# আমার বাবা আউলিয়া না, সাধারণ মানুষ
# গরীব মানুষদের তুই-তুকারি করলেন কেন
# ওসমানীয় সাম্রাজ্য নিয়েও মুখ খুলেছেন তিনি
নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের উত্তর দক্ষিণের রাজনৈতিক বিরোধ নতুন কিছু নয়। বক্তব্য পাল্টা বক্তব্যে এই বিরোধ প্রায় সব সময়ই থাকে। তবে এবার সেই বিরোধ আবারও যেন নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। যা আবারও প্রকাশ্যে এসেছে শহরের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে সৃষ্ট গত কয়েকদিনের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে।
সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল বুধবার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে। এছাড়া সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মন্তব্য ওসমানীয় সাম্রাজ্য নিয়েও মুখ খুলেছেন এমপি শামীম ওসমান।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বক্তাবলীর একটি বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এমপি শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষের যে একটি মূল সমস্যা, আমাদের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করা, যারা এই কাজটি করে তাদের যারা যে নামেই ডাকুক না কেন, আমি বলি পরিচ্ছন্নতা কর্মী।
এই পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা তাদের কিছু কথা বলতে একজন জনপ্রতিনিধির কাছে গিয়েছিল। ওরা আমাকে প্রশ্ন করলেন যে, ভোটের আগেতো আপনারা সবাই আমাদেরকে আপনি বলে ডাকেন, ভোটের পরে এই গরীব মানুষদেরকে (সেখানে যাওয়ার পর) তুই তোকারি করলেন কেন?
একই অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতি ইঙ্গিত করে এমপি শামীম ওসমান বলেন, অনেকেই বলেন আমরা নাকি নারায়ণগঞ্জে ওসমানীয় সাম্রাজ্য কায়েম করেছি। এ কথা সত্য যে আমরা সাম্রাজ্য কায়েম করেছি। আল্লাহর হুকুমে দাদা, বাবা ও ভাই ছিলেন এমপি।
আমরা মানুষের মনের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছি। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীরাও মানুষ। তারা তাদের দাবী নিয়ে গেল সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে। সেখানে পুলিশ দিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়া হলো। আমাদের একজন যার জন্য আমরা নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছিলাম। আপনারা সকলে ভোট দিয়ে পাশ করিয়েছি।
এখন তিনি আপনাদের চাকরি খাওয়ার হুমকি দেয়। বলা হলো ‘ভাত খাইতে ভাত পাস না, ফোন কিনস কই থেইক্কা।’ এটার উত্তর আমি দেব না, আমি উত্তর দেই, আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে কোথাও কেউ ভাত না খেয়ে নেই শেখ হাসিনার আমলে। ইনকাম ট্যাক্সের ফাইলে টাকা নেই, এত বাড়ি কোথা থেকে হলো সে প্রশ্ন কে করবে।
আমরা বঙ্গবন্ধুকে চিনেছি তার আদর্শকে চিনেছি। তুই তুকারি আল্লাহ পছন্দ করে না। আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। আমি এজন্য সাংবাদিকদের মাধ্যমে সকলের কাছে ক্ষমা চাই। হাতজোড় করে ক্ষমা চাই। আমি এ বিষয়ে বেশী কিছু বলতে চাইনি কিন্তু যেহেতু সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছে সেহেতু উত্তর দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমার ভালো মানুষ দরকার। আমার মাস্তান দরকার নাই। ৪০ থেকে ৫০ হাজার খারাপ মানুষের সঙ্গে আমি একাই লড়তে পারবো। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে রাজনীতি করি। সুতরাং আমার এসব দরকার নাই। আমি অচিরেই সবগুলো এলাকাতে যাব। তাই সকলকে বলছি সন্ত্রাস, ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ ও ইভটিজারদের রুখে দিতে হবে।’
আলীরটেক ও বক্তাবলীর প্রতি আমার সব সময়ে একটি দায়বদ্ধতা কাজ করে। বিগত দিনে আমি এ দুটি এলাকাকে সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দিয়েছি। আগামীতে বেঁচে থাকলে বক্তাবলীকে নারায়ণগঞ্জের সুন্দর এলাকা বানাবো। এজন্য এলাকাকে ভালো মানুষ প্রয়োজন। তিনি বলেন, পুলিশকে গালি দেন যারা তাদের পুলিশের পাহারায় থাকতে হয়।
