# গত চারবছর কী করেছেন সেলিম ওসমানকে প্রশ্ন
# শহরে কোটি কোটি টাকা চাদাঁবাজি হয়
# শাহ নিজামের অস্ত্র দেখেছে এরপরেও মামলা থেকে খালাস
ওসমান পরিবারের ছত্রছায়ায় শহরবাসীর প্রতি নানা অবিচার, অত্যাচার অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবারো জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। চলতি সপ্তাহেই জুট সন্ত্রাস এবং হোন্ডা বাহিনী নিয়ে সেলিম ওসমানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনেও তার প্রতি ইঙ্গিত করে বক্তব্য রেখেছেন মেয়র। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যুতে মেয়র আইভীর উপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামের খালাস পাওয়া নিয়ে পুলিশের সমালোচনা করেন এই জনপ্রতিনিধি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী নগরীর হকার প্রসঙ্গে বলেছেন, আমরা এই শহরের প্রজা হয়ে রাজার রাজত্ব মেনে নিছি। নিরীহ প্রজা হয়ে রয়েছি এখানে। মাঝে মাঝে মাথা চারা দিয়ে দুই একটি কথা বলি। আমার বড় ভাই মাসুম ভাই ও মডেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ শহরের হকার নিয়ে দুঃখের কথা বলে গেলেন। ছোট ছোট দুঃখ কষ্ট গুলো যখন বিশাল আকার ধারণ করে তখন প্রতিবাদ স্বরুপ অনেক কিছু বলে ফেলি। এক শ্রেণির কর্তৃত্ব এবং রাজত্ব মেনে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষ চলছে। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে নারায়ণগঞ্জের রাজধানী কুমিল্লা হয়ে যায় কি না? আবার নামও পরিবর্তন হতে পারে! মাঝে মাঝে মনে হয় নারায়ণগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে ওসমান নগরী হলে আরও ভালো হত। তারপরেও তাদের এত অত্যাচার, অবিচার অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভাবে রুখে দাড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জবাসী। কারণ দীর্ঘ দিন যখন রাজার অত্যচার বাড়তেই থাকে তখন ক্ষোভে প্রজারা অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেন। সেই শক্তিশালী প্রজা ইতোমধ্যে এই শহরের মানুষ দেখেছে। গতকাল নগরীর আলী আহম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার মিলনায়তনে সাপ্তাহিক বিষের বাশি সাপ্তাহিক পত্রিকার ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মেয়র আইভী বলেন, আজকেও দুই একজনকে দেখলেন। আর শুরু করলেন আমাদের মডেল গ্রুপের মাসুদ ভাই। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে গেলেন, নারায়ণগঞ্জ এখন হকারের নগরী হয়ে গেছে। তার প্রমাণ দিয়ে গেলেন আমাদের এড. মাসুম ভাই। ২০১৮ সনের ১৬ জানুয়ারির কালো অধ্যায়ের ঘটনা সকলেরই মনে আছে। ওই দিন মাসুম ভাই সহ অনেকেই আহত হয়ে ছিলেন। সেদিন আমাকে মারার জন্য গুলি করা হয়েছিল। তখন আমার কিছু অকুতভয় কর্মী মানব ঢাল তৈরী করে আমাকে বাচিঁয়ে ছিল। জানেন ওই ঘটনার রিপোর্ট পুলিশ কি দিয়েছে? অস্ত্রধারী নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামের অস্ত্র দেখেছে কিন্তু সেই অস্ত্রকে লাইসেন্স করে আপতত তাকে পাওয়া গেল না বিধায় কিংবা তার সাক্ষাৎ না পাওয়া অস্ত্র মামলা থেকে খালাস দেয়া হলো। গত ৩ দিন আগে পুলিশ এই রিপোর্ট দিয়েছে। আমরা আদালতে সেই রিপোর্টে নারাজি দিয়েছি। মামলার জন্য থানায় দুই বছর ঘুরেছি এই ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয় নাই। পরে আমরা হাই কোর্টের অনুমতি নিয়ে মামলা করেছি। আর এখন অনেকে অনেক কিছু বলে। এই সামলাও, ওই সামলাও।
হোন্ডা বাহিনী প্রসঙ্গে মেয়র আইভী বলেন, নির্বাচনের বছর চলে আসছে। আগামী একবছর পর নির্বাচন হবে। তাই অনেকের এখন টনক নড়েছে অমুক বাহিনী, খান বাহিনী চাই না। হোন্ডাবাহিনী চাই না। নারয়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমানের বক্তব্য প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমার কথা হলো ভাই, এই ৪ বছর কি করলেন। আপনারা ৩০ বছর যাবৎ এই শহরকে জিম্মি করে রেখেছেন। হঠাৎ করে মনে হয়েছে এই কথাগুলো বলতে হবে, আর বলছেন। আপনারা মনে করছেন নির্বাচনের মৌসুমে এই কথা বলে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়া যাবে। আর মানুষ তাদের ভোট দিয়ে দিবে। না, এই শহর-বন্দরের মানুষ এখন সব বুঝেন।
