গিয়াসউদ্দিনকে টার্গেট করেই মাঠে শামীম ওসমান
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:৩৪ পিএম
# এবার সম্ভাব্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আঁচ করতে পেরেই মানুষের দ্বারে দ্বারে
# বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল হ্রাসে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন গিয়াস
যতই সময় অতিবাহিত হচ্ছে ততোই আগামী জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে বছর আগে থেকেই প্রচারণায় নেমেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ৩শ’ আসনে কারা সম্ভাব্য প্রার্থী হবে তাদের বাঁছাই কার্যক্রমও করছেন। তবে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, এই সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে যাবেন না। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে তাদের কোন আপত্তি নেই। এছাড়া রাজনীতি মহলে গুঞ্জন রয়েছে সর্বশেষ বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে সেই প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছে তারা।
সেই নির্বাচনের বাতাস নারায়ণগঞ্জেও পড়ছে। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজপথও গরম হচ্ছে। এদিকে পুরো জেলার মাঝে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে। কেননা এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান এমপি থাকায় তার সাথে কে প্রতিদন্দ্বিতা করেন সেদিকে তাকিয়ে থাকে মানুষ। ক্ষমতাসীন দলের এই জনপ্রতিনিধি ১৯৯৬ সনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০১ সনের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বর্তমান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিনের সাথে প্রতিদন্দ্বিতা করে পরাজিত হন সাংসদ শামীম ওসমান।
তখন আওয়ামী লীগের সাথে তার ভরাডুবি হওয়ায় তিনি তখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। সেই থেকে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির দেখা কর্মীরা পান নাই। আওয়ামী লীগ যখন ২০০৮ এর জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার সরকার গঠন করার পর ২০০৯ শামীম ওসমান দেশে ফির আসেন। পরবর্তীতে শামীম ওসমান তার চাচী সারাহ বেগম কবরীর স্থলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিনা প্রতিদন্দ্বিতায় ২০১৪ সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৮ সনের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করা লড়াইয়ের মাধ্যমে তাকে জয়ী হতে হয়।
জানা যায়, ২০১৮ একাদশ সংসদ নির্বাচনে শামীম ওসমানের সাথে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তখনকার বিএনপির শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে মজলিশ থেকে মনির হোসেন কাশেমী প্রতিদন্ধিতা করে পরাজিত হন। কিন্তু এই নির্বাচনে বিএনপি থেকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ৩ জন প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন কেনেন। তার মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন বর্তমান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। তার পাশাপাশি বিএনপির কার্যনির্বাহী সদস্য শাহ আলম ও জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মামুন মাহমুদ। তখন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিনের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে আদালত তা বেধতা ঘোষণা করেন। সর্বশেষ দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে গিয়াসউদ্দিন তখন নির্বাচন থেকে সরে আসেন। কিন্তু গুঞ্জন রয়েছে তিনি ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে আর নির্বাছন নিরপেক্ষ হলে তার জয় কেউ ঠেকাতে পারতেন না।
দলীয় সূত্র মতে, এবার নারায়ণগঞ্জ বিএনপি আগের থেকে শক্তিশালী হয়ে মাঠে নেমেছে। তারই অন্যতম কারণ হলো বর্তমানে জেলা বিএনপির দায়িত্বে আছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তাই নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের রাজনীতিতে সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিনের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে চলে যাবার পর বিগত পনেরো বছর ধরে বিএনপি দলীয় সাবেক এই এমপি বিএনপি করার কারণে নানা ভাবে হয়রানী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন তিনি। নানা অপরাধে অন্তত তিন বছর জেল খেটেছেন নারায়ণগঞ্জের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এছাড়া ইদানিং বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে তার