সারাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আগামী দ্বাদশ নিবার্চন নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকার বিরোধী দলগুলো চাচ্ছে আগামীতে যেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ বারের মত ক্ষমতায় না আসতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগও ছেড়ে দিবে না। তারা চতুর্থ বারের মত ক্ষমতায় থাকার জন্য মাঠে নেমে মানুষের কাছে ভোট চাওয়া শুরু করেছে। এই দিক দিয়ে বিরোধী দল গুলো পিছিয়ে আছে। তাছাড়া দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। যদিও সাংগঠনিক ভাবে তারাও প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। যদিও তারা একের পর এক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ দখল করে সরকার পতনের ডাক দিয়ে যাচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ ঢাকার লাগোয়া জেলা হওয়ায় নির্বাচন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলন সংগ্রামে এই জেলা নিয়ে আলোচনায় থাকে সবার শীর্ষে। এছাড়া দেশের অর্ধেক জেলা গুলো যাতায়াতের জন্য নারায়ণগঞ্জ হয়ে যেতে হয়। তাছাড়া বাণিজ্যিক দিক দিয়ে সারা বিশ্বে এখানকার পরিচিত রয়েছে। তার মাঝে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন। তাই আগামী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে এবার আগে থেকে আলোচনা চলছে। এই আসনটিতে টানা ১৪ বছর যাবৎ ওসমান পরিবারের দখলে রয়েছে। একই সাথে জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। এখানে ঘুরে ফিরে তারাই রাম রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাদের সেই রাজত্বে আগামীতে ভাটা পরতে পারে।
তার কারণ এখানে ২০১৮ সনের একাদশ নির্বাচনের পর জোরে সরে নৌকার প্রার্থী দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। গত বছরের সিটি করপোরেশনেও সেই দাবী জোরালোভাবে জানানো হয়। তখন কেন্দ্রীয় নেতারাও তাদের নৌকার দেয়ার আশ্বস্ত করেন। দলীয় সুত্রমতে জানা যায়, জোটভুক্ত নির্বাচনের কারণে ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ আসন ছেড়ে দেয়ায় ওই সময় মনঃক্ষুন্ন হন আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীরা। একই ধারা অব্যাহত ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মতো নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনটিও ছেড়ে দেয়া হয় জাতীয় পার্টিকে। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই দলীয় প্রার্থী চান নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
এদিকে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে জোটভুক্ত রাজনীতির জন্য রাজধানীর কাছের জেলা নারায়ণগঞ্জ-৫ শহর বন্দর আসনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন হওয়ায় শরিক দলকে ছেড়ে দেয়া হলে তা রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এটির প্রভাবও পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের শহর বন্দর এলাকায় আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেই সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অবহেলিত হয়ে আছে। এমনকি তাদের দুঃখের কথা বলার জায়গাটাও নেই। তাই তারা ২০১৮ সনের নির্বাচনের পর থেকে এখানে নৌকার প্রার্থী দাবি জানিয়ে আসছে। তারা এই দাবীর প্রতিফলনও দেখতে চান। তাদের সেই দাবী হয়তো এবার আশা জাগতে পারে। এদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ব্যস্ত নিজেদের ঘর গোছাতে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কোন্দল মেটানো না গেলে এর প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়বে বলে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন।
২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য একেএম নাসিম ওসমানকে। ওই নির্বাচনে বিএনপি’র অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাসিম ওসমান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় নাসিম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের দেরাদুনে হঠাৎ নাসিম ওসমানের মৃত্যু হলে উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পান তার মেজ ভাই ব্যবসায়ী নেতা সেলিম ওসমান।
২০১৪ সালের ২৬ জুন অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে সেলিম ওসমান সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আহ্বায়ক এসএম আকরামকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই ভাবে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ নির্বাচনে মহাজোটের শরীক দল জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়ে এমপি সেলিম ওসমানের কাছে বিএনপির শরীক দল থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আকরাম পরাজিত হন। এছাড়া এখানে মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালামও এবার আলোচনায় আছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এবার জোরে সরে আলোচনা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান বছরের অর্ধেক সময় অসুস্থ্য হয়ে সময় কাটান। চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করেন। তাছাড়া তার নির্বাচনী এলাকায় এই জনপ্রতিনিধির কোন কার্যালয় নেই যেখানে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মানুষ তার সাথে সাক্ষাৎ করবে। নগরবাসীর মতে তিনি এখন বয়সের বার্ধক্যে পৌছেছেন। অনেক কিছু চাইলেও করতে পারেন না। অপর দিকে সরকার এবার ইয়ংদের প্রাধান্য দিচ্ছে। সেদিক দিয়ে তিনি পিছিয়ে আছেন। তাছাড়া গত বছর বন্দর এক সভায় সাংসদ সেলিম ওসমান নৌকা প্রতীক নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন।
তখন তিনি বলেন, গাঞ্জার নৌকা তালগাছে উঠবে না। তার এই মন্তব্যে আওয়ামী লীগের নেতাদের মনে রক্তক্ষরণ হয়। তারা প্রতিবাদও জানান। এছাড়া ব্যবসায়ী সংগঠন গুলো তার ইশারার কাছে জিম্মি হয়ে আছে বলে জানান ব্যবসায়ী সংগঠনের একাধিক সদস্য। তবে এবার আগামী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নাসিম ওসমান পরিবার থেকে তারই সহধর্মিনী পারভীন ওসমান মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। রাজনৈতিক মহলে তাকে নিয়েও ব্যপক আলোচনা চলছে। তিনি যদি এবার জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পান তাহলে সেলিম ওসমানের কপাল পুড়বে। এছাড়া ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির সাথে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাথে তাদের আগের প্রেম নেই। তাদের জোট ভঙ্গ হয়ে আছে। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শরীক দল হওয়ায় তারা ছাড় পেয়ে যান। তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। কিন্তু এবার আর তা হচ্ছে না। এতে করে ভালোভাবেই চাপে পড়ছেন সেলিম ওসমান।
এছাড়া বিএনপির এবার অস্তিত্বের লড়াই। তারাও এত সহজে ছেড়ে দিবেন। তার মাঝে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তখন জাতীয় পার্টির প্রার্থী আরও চাপে থাকবে। আগামী দ্বাদশ নির্বাচন আগের মত আর হচ্ছে না এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই সবকটি দলই এখানে হিসেব নিকেশ করে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রার্থী দেয়ার বাছাই কার্যক্রম করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এবার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে এবার জোরে সত্ত্বেও আলোচনা চলছে। আগামী নির্বাচনে জটিল সমীকরণ হওয়ায় এখানে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা রাজনৈতিক দল গুলোতে। তবে সব কিছু মিলিয়ে এখানে ভিন্ন ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে। যা অনেকটা এই জুলাইয়ের পরে পরিস্কার হয়ে যেতে পারে। কেননা তার কিছু দিন পরেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা হবে। মানুষও চায় এখানে পরিবর্তন হোক।
এস.এ/জেসি


