# ইতোমধ্যে বিভিন্ন যায়গায় হোন্ডা বাহিনীকে ধাওয়া দেয়া শুরু হয়েছে : আইভী
# তার (মেয়রের) এমন কথায় আমি লজ্জা পেয়েছি : শামীম ওসমান
দীর্ঘদিন যাবত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি কথার বেশ আলোচনা হয়। আলোচনার বিষয় হলো নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতির দুটি প্রধান বলয়ের এক টেবিলে বসা নিয়ে। এই বলয় দুটি শহরের উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু হিসেবে আলোচকদের কাছে পরিচিত। উত্তর মেরু হলো ওসমান পরিবার, যার বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। আর দক্ষিণ মেরু হলো চুনকা পরিবার, যার বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী।
পারিবারিক সূত্রে সেই বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই এই দুই মেরুর বিরোধ বিদ্যমান। তবে ২০১১ সালের নাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ পুনরায় প্রকাশ্যে এবং চরম আকার ধারণ করে। যা ২০২২ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রকাশ্যে চলতে থাকে। তবে সেই নির্বাচনের পর বেশ কিছুদিন এই বিরোধ কিছুটা স্তিমিত ছিল। তবে আবারও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে সেই বিরোধ। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যা ঝড়ের রূপে দেখা যাচ্ছে। আজকে মেয়র কোন বক্তব্য দিচ্ছেন তো কাল সাংসদ দিচ্ছেন। উভয়েই উভয়কে ঘায়েলের চেষ্টার কমতি রাখছেন না।
অনেকেরই ধারণা শহরের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুকে একটেবিলে বসাতে পারলে যেমন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দূর হবে। তেমনি নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের সকল বাধাও দূর হয়ে যাবে। এমনকি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানও এই বিষয়ে সহমত পোষণ করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি এক টেবিলে বসানোর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলেও জানিয়েছিলেন। এরপর বেশ কয়েকবার মেয়র আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমানকে এক টেবিলে দেখা গেছে।
আর এই এক টেবিলে বসার মধ্যস্ততায় ছিলেন নারায়ণগঞ্জ এর জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সৌজন্যতার খাতিরে হলেও এই দুজনকে এক টেবিলে দেখে চোখ জুড়ানোর চেষ্টা করেছেন নারায়ণগঞ্জবাসী। কিন্তু বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্যে তাদের একসাথে বসানোর উদ্যোগ নেওয়ার কোন সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়নি। একদিকে নারায়ণগঞ্জে ওসমানী সাম্রাজ্য নিয়ে বিভিন্ন সময় বক্তব্য রাখেন মেয়র আইভী। অন্যদিকে শামীম ওসমানও মেয়রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেন।
সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের ছয় দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনকে ঘিরে শুরু হয়েছে চরম আকারে। গত ১৪ মার্চ নাসিকের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা তাদের দাবি আদায়ে নগর ভবন এলাকায় বিক্ষোভ করে। সে সময় তাদের মজুরী বৃদ্ধি, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় কোন পরিচ্ছন্ন কর্মীর মৃত্যু হলে ৫ লাখ টাকা, স্বাভাবিক মৃত্যুতে সৎকারের জন্য ৫০ হাজার টাকা, প্রতি ওয়ার্ডে দুই জন করে ডোম নিয়োগ এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর অঞ্চলে স্থায়ী আবাসনের জন্য বহুতল ভবন নিমার্ণের দাবি জানান।
এ সময় নাসিক ভবনের সামনে ময়লা ফেলাসহ নাসিকে আসা বিদেশী অতিথিদের লাঞ্ছনার চেষ্টা করা হয় বলেও জানা যায়। সে সময় মেয়র নিচে নেমে এসে এখানে ময়লা ফেলার কারণ ও সাহস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং পরিচ্ছন্নকর্মীদের তিরষ্কার করেন। একই সাথে তিনি পরিচ্ছন্ন কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে বলেও জানান। তবে মেয়রের এই তিরস্কারমূলক আচরণের জবাব দিতে ছাড়েননি এমপি শামীম ওসমান।
পরের দিন ১৫ মার্চ ফতুল্লার বক্তাবলী এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইভীকে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, নারায়ণগঞ্জে নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচিত এক জনপ্রতিনিধির কাছে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা তাদের কষ্টের কথা বলতে গিয়েছিল। ওরা আমাকে প্রশ্ন করলেন যে, ভোটের আগেতো আপনারা সবাই আমাদেরকে আপনি বলে ডাকেন, ভোটের পরে এই গরীব মানুষদেরকে (সেখানে যাওয়ার পর) তুই তোকারি করলেন কেন।
এ সময় তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি মেয়রের ব্যাপক সমালোচনা করেন। শামীম ওসমান আরও বলেন, তার (মেয়রের) এমন কথায় আমি লজ্জা পেয়েছি। আমাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও কিন্ত মানুষ। আমি ওই পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কাছে ক্ষমা চাই। জনপ্রতিনিধির এমন কথা শুনে লজ্জা হয়। আপনাদের ট্যাক্সের ফাইলে টাকা না থাকলে এতো বড় বড় বাড়ি-ঘরে কিভাবে থাকেন। তবে এর জবাব দিতে দেরি করেননি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী।
১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত আর কিছু না পেয়ে আমার সুইপারদের নিয়ে রাজনীতি করতে হলো। আমি নোংড়া রাজনীতি করতে না পারলেও সাহসিকতার সাথে নোংড়ামীর জবাব দিতে পারবো। একই দিনে নারায়ণগঞ্জ আলী আহমেদ চুনকা পৌর পাঠাগারে এক অনুষ্ঠানে সরকারের উদ্দেশ্যে মেয়র বলেন, ত্বকী হত্যাসহ সকল হত্যাকান্ডের বিচার করেন। আমরা এই সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তি চাই। কতিপয় লোকজন সরকারের সকল অর্জন শেষ করে দিচ্ছে। এই আস্কারা এই সাহস তারা কোত্থেকে পায়?