বাড়িতে কয়েক দিন পর পর পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রশাসনের সাদা পোশাকধারীরা অভিযান চালান। আর এতে করে তিনি ঠিকমত বাড়িতে থাকতে পারেন না। সেই সাথে হামলা মামলা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার সন্তানরাও। কিন্তু এতো কিছুর পরেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। শামীম ওসমানের মতো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি সাবেক সাংসদ গিয়াস উদ্দিন। এমন কি নিজের বাড়িঘরও ছাড়েননি নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ মানুষের প্রিয় এই নেতা। বরং বরারবরই তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন এলাকার জনগণের খোঁজ খবর রেখেছেন।
সেই গিয়াস উদ্দিন এখন আগামী দিনের নির্বাচন আর আন্দোলনকে সামনে রেখে মাঠে নেমেছেন। একই সাথে জেলা বিএনপির দায়িত্ব পেয়ে দলকে সুসংগঠিত করছে। তাই তার প্রতিপক্ষ এখন তার বিরুদ্ধে এখন নানা রকম অপপ্রচারে মেতে উঠেছে। তার প্রধান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দলের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানও এবার এক বছর আগে থেকে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও তিনি বলেছেন মাদক, সন্ত্রাস, ইভটিজিং, ভুমিদস্যুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার জন্য মাঠে নামবেন। কিন্তু রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন তিনি নির্বাচনের মাঠ গোছানোর জন্য মাঠে নামছেন। কেননা আগামী নির্বাচন গত দুই বারের মত সহজ হবে না। এছাড়া জেলা বিএনপির দায়িত্বে গিয়াস উদ্দিন আসার পর থেকে তাকে দমানোর জন্য নানাভাবে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ একেএম শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে একজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন বিএনপির গিয়াস উদ্দিন। কারণ একবার তিনি শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটে হারিয়েছিলেন। এরপর শামীম ওসমান দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাই গিয়স উদ্দিন এখন জোরালো ভাবে মাঠে নামায় শামীম ওসমানের বুকে কাপন শুরু হয়েছে বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ। কারণ এবার যদি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয় আর গিয়াস উদ্দিন যদি হন বিএনপির প্রার্থী হয় তাহলে এবার তার জয় আটকিয়ে রাখতে পারবে না ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী।
সেই সাথে আগের চেয়েও জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়বেন এই গিয়াস উদ্দিন এবং ভয়াবহ রুপে ভরাডুবি ঘটবে শামীম ওসমানের। তাই শামীম ওসমান আগে ভাগেই তার অনুগতদের দিয়ে গিয়াসউদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে মেতে আছেন। সেই সাথে আগে ভাগে মাঠে নামতে কার্পণ্য করেন নাই। গিয়াস উদ্দিনের অনুসারীরা মনে করেন এসব করে এবার কোনো লাভ হবে না। গিয়াস উদ্দিন মাঠে নামার পর এরই মাঝে বদলে গেছে চিত্র। সারা নারায়ণগঞ্জ জেলায়ই বিএনপির নেতাকর্মীরা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয়রা জানান, গিয়াস উদ্দিন যখন এমপি ছিলেন তখন ফতুল্লায় তিনি ব্যাপক উন্নয়ন করে রেখে গেছেন। বক্তাবলী ইউনিয়নে তিনি তখন ত্রিশটি ব্রিজ কালভার্ট করে রেখে গেছেন। বক্তাবলী খেয়াঘাটে যেতে কাশীপুর ব্রিজটি তিনিই নির্মাণ করে রেখে গেছেন। এছাড়া তিনি যতো দিন এমপি ছিলেন ততোদিন ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জে কোনো জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর বিগত পাঁচ বছর ধরেই ফতুল্লার উন্নয়নে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। দিনে দিনে পরিস্থিতি এমন হচ্ছে যে ফতুল্লা এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পরেছে। তাই মানুষ এখন বিনা ভোটের এমপি দেখতে চান না।
তাই এখন রাজনীতির মাঠে দিনের পর দিন চাঙ্গা হচ্ছে। এক দিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান ফতুল্লা সিদ্ধিরগঞ্জে নানা সভা সমাবেশ থেকে শুরু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উত্তপ্ত বক্তব্য দিচ্ছেন সেই সাথে আগামী ২১ জানুয়ীরর পর তিনি মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে তার বিপরীতে আগে থেকেই মাঠ গুছিয়ে নিয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গিয়াস উদ্দিন। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে এমপি শামীম ওসমান কী তাহলে গিয়াস উদ্দিনকে দমাতে না পেরে তাকে টার্গেট করেই নির্বাচনের এক বছর আগেই মাঠে নামছেন।
এস.এ/জেসি


