শামীম ওসমানের ছায়ায় ভিপি বাদলের প্রস্তাব
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৩, ০৮:৩১ পিএম
# প্রস্তাবিত কমিটিতে পোড় খাওয়া নেতাদের বাদ দেয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন
# দীর্ঘদিন জেলার বাইরে, ইউনিয়নের নেতা এমনকি পরিবারের সদস্যরাও মূল্যায়িত
জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন নিয়ে হাকডাক কম হয়নি। নেতৃত্বে কারা আসছেন সে নিয়েও নানা মুনীর ছিল নানা মত। উত্তেজনার পারদ যতখানি উত্তপ্ত হয়েছিল, সম্মেলনের দিন তার চেয়েও পরিণত হয় ম্যাড়ম্যাড়ে অবস্থানে।তৃণমূলের প্রবল আপত্তি থাকার পড়েও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এড. আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদলকেই বহাল রাখা হয়। সম্মেলনের নয় মাস পরেও তারা দুই জন জেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি পূরণ করতে পারেনি।
খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেয়া নিয়েও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মাঝে বিভেদ প্রবল হয়। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের চাপে তার দুইজন পৃথকভাবে ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট খসড়া তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন দুইজনের কেন্দ্রে পাঠানো তালিকা নিয়েও নানা সমালোচনা তৃণমূলে। বিশেষ করে জেলা আওয়ামীলীগের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনেক ডাক সাইটের অনেক নেতাদের নাম প্রস্তাব করেননি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
তাই দুইজনের খসড়া তালিকাকে অনেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করার বদৌলতে নিজেদের স্বার্থ হাসিলকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয় বলে মনে করছেন। কেন্দ্রে জমা দেয়া আবু হাসনাত শহীদ বাদলের প্রস্তাবিত ৭৫ জনের কমিটিতে আগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সহসভাপতিদের আমলেই নেয়া হয়নি। এর মধ্যে সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নামের সাথে একই পদে চন্দনশীলের নাম প্রস্তাব করাটাকেও অনেকে আড় চোখে দেখছেন।
জেলা আওয়ামীলীগের কমিটিতে নাসিক মেয়র ডা. আইভী থাকবেন কিনা সেটি নিয়েও ভিপি বাদলের নাম প্রস্তাবে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এছাড়া মহানগর আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি হিসেবে রয়েছে বাবু চন্দনশালী। তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। মহানগর আওয়ামীলীগেরই নাম প্রস্তাবে জাতীয় পরিষদের সদস্য। তাকেই ১নং সহসভাপতি হিসেবে আইভীর সাথে নাম প্রস্তাব করেছেন ভিপি বাদল।
ভিপি বাদলের জমা দেয়া কমিটিতে শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপের ছায়াই পরিলক্ষিত হয়েছে বেশি। কেননা, বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে সহসভাপতি পদে ফয়েজউদ্দিন লাভলুর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। ফয়েজউদ্দিন লাভলু সম্পর্কে শামীম ওসমানের বেয়াই হন। তিনি সরাসরি আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সরব হতে দেখা যায়নি।
তার বাবা খোকা মহিউদ্দিন আওয়ামীলীগের জাদরেল নেতা ছিলেন। যদিও তিনি পরবর্তীতে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং আমৃত্যু জাতীয় পার্টিতেই ছিলেন। ফয়েজউদ্দিন লাভলুর চাচা মেজবাহউদ্দিন দুলু জাতীয় পার্টি নেতা প্রয়াত সাবেক সাংসদ নাসিম ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট কর্মী ছিলেন। আমৃত্যু তিনি জাতীয় পার্টিতেই ছিলেন।
ভিপি বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে সহসভাপতি পদে মো. মনির হোসেনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামীলীগ নেতাদের দাবি, তিনি আওয়ামীলীগ ঘরানার লোক হলেও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি কখনো। সহ-সভাপদি পদে শরফুদ্দিন আহমেদকেও নিয়েও নানা কথা আলোচনায় রয়েছে। শরফুদ্দিন আহম্মেদ সম্পর্কে সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদলের সম্বন্ধী। এছাড়া প্রয়াত জমির আহমেদ জমুর মেয়ের জামাই।
