# এর আগেও মামুন মাহমুদকে ভদ্রলোক বলে সম্বোধন করেন তিনি
রাজনীতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তাই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে ১৯৯১ এর জাতীয় নির্বাচন থেকে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান ছাত্র রাজনীতি থেকেই ছিলেন বিএনপির ঘোরতর বিরোধী। যা তিনি বিভিন্ন সভা সমাবেশের বক্তব্যেও বলে থাকেন।
তবে সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন সভা সমাবেশে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে নিয়ে সহানুভূতিশীল বক্তব্য প্রদান করছেন। এমনকি মামুন মাহমুদকে একজন ভদ্র লোক হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। যা বিএনপির অন্যকোন নেতাকে উদ্দেশ্য করে কখনও করেননি তিনি। যার কারণে বিষয়টি ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে একজন আওয়ামী লীগের রানিং সাংসদ নিজের মুখে নাশকতা সহ প্রায় আড়াই ডজন মামলার আসামিকে ভদ্রলোক হিসেবে সম্বোধন করা বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলেছে। এবারও সাংসদ শামীম ওসমানের মুখে শোনা গেলো সেই একই সুর। একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির বর্তমান আহবায়ক এবং বিএনপি মনোনীত সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে (নাম উল্লেখ না করে) খুনি উল্লেখ করে স্বভাবসুলব বক্তব্য প্রদান করছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় এক অনুষ্ঠানেও তিনি বিএনপি নেতা মামুন মাহমুদকে ভদ্রলোক হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে ট্যাবলেট (ট্যাব) বিতরণ অনুষ্ঠানে সাংসদ শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, ভদ্রলোক মানুষ শিক্ষিত লোক। আমার সাথে দু-একবার কথা হয়েছে, সিদ্ধিরগঞ্জ বাড়ি। এলাকার একজন সাবেক এমপি আছেন, অনেকগুলো খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যা আস্তে আস্তে বের হয়ে আসছে। দেখা গেল কয়েকদিন আগে তিন-চার মাস আগে পল্টনে তার ছোট ছেলে রিফাত, ওনি (মামুন মাহমুদ) ওর বাবার প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই এক ঢিলে দুই পাখি মারার জন্য একদিকে বাবার প্রতিদ্বন্দ্বিকে হত্যা করা।
দুই, বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের যদি মৃত্যু হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের উপর দোষ দেওয়া। হেরোইনচি টাইপ ছেলে, অর্থাৎ হেরোইন খায়, এসব মাদকাসক্ত ছেলেদের দিয়ে ওকে (মামুন মাহমুদ) পল্টনের সামনে কস্তুরী হোটেলের ওদিকে, উপর্যপুরি ছুরিকাঘাত করে। ছুরি প্রথমে পেটে মেরেছে, সে সময় ওই ভদ্র লোক ধরে ফেলেছে। খুলে টান দিতে পারেনি, টান দিলেই মারা যেত। তারপর ওই লোক (মামুন মাহমুদ) ধরে ফেলেছে, তারপর বুকে দুইটা মেরেছে। তা সিরিয়াসলি কিছু করতে পারেনি। তারপর ঐ এলাকার মানুষ তাকে সেফ করেছে।
ওই ঘটনায় তখনকার মতিঝিলের পুলিশ প্রশাসন (বর্তমানে ঢাকা গুলশানের ডিসি) বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেননি। ওনি দেখেছেন যে একজন অধ্যাপক মানুষ, বিএনপির নেতা ওনাকে কেন একজন হেরোইনখোর মারতে যাবে! তখন তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে, যে নারায়ণগঞ্জের ঐ সাবেক এমপি যিনি খুনের মামলার আসামী, এমনকি তৈমুর আলম খন্দকারের ভাইয়ের হত্যার প্রধান আসামী ছিলেন (হুকুম দাতা), ঐ লোক তার ছেলেকে দিয়ে এবং আরও কিছু লোক দিয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে। ঐ ছেলে সব স্বীকারোক্তি দিয়েছে, চার্জশীটও হয়েছে।
অন্যদিকে মামুন মাহমুদকে উদ্দেশ্য করে এর আগেও ভদ্রলোক উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। গত বছরের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং রেলগেট এলাকায় শামীম ওসমানের ডাকা সমাবেশে তৎকালীন বিএনপির সদস্য সচিব মামুন মাহমুদকে ভদ্রলোক হিসেবে সম্বোধন করেন তিনি। আর এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয় রাজনৈতিক মহলে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে শামীম ওসমানের স্থানীয় বিএনপি নেতা প্রীতি হিসেবেও উল্লেখ করেন।
এরও সপ্তাহ খানেক আগে ১৯ আগষ্ট ফতুল্লার ডিআইটি মাঠে শোক দিবসের আলোচনা সভায় শামীম ওসমান বলেন, এমন নাশকতা হতে পারে, বিএনপির মধ্যম সারির নেতাদের মেরে ফেলা হতে পারে। মাইরা আমাদের উপর চাপাতে পারে। কয়দিন আগেও হইছে। বিএনপির সেক্রেটারী অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ঢাকার একটি রেস্টুরেন্টের সামনে মাইরা ফালাইছিল। পাবলিক ধরে ফেলছে। এখানে নাম আসছে কার? যে মারছে সে নারায়ণগঞ্জের লোক না, কন্টাক্ট কিলার। চাকুটা ঘুরাতে পারে নাই। আমি শুনছি সাত দিন পর। ঘুরাইলে এই অধ্যাপক মামুন মারা যেতো।
তাছাড়া গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মীদের নামে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। জেলার সাতটি থানায় প্রায় দশটির মতো মামলা করা হয় বলেও জানা যায়। যেখানে বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা দায়ের করা হয়। অথচ এর আগে ৩০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা মামুন মাহমুদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের হয়নি বলে জানা যায়। অর্থাৎ যেখানে জেলার বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা এবং গ্রেফতার করা হয় সেই তালিকায় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাষায় ভদ্রলোক খ্যাত জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মামুন মাহমুদের নাম ছিল না বলে জানা যায়।
বিএনপির দলীয় সূত্র থেকে জানা যায়, যেহেতু বিএনপির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সাংসদের অনুগামী হয়ে আর্থিক সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়ে বিএনপির রাজনীতির আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন বলে অভিযোগ আসে। এই বিষয়টি নিয়ে নেতা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্য হতে বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য আসে তাই সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে একদিকে মামুন মাহমুদকে জনপ্রিয় হিসেবে আখ্যায়িত করা এবং দলীয়ভাবে মামুন মাহমুদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত নেতাকে দুর্বল করে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা বলেও মনে করেন তারা।
এস.এ/জেসি