আমাদের ওসামানীয় সাম্রাজ্য বলা হয়। আমার দাদা এমপি ছিল, বাবা এমপি ছিল। আমরা তিন ভাই এমপি হয়েছি। আমরা সাম্রাজ্য কায়েম করেছি সত্যি। কারো জমি দখল করে করিনি। মানুষের মনে জায়গা করে সাম্রাজ্য গড়েছি। আমাকে বিভিন্নভাবে গালাগালি করা হয়। ৩০ বছর আগে হলে জবাব দিলে শহরে থাকতে হতো না। যারা গালাগালি করে আমার তাদের প্রতি মায়া লাগে। আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদের হেদায়েত করে।
তিনি বলেন, আমি বারবার সাংবাদিক ভাই ও আমার রাজনৈতিক কর্মী ভাইদের প্রতি বলি, সে যেই দলই করুক না কেন! রাজনীতি করতে গেলে সত্য কথা বলার সাহস থাকতে হবে। যদি সত্য নাও বলতে পারি অন্ততপক্ষে মিথ্যে বলবো না। সাংবাদিকতা করতে গেলে সত্য লিখতে হবে কিংবা সত্য বলতে হবে। যদি সত্য লিখতে বা বলতে পারি তাহলে প্রচার করবো না হয় প্রচার করবো না।
নারায়ণগঞ্জের গতকালের (মঙ্গলবারের) একটি ঘটনার বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, আপনি যে নৌকা মার্কার এমপি, আপনি এবং আপনার দল সবার কাছে ভোট চেয়েছেন। আপনাকে উত্তর দিতে হবে। আমি দেখলাম যে আমি কি উত্তর দিব! তারা বললো আপনি কেন উত্তর দিচ্ছেন না। আমি বলেছি উত্তর যদি দিতেই হয়ে তাহলে আমি মিটিংয়ে যাচ্ছি। সেখানে গিয়েই উত্তর দিব।
শামীম ওসমান বলেন, আমি কোন অলি আউলিয়ার ছেলে না। আমার বাবা কোন অলি আউলিয়া ছিলেন না, খেলাফতও পাননি। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। খান সাহেব ওসমান আলীর ছেলে ছিলেন একেএম শামসুজ্জোহা।
আমার পিতা (শামসুজ্জোহা) এমপি ছিলেন দুইবার, কিন্তু আমাদের পরিবারের জন্য এক টাকাও রেখে যাননি। আমি টাকার জন্য ফরম ফিলাপ করতে পারি নাই। ৭৫ থেকে ৭৯ পর্যন্ত এক বেলা ভাত খেয়েছি আরেকবার ভাত খাই নাই। আমার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে মসজিদের মধ্যে জিলাপী দিয়ে।
আমার বড় ভাই এমপি সেলিম ওসমান, যিনি নিজের টাকা দিয়ে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন। সেই ভাই এক সময় ঢাকা থেকে ময়মনসিং বাস চালিয়েছেন। সেই বাসে করে মুরগী নিয়ে এসে বাইতুল মোকারমের সামনে মুরগী বিক্রি করেছেন। তবু কারও কাছে মাথা নত করি নাই।
আমার বাবা চাইলে নারায়ণগঞ্জের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা কিনে নিতে পারতেন। কিন্তু আমার বাবা কোন জমি দখল করেননি। কোন ভূমিদস্যুতা করেননি। স্বাধীনতার পরে আমার বাবা কোন লুট করেন নাই, লুটেরা হন নাই।
কোন হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি দখল করেননি। আল্লাহ কাছে শোকরিয়া যে, আমার বাবা-মা, বড় ভাই আমাদের জন্য কোন টাকা রেখে যাননি। মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়ে গেছেন। সেটা নিয়েই বেঁচে আছি।
আমরা আমাদের বাবা-মার কাছ থেকে, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শ থেকে মানুষকে সম্মানিত করতে শিখেছি। তাতেই আল্লাহ সম্মানিত হবেন। তুই তোকারি আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই ভোটের আগে যদি আমরা এক রূপ ধরি আর ভোটের পর আরেক রূপ ধরি, সেখানে আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ কইরেন না।
যারা করেছেন আমি জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার একজন কর্মী হিসেবে ঐ সকল মানুষের কাছে, যাদেরকে বলা হয়েছে চাকরি খেয়ে ফেলা হবে, আমি আপনাদের সবার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারা পরিচ্ছন্নতা কর্মী কিন্তু আপনারা মানুষ, আপনারা কাজ করে খান।
সাংবাদিক ভাইদের রাইট আছে জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন করার এবং সেই প্রশ্ন উত্তর আদায় করার। সেই কারণেই আমি আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আমি ধৈর্য্য ধরি। বিশ বছর আগে হলে আমার জবাব দিতে সময় লাগতো না। এখন যারা গালাগালি করে, আমার তাদের জন্য মায়া লাগে, কারণ আল্লাহ গীবতকারীদের পছন্দ করেন না।