মেয়র আইভী জেলা প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা কারো কাছ থেকে কোন কিছু চাই না। আমরা চাই প্রশাসন তার নিজ দায়িত্বটা সঠিক ভাবে পালন করুক। গণপ্রজাতন্ত্র সরকারের কর্মচারী কর্মকর্তা হিসেবে নাগরিকদের প্রতি তাদের যে দায়িত্ব সে দায়িত্বটা তারা পালন করুক। আমার মনে হয় না টেবিল টকে বইসা শহরের সমস্যা সমাধান করতে হবে। একটি শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ফুটপাত পরিষ্কার রাখা যাবে না এটা কেমন কথা। ধনী জেলার শহর হিসেবে এখান থেকে কোটি টাকা কিছু লোকজন নিয়ে যাচ্ছে। সরকারি কর্মচারী, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এমন কেউ নাই যে নারায়ণগঞ্জ থেকে টাকা নেয় না। টাকা নেয়া একদম ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। তাহলে কেন কাজ করবেন না। এই শহরের মানুষের কাছ থেকে নিচ্ছেন অথচ সেবা কেন দিবেন না।
নারায়ণগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার এসপি হারুন নিয়ে আইভী বলেন, কেন নারায়ণগঞ্জের মানুষ এসপি হারুনকে সিংহাম উপাধি দিয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের হয়ে এসপি হারুন কাজ করেছেন। এসপি মাহবুবের মত তিনি আমাদের কাছে এসপি হারুন হয়ে থাকবেন। তিনি যদি আইজি হয়ে যায় তাহলেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ তাকে এসপি হারুন হিসেবে স্বরণ রাখবে। তিনি নারায়ণগঞ্জের গতানুগতিক পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে কাজ করে দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রজাতন্ত্রের চাকরী জীবি হিসেবে কাজ করে গেছেন। তিনি কোন দলের লোক কিংবা কাউকে না দেখে পূর্বের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করে গেছেন। দীর্ঘ দিন যাবৎ ফ্লাট, বাড়িঘর প্রভাবশালীদের দখল থেকে উদ্ধার করেছেন। যে কাজ গুলো মেয়র এমপিদের করা কথা সে কাজ গুলো তিনি করেছেন। আর এ জন্য নারায়ণগঞ্জের মানুষ এসপি হারুনকে মনে রেখেছে।
এসপি হারুনের সময়তো ফুটপাত, ট্রাক স্ট্যান্ড বসে নাই। তিনি তার লোকজন নিয়ে প্রায় বের হতেন তখন পুলিশের সকলে কেন কাজ করেছে। এখন কেন করতে পারেন না। কিসের যোযুর ভয়। তখনতো এই এমপি সাহেবরাই ছিল তখন কেন ভয় পেলেন না, এখন ভয় কিসের। এখানে কোন ভয় না, আমি মনে করি সমঝোতা। সমঝোতা করে এই শহরে আদান প্রদান চলে। আর আদান প্রদান চলে বিধায় শহরে কোটি কোটি টাকা চাদাঁবাজি হচ্ছে। আর এই টাকা যাই কই। সাংবাদিক ভাইয়েরা একবার দুইবার লিখে চুপ হয়ে যান, এর পরে আর লিখেন না। অপেক্ষায় থাকেন কখন মেয়র আইভী ও এড. মাসুম দুই একটা কথা বলবে তখন ওইটার হেডিং ধরে দুই তিন দিন লিখবেন। আবার মাঝে মধ্যে লাগাই দেয়ার চেষ্টা করেন।
নিজের শহরকে ভালো করার জন্য দুই চার কলাম হয় লিখেন আর না হয় আমার পাশে এসে দাঁড়ান। মন্ত্রী মহোদয়ের এখানেও অনেক সমস্যা আছে। আমরা শহরেও সমস্যার মাঝখান দিয়ে যাচ্ছি। ব্রিটিশে আগে থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ঐতিহ্য রয়েছে। সোনারগাঁ ছিল রাজধানী। তখন পাটের জন্য এই নারায়ণগঞ্জের সুনাম সুখ্যাতি ছিল। কিন্তু ২০ থেকে ৩০ বছর যাবত এই শহরে সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। আমাদের বিসিক নগরীর গার্মেন্টেস’র জন্য বিখ্যাত, তাছাড়া রূপগঞ্জের মসলিন কাপড়ের জন্য বিখ্যাত তাই আমরা সেই দিনকে ফিরিয়ে আনতে চাই। আমরা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যতে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা কোন রাজার রাজত্ব করতে চাই না। এক সাথে অনেক কিছু করতে পারবেন আমরা আপনাদের রাজত্ব মেনে নেই নাই আর মেনেও নিবো না।
