সমন্বয়হীনতায় ভুগছে জেলা মহানগর আ.লীগ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:৩০ পিএম
# দুই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিভক্ত
শিল্প বাণিজ্যে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ জেলাটি রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা। আওয়ামী লীগের সুতিকাগার হিসাবে পরিচিতি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে বিরোধ নিয়েই পার করে বছরের পর বছর। দীর্ঘ সময়ের রাজনীতিতেও সেই দুই মেরু বিরোধ কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হয় নি। যার প্রভাব পড়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিসহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নামক অন্যতম দুটি কমিটির মধ্যেও। এমনকি এই মেরু ভিত্তিক রাজনীতির কারণেই সদ্য বিলুপ্ত করা জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির বেশ কয়েকটি পদ শূন্য রেখেইে শেষ করতে হয়।
অন্যদিকে অনেকটা সেই ধারাবাহিকতাকে বজায় রেখেই যেন রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় অর্থাৎ যে সময় দেশের দুয়ারে কড়া নাড়ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠিক সে সময়ই দেখা দিয়েছে দলীয় নেতৃত্বে থাকা কর্ণধারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। বিষয়টা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অনেকটাই নেতিবাচক হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে মনে করে বিশ্লেষকগণ। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যকার সমন্বয় হীনতার বিষয়টি দলের নেতা, কর্মী ও সমর্থকসহ রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কাছে বিষয়টি দৃষ্টিকটু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সম্প্রতি দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের আলাদা পালন করাসহ তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে তা স্পষ্ট আকারে ফুটে ওঠছে।
দুই মেরুতে বিভক্ত থাকাবস্থায়ই ২০১৬ সালে আব্দুল হাইকে সভাপতি, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহসভাপতি ও আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর প্রায় বছর খানেক পর অর্থাৎ ২০১৭ সালের অক্টোবরে জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন দলীয় প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। সেই কমিটি গঠনের শুরুর দিকে বেশ কিছুদিন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠ দখলে রাখে আওয়ামী লীগ।
সেই কমিটিতে শূন্য ৬টি পদ পূরণ নিয়ে জেলা কমিটির দুই মেরুর মধ্যে নতুন করে শুরু হয় বিরোধ। এরপর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিগুলো নিয়ে এই দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে যায়। এখানে দুই মেরুর নেতাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। তবে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যকার দূরত্ব ব্যাপকহারে প্রকাশ্যে আসে। এমনকি সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে এবং নির্বাচন বানচালেরও একটি চক্রান্ত হয় বলে সে সময় বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ পায়।
কিন্তু যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া চুড়ান্ত হয়ে যায় তখন সুকৌশলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের হারানোর বিষয় নিয়েও তাদের মধ্যকার আন্তঃকোন্দলকে দায়ী করেন দলের তৃণমূলের পক্ষ হতে। দলের মধ্যে হাইব্রীড ও কাউয়া মার্কা আওয়ামী লীগারদের নেতৃত্বে আনার বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আসে। সোনারগাঁও আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়েও বেশ কথার রাজনীতি হয় দুজনের। সদর ও বন্দরে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও চলে দুই জনের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। এছাড়াও কেন্দ্রীয় বিভিন্ন কর্মসূচীসহ জাতীয় বিভিন্ন কর্মসূচীতেও দেখা যায় আলাদা আয়োজন।
একই অবস্থা নারাণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের। দীর্ঘ ২০ বছরের মতো একসাথে কাজ করেও দূরত্ব দূর করতে পারেননি সংগঠনের সভপতি আনোয়ার হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট খোকন সাহা। তাদের দ্বন্দ্বের কারণেই এখন পর্যন্ত মহানগর আওয়ামী লীগের আওতাভূক্ত ইউনিট কমিটি গুলো গঠন করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন সংগঠনের একাধিক সূত্র। ওয়ার্ড সম্মেলনে নেতা নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। তাই ফেব্রুয়ারিতেই ওয়ার্ড কমিটিগুলো গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে কে মনোনয়ন নিবেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে প্রকাশ্যে। শুধু তাই নয় এখানেও সেই দুই মেরুর রাজনীতির চর্চা হওয়ায় সব কিছুই চলছে সমন্বয় হীনতার মধ্য দিয়ে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কমিটিগুলোর প্রধানদের মধ্যকার এই বিরোধ বা সমন্বয়ের অভাব নতুন কিছু নয়। এর আগেও কোন কর্মসূচী পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য সভাপতি বরাবর জানতে চাইলে তারা সাধারণ সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলে দিতেন বলে জানা যায়। বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও তাদের আলাদা আলাদা পালন করতে দেখা গেছে। এমনও দেখা গেছে কোন একটি কেন্দ্রীয় কর্মসূচী কিভাবে পালন করা হবে কিংবা কি ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে সভাপতি সেই বিষয়ে কোন ধারণা বা তথ্য দিতে না পারলেও সাধারণ সম্পাদক তা ঠিকই পারেন।
অর্থাৎ এই সংগঠনগুলোর সভাপতিদের নিকট সেসব কর্মসূচীর বিষয়ে কোন তথ্যই থাকে না এমনকি সেই কর্মসূচী হবে কি না সেই বিষয়টি পর্যন্ত জানেন না। কিন্তু সাধারণ সম্পাদকের কাছে তার বিস্তারিত পরিকল্পনা ঠিকই থাকে। সব কিছু মিলিয়ে দলীয় কর্ণধারদের মধ্যকার এমন সম্পর্ক যেন আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব না পড়ে সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখার জন্য এবং দল মত নির্বিশেষে সবাই মিলে মিশে একাকার হয়ে কাজ করার জন্য দলীয় তৃণমূল থেকে জোরালো দাবি উঠেছে।
এস.এ/জসি