এর আগে গত মঙ্গলবার মজুরী বৃদ্ধির দাবি দাওয়া নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সামনে আবর্জনা ফেলে নগর ভবন ঘেরাও করেন সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত পরিচ্ছন্ন কর্মীগণ। সে সময় তারা হাতের ঝাড়ু নিয়ে এই প্রতিবাদ করে এবং বিদেশী দাতা সংস্থার একটি প্রতিনিধি দলের গাড়ি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে।
সে সময় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি আনিচুর রহমানের উদ্যোগে পুলিশের একটি টিম গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। সে সময় গোলমাল শুনে নিচে নেমে আসেন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। এই ঘটনারয় তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে চাও করো, মেয়রকেও ঘেরাও করে রাখতে চাও, করো।
এই নগর ভবনে ময়লা ফেলার দুঃসাহস দেখালে কেন? তখন তিনি খেপে গিয়ে আরও বলেন, খাইতে ভাত পাওনা, আন্দোলন করো, এত দামি মোবাইল পাইলা কই? কোনও সিটি করপোরেশনেই বাংলাদেশ সরকার তোমাদের চাকরি পারমান্যান্ট করেনি। তাহলে নগর ভবনে তোমরা ময়লা ফেলার দুঃসাহস দেখালে কেন? এটা কোন ধরনের আচরণ?
তিন মাস আগে তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ফান্ডে টাকা না থাকায় এখন পর্যন্ত কাউকেই বর্ধিত বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ কোনো সিটি করপোরেশনেই পরিচ্ছন্নকর্মীরা চাকরিতে স্থায়ী না। সরকার কাউকেই স্থায়ী করে নাই, তোমাদের আমি রাখতেও পারি, না-ও রাখতে পারি।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৬ মার্চ সন্ধ্যায় শেখ রাসেল নগর পার্কে ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার দশ বছর পূর্তিতে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ ও শিশু সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ত্বকীর ঘাতকদের প্রতি নিন্দা জানিয়ে আইভী বলেন, ‘ত্বকী হত্যার বিচার হবে, অবশ্যই হবে, হতেই হবে।
আমি আমার সরকারের কাছে অনুরোধ জানাবো, আপনি অনেক হত্যাকান্ডের বিচার করেছেন। দয়া করে ত্বকী হত্যারও বিচার করেন। সারাদেশের মানুষ জানে কারা ত্বকীকে হত্যা করেছে। সুতরাং হত্যাকান্ডের বিচার করা হোক।’ একাত্তরের পর থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের মানুষকে ভয় দেখাতে, তাদের অন্ধকারে রাখতে একটি মহল হত্যার রাজনীতি করেছে বলেও মন্তব্য করেন সিটি মেয়র।
তিনি আরও বলেন, ‘এই শহরকে ভূতের রাজ্য, সন্ত্রাসের রাজ্য বানানো হয়েছিল। এখন মানুষ জেগে উঠেছে। তারা প্রতিবাদ করে, খুনিকে খুনি বলতে পারে। ত্বকীকে আমরা হারিয়েছি কিন্তু ত্বকী আমাদের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে ‘ওসমানীয় রাজত্ব’ চলে উল্লেখ করে সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘বাংলাদেশের বাকি ৬৩ জেলা চলে একভাবে আর নারায়ণগঞ্জে চলে ওসমানীয় রাজত্ব।
এ রাজত্বে প্রশাসন কিছুই করে না। তারা গডফাদারদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কাজ করে। প্রশাসনের লোকজন কার হুকুম পালন করতে নারায়ণগঞ্জে আসে, সরকারের নাকি স্থানীয় গডফাদারদের? এইটা আমি এখনও বুঝতে পারি না। পুরা শহর ওসমানীয় সাম্রাজ্য হয়ে গেছে।’ এই শহর থেকে জুলুম শেষ হবে বল আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আইভী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ ইতিহাস, ঐতিহ্যের শহর ছিল। কিন্তু এখন সারা বাংলাদেশের সব জায়গার মানুষ জানে, এই শহরে দিন-দুপুরে হত্যা করা হয়। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এইটা আমরা পাল্টে দিতে চাই। তাদের পজেটিভ নারায়ণগঞ্জ উপহার দেবো।’ এন.হুসেইন/জেসি