নির্বিচারে মানুষ হত্যার লাইসেন্স তাদের কে দেয়? তারা ভয় দেখিয়ে মানুষকে ভীত করে রাখতে চায়। আমার মনে হয় না নারায়ণগঞ্জের মানুষ এখন আর তাদের ভয় পায়। ভয় পেলে এমন হোন্ডাবাহিনী এমন ধাওয়া খেতোনা। এক দেড়শত হোন্ডাওয়ালাকে গুটিকয়েক মানুষ ধাওয়া দিল। কত দূর্বল আপনারা দেখেছেন! যারা অসৎ ও অন্যায় কাজ করে, হত্যা করে, জুজুর ভয় দেখাতে চায় তারা দুর্বল, কারণ শাসক সবসময় দূর্বল থাকে। জনগণের শক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় হোন্ডা বাহিনীকে ধাওয়া দেয়া শুরু হয়েছে। অনেকে আবার বড় বড় কথা বলে। শহরে নাকি বের হতে দেবে না।
আইভী আরও বলেন, ইতোমধ্যে দেখতে পেয়েছেন বিভিন্ন যায়গায় হোন্ডা বাহিনীকে ধাওয়া দেয়া শুরু হয়েছে। পর পর তিনটা ঘটনা ঘটেছে নদীর ওই পাড়ে। গতকালকেও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে সেই ভূমিদস্যুদের হোন্ডা পুড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে আবার বড় বড় কথা বলে। কি বলে, শহরে নাকি এখনো বের হতে দেবেনা। কত বড় দুঃসাহস হলে খুনিরা খুন করেছে একটি বাচ্চাকে মেরে ফেলেছে তারপরে ওই বাচ্চার পিতা যখন প্রতিবাদ করে তাকে আবার নানাভাবে উত্যক্ত করে। আমরা যারা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি তাদের পরিবারকে অত্যাচার করে, তাদেরকেও তারা হুমকি ধামকি দেয়।
তিনি আরো বলেন, আপনার চ্যালা চামচাদের বলে দেবেন, যখন যা কিছু মন চায় তখন যেন তা না বলে, কারণ মানুষেরও ধৈর্য্য আছে। ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়েই চারটা নির্বাচন করেছি। তারপরেও এই শহরে মানুষ ভোট দিয়েছে। একটা বিজয় মিছিলও করিনি। কোন ধরনের অপকর্ম এই শহরে হয়নি এর মানে এই নয় যে আপনাদের কিছু করতে বা বলতে পারবো না। অন্যদিকে ১৭ মার্চ গোদনাইল এলাকায় একটি বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ১০৩তম জন্ম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে এখন যারা অনেক বড় বড় কথা বলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা আগরতলা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। লুট করে অনেকে সম্পদ কামিয়ে ছিলেন, চোরের মার বড় গলা। এরা অনেক বড় বড় কথা বলে, আমি তাদের উত্তর দেই না। আমাদের বাড়ি, হিরা মহল নিলামে বিক্রি করা হয়েছিলো। নিলাম কি তখন বুঝতামও না। কত বড় বড় লোক, কত কোটি পতি নারায়ণগঞ্জে, কত লুটেরা, কত বঙ্গবন্ধুর নাম বেঁচে পয়সা কামানো মানুষ, কথায় কথায় যারা রূপ বদলায়। কখনো কাক, কখনো কোকিল। সেই সমস্ত মানুষ যারা আছিলেন তখন, তারা কেউ এগিয়ে আসেন নাই। অনেকে অনেক কথা বলে। কি কি জানি গালাগালি করে আমাদের। আমি আবার এগুলি শুনি না, কারণ আমার মায়া লাগে ওদের জন্য।
সবকিছু মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের দুই বলয়ের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের রাজনীতি এখন খুবই উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকেই বারেবার চেষ্টা করা হয়েছে। নাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও চেষ্টা করেছেন। এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও কয়েকবার তাদেরকে ডেকেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু যেই লাউ সেই কদুই রয়ে গেছে। বিষয়টি কোন মাত্রায় পৌছানোর পর শহরবাসীর তথা নারায়ণগঞ্জবাসীর এই দুই বলয়ের সমঝোতার আশ্বাস পূরণ হবে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে।
এস.এ/জেসি


