কথার লড়াইয়ে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রস্তুতি
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৩, ০৭:৩০ পিএম
# গিয়াসউদ্দিনের পাল্টা জবাবে উজ্জীবিত বিএনপি
# মামুন মাহমুদে ভর করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন শামীম ওসমান
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের কৌশল অবলম্বন করা নতুন কিছু নয়। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। যা নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত গত বেশ কয়েটি জাতীয় নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দৃশ্যমান ছিল। তবে এ ধরণের কলাকৌশল ব্যবহার করা হয় যখন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে কিংবা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তখন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত পাঁচটি আসনের মধ্যে প্রতিবারের মতো এবারও বেশি আলোচনা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-৪ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে। তবে এরই মধ্যে কথার লড়াইয়ে অর্থাৎ বক্তব্য পাল্টা বক্তব্যে জমে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের রাজনীতি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ একেএম শামীম ওসমান ও মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন।
একজন সরকার দলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য এবং অন্যজন বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হওয়া সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক। এর মধ্যে অবশ্য আরও একজন রাজনৈতিক নেতার নাম আসছে। তিনি হলেন জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ।
এখানে মজার বিষয় হলো গিয়াস উদ্দিনের বিষয়ে শামীম ওসমান ও মামুন মাহমুদ একই সুরে কথা বলছেন। আবার শামীম ওসমান তার স্বভাব বহির্ভূত প্রতিপক্ষ দলীয় নেতা মামুন মাহমুদকে ভদ্রলোক হিসেবে প্রমাণ করা এবং গিয়াস উদ্দিনকে খুনী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ এই দুইজনই গিয়াস উদ্দিনকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে গিয়াস উদ্দিনও তার বক্তব্যের মাধ্যমে শামীম ওসমানের অপরাধগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
গত বছরের শুরুর দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকেই রাজনৈতিক মাঠে অবস্থান নিতে শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপি। এরপর জেলা বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি হলেও বিষয়টি নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাননি এই আসনের সরকার দলীয় এমপি শামীম ওসমান।
এরই মধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলই তাদের কমিটিকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু করে। একই সাথে নেতৃত্ব বাছাই করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের আঁতাতের রাজনীতি ও সরকার দলীয় এমপির সাথে সমঝোতা করে আর্থিক লাভবানের রাজনীতি নিয়ে অনেক অভিযোগ উঠে।
বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা সেই তালিকায় খুব স্পষ্টভাবেই ছিল মামুন মাহমুদের নাম এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমানের সাথে তার আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও চলে সমালোচনা। গত আগস্ট মাস থেকেই যেন সেই সমালোচনার আগুনেই ঘি ঢালতে শুরু করেন এমপি শামীম ওসমান।
বছরের মধ্যবর্তী সময় এসে যখন বিএনপির নেতৃত্বের পরিবর্তনসহ আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়েও শুরু হয় হিসেব নিকেশ। তখনই আলোচনায় আসে সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের নাম। এখানে গিয়াস উদ্দিনের নাম আসার পর থেকেই যেন অর্থাৎ গত আগস্ট থেকে শামীম ওসমান গিয়াসকে টার্গেট করে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন।
গত ২৭ আগস্টের জনসভায় মামুন মাহমুদ এবং গিয়াস উদ্দিনের বিষয় উল্লেখ করেন শামীম ওসমান। সে বক্তব্যে বিএনপির এই দুই নেতার বিষয়ে ছিলো দুই রকমের সুর। মামুন মাহমুদের বেলায় ভদ্র লোক উল্লেখসহ বেশ নরম ভাব পরিলক্ষিত হলেও গিয়াসউদ্দিনের বেলায় শামীম ওসমানকে দেখা গেছে বেশ গরম। যেখানে বিএনপি নেতা মামুন মাহমুদের উপর সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মামুন মাহমুদকে আখ্যায়িত করেন নিতান্ত ভদ্রলোক হিসেবে।
আর গিয়াস উদ্দিনকে সেখানে হুকুমের আসামী করার চেষ্টা চলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে যেখানে আগামী জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য দুই প্রতিপক্ষ সম্পর্কে শামীম ওসমানের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে গিয়াস উদ্দিনের তুলনায় মামুন মাহমুদকে তার সহজ প্রতিপক্ষ বলে ধরা হয়। সেই থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সভা সমাবেশে তিনি একইভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করা হয়।
শামীম ওসমান বলেন, কিছুদিন আগে ঢাকায় মামুন মাহমুদের উপর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। তার সঙ্গে (মামুন মাহমুদের) আমার দুই একবার কথা হয়েছে। ভদ্রলোক মানুষ শিক্ষিত লোক। সিদ্ধিরগঞ্জ বাড়ি। ওই এলাকার একজন সাবেক এমপি আছেন। ওনি অনেকগুলো খুনের সঙ্গে জড়িত। ওনার ব্যাপারে আমি বলতে চাই না, ওনাকে আমি ফ্যাক্টর মনে করি না। এ সাবেক এমপির প্রতিদ্বন্দ্বী মামুন মাহমুদ।
এজন্য এই সাবেক এমপির ছেলে রিফাতসহ আরো কয়েকজন মিলে এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করে। তাদের পরিকল্পনায় একজন হেরোইনখোর পল্টনে মামুন মাহমুদকে উপুর্যপরি ছুরিকাঘাত করার মাধ্যমে সেই সাবেক এমপির এক প্রতিদ্বন্দ্বিকে সরিয়ে দিয়ে সেই দোষ তাদের উপর (শামীম ওসমানদের উপর) দেওয়া হতো বলেও জানান তিনি। পরে গ্রেপ্তারকৃত সেই হেরোইনখোরকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পেরেছে এবং আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে এর জবাব দিতে ছাড়েননি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের এক নেতা বলেন আমি নাকি অনেক খুনের সাথে জড়িত। আমি আর আমার সন্তান নাকি নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে অপরাধী। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, এই সরকারের আমলেই ত্বকী হত্যাকাণ্ডর ঘটনা ঘটেছে, র্যাব তদন্ত করেছে চার্জশিট দিয়েছে। কিন্তু আদালতে দেয়ার আগেই তা সরকারের প্রভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, অনেক টর্চারসেল নারায়ণগঞ্জে পাওয়া গেছে, ব্যাবসায়ীদের নিয়ে পেটানো হয়েছে; হত্যা করা হয়েছে। একটারও বিচার হয়নি। নারায়ণগঞ্জের মানুষ জানে কারা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। সাত খুনের প্রধান আসামিকে কে ভারত পালিয়ে যেতে বলেছে তা দেশবাসী শুনেছে বলেও বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আপনার সন্তানরা কোথায় চাঁদাবাজি করে সেটাও সবাই জানে। ডিস ব্যবসা, ইন্টারনেট ব্যবসা থেকে, সিএনজি, টেম্পো ও অটোরিকশা থেকে কারা চাঁদা নেয় সেটার ভাগ কোন পরিবারের সদস্যরা পায় এই বিষয়গুলোও না’গঞ্জবাসী জানে বলে জানান তিনি। গত ১৮ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
এস.এ/জেসি