ডিসি-এসপিকে উদ্দেশ্য করে নাসিক মেয়র বলেন, ব্যবসায়ীরা যখন ডিসি এসপির সাথে টেবিল টকে বসেন তখন শহরের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। ব্যবসায়ীরা ডিসি এসপির রুম সাজিয়ে দেয়ার পাশাপাশি তাদের অনেক সহযোগিতা করছেন। ডিসি এসপি সাহেবদের যখন যা দরকার তখন সব কিছু ব্যবসায়ীরা করে দিচ্ছেন। তাহলে তারা কেন আমাদের সার্ভ করবেন না। আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী কেন সাফার করবো। প্রশাসন কি করে। কেন আমরা এই শহরে ভালো ভাবে কাজ করতে পারবো না। কেন জনপ্রতিনিধিদের সার্বক্ষণিক এই শহরের মানুষের রোষানলে আমাদের পড়তে হবে। এই কেন’র উত্তর মন্ত্রীর কাছে রেখে গেলাম। কেন’র উত্তর আমি মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে রেখে গেলাম। কারণ তিনি নারায়ণগঞ্জের সন্তান এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে আছেন। আমি সত্য কিছু ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারি না। আমার অভ্যাসই এমন। অনেকবার চিন্তা করি বলব না। কিন্তু দাঁড়িয়ে না বলে থাকতে পারি না।
এছাড়া গত দুই দিন যাবত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান হোন্ডাবাহিনী নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এই শহরে কারা লম্বা লম্বা চুল নিয়ে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর মালিকদের থেকে চাঁদাবাজি করেন। তারা হোন্ডা কিনেন কোথা থেকে। তাদের উৎস কিসের। তাদের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরী করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ডিসি এসপিকে তিনি আল্টিমেটাম দেন। তার সেই বক্তব্য গত কয়েক দিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জ শহর টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে। তবে সচেতন মহল থেকে ঘুরে ফিরে একটাই দাবী উঠছে তাহলো এই শহরকে হকার মুক্ত রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাস মুক্ত রাখা। সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে নগরবাসী।
সাপ্তাহিক বিষের বাঁশী পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক সুভাষ সাহার সভাপতিত্বে বিশেষ বাঁশী’র ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী গুণীজন সম্মাননা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব কাজী কবীরের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। আরো বেশ কয়েকজন গুণীজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে, ডিবির প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, কবি ও সাংবাদিক এবং নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হালিম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠক এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম, কবি এবং সাংবাদিক নাফিজ আশরাফ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মডেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুজ্জামান মাসুদ, ইব্রাহিম নিট গার্মেন্টস প্রা.লি. ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিআইপি কানিজ ফাতিমা রীমা, দৈনিক যুগের চিন্তা পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক আবু আল মোরছালীন বাবলা, নারায়ণগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল হক রুমন রেজা, বিশ্ব রঙের চেয়ারম্যান বিপ্লব সাহা, গীতিকার হাশিম মাহমুদ, আশীষ কুমার দাস, আবুল কালাম আজাদ এবং তানভীর আহমেদ টিটু, লায়ন শামসুন্নাহারকে।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের মূল পর্বে গুণীজনদের উত্তরীয় পড়িয়ে সম্মান জানান সাপ্তাহিক বিষের বাঁশী পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক সুভাষ সাহা। এরপর একে একে সম্মাননা প্রদান করা ব্যক্তিদের অবদানের নানা বিষয়াদি ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। জাকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে সমাজের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় নারায়ণগঞ্জের এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে সম্মাননা পাওয়া অতিথিরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পরিবেশন করেন এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
এস.এ/জেসি