সহ-সভাপতি পদের সিরাজুল ইসলামকে নিয়েও কথা হচ্ছে।তিনি বন্দরের ধামগড় ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাথে জড়িত। ৯০ এর দশকে এক যুবলীগ নেতা হত্যার আসামি করা হয় তাকে। এরপর তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। সহ-সভাপতি পদে নাম প্রস্তাব করা আবুল বাশার টুকুর বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করার অভিযোগ উঠে। এমনকি তাকে শোকজ পর্যন্ত করা হয়।
অদ্যবধি পর্যন্ত তিনি সেই শোকজের জবাব দেননি বলে জানান আওয়ামীলীগ নেতারা। এছাড়া সহসভাপতি পদের কাজী বেনজীর আহমেদ আড়াইহাজারে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা। জেলার আ.লীগ নেতারা তাকে তেমন চেনেননা বলে জানান। এছাড়া সহসভাপতি পদের অনুপ সাহা ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান।
সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। শামীম ওসমান ২০১৪ সালে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশে আসা-যাওয়া শুরু করেন। অনুপ কুমার সাহার দুই মেয়ে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। কিছুদিন আগে তার এক মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শামীম ওসমান ও তার রাইফেল ক্লাবের বন্ধুরাও অংশগ্রহণ করেন।
সহসভাপতি পদের অনুপ সাহার মতোই মাসুদ চৌধুরী মজনুও ৩৫/৪০ বছর আগে দেশ ত্যাগ করে সুইডেনে বসবাস করেন। অনুপের মতো তিনিও ২০১৪ সালে শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর দেশের সাথে যোগাযোগ বাড়ান। মজনুও শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত বন্ধু। ভিপি বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মেজর মশিউর রহমান বাবুল আগের কমিটিতেও সদস্য পদে ছিলেন।
তবে তিনি জেলা আওয়ামীলীগের কোন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতেন না। আওয়ামীলীগের নেতারা বলেন, মশিউর রহমান বাবুল প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এবং গত নির্বাচনের আগে রূপগঞ্জের বাড়িতে আথিতেয়তা গ্রহণ করেন। এরশাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে তাকে জানতেন সবাই।
এছাড়া ভিপি বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদা আক্তার ফেনসি যিনি সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান।তিনি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ জাপা নেতা লিয়াকত হোসেন খোকা এবং তার স্ত্রী ডালিয়া হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। আওয়ামীলীগের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে ১৪ বছরে তাকে দেখা না গেলেও বাদলের প্রস্তাবনায় রয়েছেন তিনি। এছাড়া ফেন্সির স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের ক্যাডার নীরু ও বাবলুর সহযোগী ছিলেন বলে অভিযোগ আওয়ামীলীগ নেতাদের।
ভিপি বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ পদে কাজী সুমনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। কাজী সুমনের বিরুদ্ধে চোরাই তেলের ব্যবসা, মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতারা। আগের কমিটিতে ভিপি বাদল বার বার তার নাম প্রস্তাব করলেও কার্যকরী কমিটির আপত্তিতে তাকে জেলা আওয়ামীলীগের ঠাঁই দেয়া যায়নি।
এছাড়া সাধারণ সম্পাদকের প্রস্তাবিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকা আজিজুল হক ভূঁইয়া বন্দরের ধামগড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি নেতা আয়নাল হক ভূঁইয়ার ছেলে। আজিজুল হকের আরেক ভাই কামাল ভূঁইয়া আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে চেয়রম্যান হন। নির্বাচনের দিন আজিজুল হক ভূইয়া ও তার ভাই কামাল ভূঁইয়ার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয় এবং এতে ডিবি পুলিশের দুই সদস্য গুরুতর আহত হন, যারা এখনো চিকিৎসাধীন আছেন।
