# পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য
# পাঠানো তালিকা নিয়ে নানা বিতর্ক
আগামী নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মাঝে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এই মুহুর্ত্বে সবচাইতে আলোচনার বিষয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পৃথকভাবে কেন্দ্রে জমা দেয়া জেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ খসড়া তালিকা।
জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদলের জমা দেয়া কমিটিতে প্রভাবশালী সাংসদ শামীম ওসমানের ছায়া বড় আকারে ধরা পড়েছে। আর ভিপি বাদলের নিজের পছন্দের ব্যক্তিরাও বাদ পড়েনি। একই ভাবে আব্দুল হাইয়ের তালিকাতেও তার পছন্দের ব্যক্তিদের নামের পাশা পাশি পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য পেয়েছে। কেননা তারা দুজনেই পরিবারের সদস্যদের নাম পাঠিয়েছে।
এদিকে জেলার ত্যাগী আওয়ামীলীগ নেতাদের নাম বাদ পড়লেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুইজনই একটি জায়গায় একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছেন। সেটি হলো ভিপি বাদল যেখানে কমিটিতে তার স্ত্রী নাহিদা হাসনাতকে সদস্য পদে প্রস্তাব করেছেন, আবদুল হাই তার ছেলে মো. তানভীর হাইকেও সদস্য পদে প্রস্তাব করেছেন।
অথচ ভিপি বাদলের স্ত্রী নাহিদা হাসনাত কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে রয়েছে। তার বিপরীতে আব্দুল হাইয়ের ছেলে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ প্রচার ও প্রকাশক সম্পাদক পদে রয়েছেন। তাদেরকে এখন জেলা কমিটির সদস্য পদে প্রস্তাব করে দুজনের পৃথক তালিকায় নাম পাঠানো হয়েছে। আর এতে করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা ক্ষোভ ঝারছেন।
দলীয় সূত্রমতে জেলা আওয়ামী লীগেখসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে আওয়ামীলীগের তৃণমূলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানিয়েছে সূত্র। ২০২২ সালের অক্টোবরে জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলনে আগের কমিটির সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদলকে বহাল রাখা হয়। কিন্তু কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা নিয়ে তাদের দুইজনের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক বিরাজ করছিল।
এমনকি দুইজনের জেলা আওয়ামীলীগের কর্মসূচিও পৃথকভাবে পালন করতে দেখা গেছে। তার মাঝে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে তারা জেলা আওয়ামী লীগের পূর্বের কমিটির ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নিজেদর পছন্দের ব্যক্তিদের পাশা পাশি পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
কেননা তারা নিজেদের বলয় ভাঢ়ি করতে তাদের পছন্দ মত তালিকা পাঠিয়েছে বলে জানান একাধিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়া দুইজনের খসড়া তালিকাকে অনেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করার বদৌলতে নিজেদের স্বার্থ হাসিলকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয় বলে মনে করছেন। কেন্দ্রে জমা দেয়া আবু হাসনাত শহীদ বাদলের প্রস্তাবিত ৭৫ জনের কমিটিতে আগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সহসভাপতিদের আমলেই নেয়া হয়নি।
তার বিপরীতে নারায়ণগঞ্জের প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা আবদুল হাইয়ের প্রস্তাবিত ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও নানা আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। আবদুল হাইয়ের কমিটিতে শামীম ওসমান ফলাও করে প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও এই কমিটিতে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির থাকা আর ত্যাগী আওয়ামীলীগ নেতাদের বাদ পড়ে যাওয়া নিয়ে কঠোর সমালোচনা চলছে তৃণমূলে।
হাই বাদলের পাঠানো বিতর্ক তালিকায় নামের মাঝে রয়েছে, ভিপি বাদলের জমা দেয়া কমিটিতে শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপের ছায়াই পরিলক্ষিত হয়েছে বেশি। কেননা, বাদলের প্রস্তাবিত কমিটিতে সহসভাপতি পদে ফয়েজউদ্দিন লাভলুর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। ফয়েজউদ্দিন লাভলু সম্পর্কে শামীম ওসমানের বেয়াই হন। তিনি সরাসরি আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সরব হতে দেখা যায়নি।
এছাড়া সহ-সভাপতি পদের অনুপ সাহা ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। শামীম ওসমান ২০১৪ সালে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশে আসা-যাওয়া শুরু করেন। অনুপ কুমার সাহার দুই মেয়ে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
কিছুদিন আগে তার এক মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শামীম ওসমান ও তার রাইফেল ক্লাবের বন্ধুরাও অংশগ্রহণ করেন। সহসভাপতি পদের অনুপ সাহার মতোই মাসুদ চৌধুরী মজনুও ৩৫/৪০ বছর আগে দেশ ত্যাগ করে সুইডেনে বসবাস করেন। অনুপের মতো তিনিও ২০১৪ সালে শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর দেশের সাথে যোগাযোগ বাড়ান। মজনুও শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত বন্ধু। তাদের নিয়ে দলের নেতৃবৃন্দের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কেননা অভিযোগ উঠেছে উড়ে এসে জুড়ে বসে তারা জেলার নেতা হয়ে যেতে চায়।
বিপরীতে দেখা যায়, আবদুল হাইয়ের কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নাম প্রস্তাব করা মুক্তিযোদ্ধা এড. মফিজউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় নন। রাজনীতির চাইতে তিনি আইনপেশা নিয়েই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। এছাড়া আবদুল হাইয়ের প্রস্তাবিত কমিটিতে কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক মো. সেলিম সম্পর্কে তৃনমূল নেতাকর্মীদের ধারণা নেই। তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তারের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কেও আওয়ামীলীগ নেতারাই মনে করতে পারছেননা।
সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, আবদুল হাই কিংবা ভিপি বাদলের দুইজনের কমিটিতে ঠাঁই হয়নি আওয়ামীলীগের দুর্দিনে লাগাতার সার্ভিস দেয়া দুই জাদরেল নেতার। বয়োজ্যেষ্ঠ আওয়ামীলীগ নেতা হিসেবে আবদুল হাইয়ের কাছে প্রত্যাশাও বেশি করেন আওয়ামীগ নেতারা।
জেলা আওয়ামীলীগের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সভাপতি পদে থাকা এড. আসাদুজ্জামান আসাদ এবং আরজু রহমান ভূঁইয়া কেন আবদুল হাই কিংবা ভিপি বাদলের খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা নিতে পারলোনা এটি নিয়ে বিস্ময়ের সাথে ক্ষোভের কমতি নেই তৃণমূলে। রীতিমত স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক জনপ্রতিনিধি থেকে দলীয় নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদেরকে কেন জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণ্ঙ্গা কমিটিতে রাখা হয় নাই তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
উল্লেখ্য ২০২২ সনের ২৩ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মাধ্যমে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় ২ যুগ পর এই সম্মেলন ফতুল্লার ইসদাইর ওসমানী পৌর স্টোডিয়ামে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে পূর্বের কমিটির সভাপতি আবদুল হাই এবং সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদলকে বহাল রাখা হয়। সম্মেলনে তিন মাসের মাঝে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দেয়া হলেও আট মাস পরে কেন্দ্রের চাপে পৃথক ভাবে তারা খসরা কমিটির তালিকা পাঠান। এন.হুসেইন রনী /জেসি


