অর্থ-পদের লোভে মুসাপুর আ.লীগে ভরাডুবি
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:২৮ পিএম
# বন্দরের আ.লীগ নেতারা একে অন্যকে বিশ্বাস করেননা
দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল বন্দর আওয়ামী লীগ। তবে বন্দর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে করুন অবস্থা মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের। গত একযুগে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েও তা প্রকাশ করার অবস্থায়ও নেই এখানকার তৃণমূল ও পোড় খাওয়া আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের অবস্থা। মাঝে মধ্যে মিডিয়ার বদৌলতে কিছুটা আঁচ করা গেছে মাত্র। যার কিছুটা প্রকাশ পেতে দেখা যায় গত ৩১ ডিসেম্বর বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনে। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বন্দর আওয়ামী লীগের করুন দশার কথা যখন তুলে ধরেন।
কোনখানে কথা বলার কিংবা কিছু করার ক্ষমতা না থাকায় দীর্ঘদিন একটি চাপা আর্তনাদ বুকে ধারণ করে রাখা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীগণ তার মাঝখান দিয়েই তাদের মনের ক্ষোভ প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। তবে তৃণমূল শুধু স্থানীয় আসনে আওয়ামী লীগের এমপি থাকাকেই একমাত্র কারণ বলে মনে করেন না। তাদের মতে এখানকার আওয়ামী লীগের দুর্নীতিই এখানকার আওয়ামী লীগের করুন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
এই জন্য বন্দর আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে অথর্, ক্ষমতা, দাপট এবং আওয়ামী লীগ ও বঙ্গন্ধুর প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা না থাকাকে দায়ী করেন তারা। এখানকার বেশিরভাগ ইউনিট কমিটির নীতিনির্ধারকরাও তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য স্থানীয় এমপি ভক্তদের সাথে তাল মিলিয়ে দলীয় স্বার্থ ও নীতি বিসর্জন দিতে একবারও ভাবেননি। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায় যেসব নেতারা এখন নির্যাতিত হওয়ার ভাষণ দেন, তারাও তাদের ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে নিজেকে লুকিয়ে রেখে, কর্মীদের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোগান্তিতেও তারা পাশে এসে দাঁড়াননি। পাছে পদ হারিয়ে বসেন তাই।
গত ৩১ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৯ বছর পর বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গত ২০০৩ সালে সর্বশেষ বন্দর উপজেলায় অবস্থিত আওয়ামী লীগের ইউনিয়নগুলোতে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এখানকার আর কোন ইউনিয়ন পরিষদেই সম্মেলন হয়নি। অন্যদিকে বন্দরে ২০ বছরেরও অধিক সময় যাবত নেই আওয়ামী লীগের কোন সাংসদ। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সর্বশেষ ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সংসদ সদস্য ছিলেন এসএম আকরাম। এরপর সুযোগ থাকলেও ২০০৮ সাল থেকে জোটগত কারনে এখানে জাতীয় পার্টির জন্য আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ।
আর তারপর থেকেই বন্দর আওয়ামী লীগের রাজনীতির পতন শুরু হয় বলে এর আগে বিভিন্ন সময় স্থানীয় একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন। অভিযোগ আসে এখানকার কিছু সুযোগ সন্ধানী আওয়ামী লীগ নেতা জাতীয় পার্টির সাথে মিলে ফায়দা লুটার চেষ্টা করেন বলে এসব নেতাদের এই বিশ বছরের আর্থিক ব্যবধান তল্লাশী করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বলেও দাবি করেন আওয়ামী লীগের অনেক ভূক্তভোগী। আওয়ামী লীগের সর্ষের মধ্যেই ভূত, তাই ভয়ে সিনিয়র নেতাদের কাছে তাদের করুন অবস্থার কথা বলার কোন সুযোগই পান না বলে বিভিন্ন সময় জানিয়ে আসছিলেন তারা। যার ফলাফল গত ইউপি নির্বাচনে দেখা যায়। কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে।
বন্দরের প্রায় সবক্ষেত্রেই পোড়খোর আওয়ামী লীগ নেতা ও তৃণমূলের উপর দাপট থাকলেও সূত্রের দাবি নির্যাতনের বেশি শিকার মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। আর এর কারণ এখানকার শক্তিশালী কোন কমিটি না থাকায় এবং কমিটির সদস্যদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকায়। এখানকার নেতৃত্ব খুবই দুর্বল বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে আসছিলেন। তাই মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনের সময় সেখানকার সভাপতি মুজিবর রহমান যখন তার দুরাবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করে বলেন, তিনি মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য তিনবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
তাও আবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এবং ইউনিয়ন দলীয় আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে। কিন্তু তারপরও তিনি চেয়ারম্যান পদে জয়ী হতে পারেননি। তখন অনেককেই বলতে শোনা যায়, আপনার অবস্থা তো এমন হবেই, আপনি কার দুঃসময়ে খবর নিছেন? নিজের নির্বাচনের প্রচার কার্যও চালিয়েছেন অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়ে। যারা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত প্রেমিক, তারা কখনও বঙ্গবন্ধু তার দল কিংবা পরিবার কারও অসম্মান সহ্য করবে না।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর বন্দর আওয়ামী লীগের কোন ইউনিয়ন কমিটির সম্মেলন হওয়ায় সেখানে শুধু মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দই উপস্থিত ছিলেন না। বন্দর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, বন্দরে অবস্থিত নাসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতাকর্মীগণও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। ফলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলেও সেখানে বিরাজ করছিল উৎসবমূখর পরিবেশ। আর সেখানে যখন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদক এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দাবি করার কথা বলেন কিংবা মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন তখন সেসব ভূক্তভোগীরা এক সাথে সবায়ই তাদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। আপ্লুত হয়ে পড়েন সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীগণ।
দল ক্ষমতায় থাকার পরও যারা বিভিন্ন সময় অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও অবহেলিত হয়ে অনেকটা নিরুপায় হয়ে দলের সর্বনাশ দেখছিলেন তারা যেন মন খুলে কথা বলার সুযোগ পেয়ে যান। আর তাই যখনই জেলা সভাপতি, সম্পাদক অথবা অন্যকোন নেতা বন্দর আওয়ামী লীগের অসহায়ত্ব নিয়ে কথা বলেন তখনই আবেগে আপ্লুত হয়ে তাদের সাথে তালমিলিয়ে তাদের কথার মাঝখানেই তারা তাদের বর্তমান অবস্থা তুরে ধরার চেষ্টা করতে থাকেন। যদিও এই আয়োজনে সেরকম কোন সুযোগ থাকার কথা না। তারপরও তারা তাদের চেষ্টা চালিয়ে যান যতটুকু সম্ভব মনের কথা সরাসরি উপজেলা ও জেলা কামিটির কাছে তুলে ধরার জন্য। গত ৩১ ডিসেম্বর বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এরকম একাধিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তবে সমালোচনাও কম হয় না।
এস.এ/জেসি