এ ব্যাপারে দুইজনকে আসামী করেই যে মামলা রয়েছে তা এখনো চলমান রয়েছে। এছাড়া সদস্য হিসেবে থাকা আলী হোসেন হচ্ছেন সোনারগাঁয়ের সাদিপুরের আলী হোসেন। এলাকার ১০০ জন মানুষকে জিজ্ঞাসা করলেও তাকে বিএনপির আলী হোসেন বলেই পরিচিত করে দেয় এলাকাবাসী এমন অভিযোগ। এছাড়া ভিপি বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে জেলার ত্যাগী নেতাদের চেয়ে নিজের পরিবারকে প্রাধান্য দেয়ার চিত্র উঠে এসেছে তার স্ত্রী নাহিদা হাসনাতের নাম সদস্য পদে থাকায়। নাহিদা হাসনাত মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও পদ রয়েছে। তাহলে জেলা আওয়ামীলীগের কমিটিতে আসাটা কেন জরুরি মনে করলেন ভিপি বাদল সেটিও নেতাকর্মীদের কাছে প্রশ্ন।
গত ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহিদ বাদল (ভিপি বাদল) স্বাক্ষরিত জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির প্রস্তাবনায় যাদের নাম রাখা হয়েছে তারা হলেন সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই, সহসভাপতি ডা. সেলিনা হায়াত আইভী/বাবু চন্দন শীল, ফয়েজ আহমেদ উদ্দিন লাভলু, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনির হোসেন, শরফুদ্দিন আহমেদ, মো. সিরাজুল ইসলাম, খন্দকার আবুল বাশার টুকু, কাজী বেনজীর আহমেদ, মো. সানাউল্লাহ (খাদেম), অনুপ কুমার সাহা, মাসুদ চৌধুরী মজনু, সাধারণ সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো. শহিদ বাদল।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বিরু, নাজমুল আলম সজল, মীর সোহেল, আইন বিষয়ক সম্পাদক এড. মাসুদ-উর রউফ, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক দীপক কুমার বণিক দিপু, তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মোজাম্মেল হক জুয়েল, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আলমাছ ভূইয়া, দপ্তর সম্পাদক এমএ রাসেল, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সামসুদ্দিন খান আবু, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন নাসির, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন পান্নু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মেজর মশিউর রহমান বাবুল, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদা আক্তার ফেনসি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদনী টুলু, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মীর্জা সোহেল, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এসএম জাহাঙ্গীর, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মো. হায়দার আলী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক আরমান হোসেন জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান রোমান, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আলহাজ্ব ফায়জুল ইসলাম, উপ দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুল ইসলাম রাজন, উপ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জিল্লুর রহমান লিটন, কোষাধ্যক্ষ কাজী সুমন।
সদস্য পদে একেএম শামীম ওসমান (এমপি), নজরুল ইলাম বাবু (এমপি), গাজী গোলাম দস্তগীর (এমপি), বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া, আব্দুল্লাহ আল কায়সার (সাবেক এমপি), মো. শাহজাহান ভূইয়া, এমএ রশিদ, মো. সাইফুল্লাহ বাদল, মো. শওকত আলী, তোফাজ্জেল হোসেন মোল্লা, ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম, কাজিম উদ্দিন প্রধান, মানজারী আলম টুটুল, আজিজুল হক ভূইয়া, খোরশেদ আলম, মিয়া মো. আলাউদ্দিন, হালিম শিকদার, মনির শিকদার।
এড. আবু তাহের ফজলে রাব্বী, মনিরুজ্জামান বুলবুল (পিপি), নাহিদা হাসনাত, প্রফেসর শিরিন বেগম, ফেরদাউসি নীলা, সীমা রানি পাল, এহসানুল হক নিপু, শাহাদাত হোসেন সাজনু, এড. হাসান ফেরদাউস জুয়েল, এড. মো. মোহসিন, সুন্দর আলী, নজরুল ইসলাম, আলী হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজির উদ্দিন আহমেদ, সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, শেখ সাইফুল ইসলাম, মো. আলী হোসেন ও আবু মো. শরিফুল হক।
এর আগে গত ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুল হাইকে সভাপতি, তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীকে সহসভাপতি করে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও মত পার্থক্যের কারণে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও ৬টি পদ পূরণ করা হয়নি বলে দলীয়ভাবে অভিযোগ পাওয়া যায়।
এস.এ/জেসি


