জনপ্রিয় নেতা তৈরি হওয়া এবং দলীয় যোগ্যতার বাইরেও জনগণের কাছে নিজেদের জনপ্রিয় করা নেতা এই আসনে খুব কমই আছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তবে যাদের নাম বর্তমানে আলোচনায় আছেন তারা হলেন সাবেক এমপি ও প্রয়াত জাতীয় পার্টির নেতা একেএম নাসিম ওসমানের সহধর্মিনী জাতীয় পার্টি নেত্রী পারভীন ওসমান, সাবেক এমপি বর্তমান নাগরিক ঐক্য নেতা এসএম আকরাম ও বিএনপির মনোনীত সাবেক মেয়র প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সেলিম ওসমান না থাকলে সেখানে নাসিম ওসমানের সহধর্মিনী পারভীন ওসমানের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। ভক্ত ও বিশ্লেষকদের মতে এই মুহুর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে পারভীন ওসমান ও তার ছেলে আজমেরী ওসমানের জনসম্পৃক্ততা বা গণযোগাযোগ চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া এই পরিবারটির উপর নাসিম ভক্তদের একটি বিশাল সমর্থণ আছে বলেও মনে করেন তারা।
এরই মধ্যে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুটি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান সেতু হিসেবে নামকরণ করা এবং সেতুটি উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাসিম ওসমানের প্রশংসায় এই সমর্থনের পারদ আরও উপরের দিকে ধাবিত হয়েছে বলেও মনে করেন ভক্তরা। যদিও নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পরই রাজনীতিতে আসতে চেয়েছিলেন পারভীন ওসমান। তবে পারিবারিক জটিলতায় তা আর সম্ভব হয়নি বলে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেছে।
তবে এখন তিনি অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টি কর্তৃক উপেক্ষিত হলেও ২০১৯ সালের ২৫শে আগস্ট জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের পারভীন ওসমানকে জাতীয় মহিলা পার্টির উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচিত করেন। এরপর গত ২৪ মার্চ তার হাতে প্রেসিডিয়াম সদস্যে পদোন্নতির চিঠি তুলে দেন গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তাই দলীয় প্রেসিডিয়াম সদস্যের মাধ্যমে তিনি তার দলীয় স্থানটিও পাকাপোক্ত করতে পেরেছেন বলে মনে করেন তারা।
এরই মধ্যে আরেকটি বহুল আলোচিতের তালিকায় আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আহবায়ক এসএম আকরামের নাম। তিনি অবশ্য বর্তমানে আওয়ামী লীগে নেই। তিনি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে গঠিত নাগরিক ঐক্য নেতা। সাবেক অতিরিক্ত সচিব এর পদ ছেড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন আকরাম।
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে পরাজিত হলেও সদরে এবং বন্দরে একটি ইমেজ তৈরি করতে সমর্থ হন তিনি। ফলে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক পদেও নিযুক্ত হন। ২০১১ সালের নাসিক নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে কাজ করেন এবং সফল হন। ২০১৪ সালে উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হন এবং পরে নাগরিক ঐক্যে যোগদান করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নাগরিক ঐক্যের হয়ে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি।
এই তালিকায় আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আহবায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের নাম। সাখাওয়াত-টিপু কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার পর এই সংগঠনটির প্রাণচাঞ্চলতা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক মহল। কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার পর এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে মেয়র পদে নির্বাচন করেন তিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচীতে সাখাওয়াত টিপুর নেতৃত্বে ব্যাপক জনসমাগম এবং উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে চলেছে বলে জানান দলীয় একাধিক সূত্র।
তবে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা থাকলেও ব্যক্তিগত ইমেজ তৈরি করা কিংবা জনগণের সাথে ভাব তৈরি করা কোন কর্মীবান্ধব নির্দিষ্ট কোন নেতার নাম আলোচনায় আনতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলীয় নেতাকর্মীদের দৃষ্টিকোণ থেকেও সরাসরি কারও নাম উঠে না আসায় এই আসন থেকে ব্যক্তি ইমেজে নির্বাচন করার যোগ্য প্রার্থী নিয়ে অনেকটাই বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলসহ বিশ্লেষকগণ। তবে ব্যক্তিগত যোগ্যতা না থাকলেও দল ও দলীয় সমর্থকদের প্রচেষ্টায় যে কোন ব্যক্তিকেই নির্বাচিত করা সম্ভব বলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা মনে করেন। তবু বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের এই আসনের নেতাকর্মীরা যে কোন মূল্যে নৌকা বা আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন।
এস.এ/জেসি


