নির্বাচনের আগে ঐক্যের চেয়ে দ্বন্দ্বে ব্যস্ত আ.লীগ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৩, ০৯:৫৯ এএম
# নেতায় নেতা অভ্যন্তরীন কোন্দল
# দলটাকে ১০ টুকরা করেছে : খোকন সাহা
অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংসদদের সঙ্গে স্থানীয় সংগঠনের নেতাদের দূরত্ব আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে পারে আওয়ামী লীগকে। এই দুশ্চিন্তা খোদ আওয়ামী লীগের। আরও উদ্বেগের বিষয়, এই কোন্দল হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে পোষ্টার ব্যানার নিয়ে প্রচারনা করায় আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান। তার সাথে তাল মিলিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহা তার কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে ক্ষোভ ঝেরেছেন।
কিন্তু যখন কেন্দ্র থেকে মহানগর আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয় তখন তারা এক হয়ে মহানগরের ২৭টি ওয়ার্ডের মাঝে ১৮টি ওয়াডের সম্মেলন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যখনি ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সম্মেলনে এসে এখানে নিয়াজুলকে সভাপতি করা হয় তখনি তাদের পুরনো দ্বন্দ্ব আবার শুরু হয়। আর এজন্য পরবর্তিতে তারা সিদ্ধিরগঞ্জের ১০ টি ওয়ার্ডের কমিটির সম্মেলন এখনো করতে পারে নাই।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের কোন্দল দিনের পর দিন বেড়েই যাচ্ছে। মহানগরের দুই শীর্ষ নেতা দুই মেরুতে অবস্থান করছেন। একই সাথে সম্প্রতি রমজান মাসে তারা পৃথক ভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করে তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সেই সাথে একে অপরকে নিয়ে খোঁচা মেরে বক্তব্য রাখতে কর্ণপাত করেন নাই।
এছাড়া সারা দেশের রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি নিয়ে আইনি সহায়তা ও মানবাধিকার-বিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর ভেতরের কোন্দল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে সারা দেশে রাজনৈতিক হানাহানিতে মারা গেছেন ৫২ জন। এর মধ্যে শুধু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই মারা গেছেন ৪৩ জন।
দলীয় সূত্রমতে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কোন্দল নতুন কিছু নয়। নির্বাচন আসলেই এখানকার কোন্দল বাড়তে থাকে। আর তা হলো উত্তর এবং দক্ষিন মেরুর বলয় নিয়ে। কেননা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে নাসিক মেয়র আইভীর বলয়ের নেতা কর্মীদের দক্ষিন মেরু হিসেবে জানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা।
তাদের বিপরীতে সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারীদের উত্তর মেরুর হিসেবে চিনে থাকেন। এই দুই মেরুর দুই জনপ্রতিনিধির ব্যপক প্রভাব রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের মাঝে। তাদের ইশারায় দলের কমিটিতে অনেকে পদে পেয়ে থাকেন। সম্প্রতি জেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতার খসরা পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিয়ে স্থানীয় নেতা কর্মীদের মাঝে ব্যপক আলোচনা উঠেছে। সেই সাথে প্রস্তাবিত কমিটিতে নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরী হয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে আলোচনা শেষ না হতেই এখন মহানগর আওয়ামী লীগের দুই কর্ণদ্বার নেতাকে তলব করেছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। তাদের কোন্দল বিষয়ে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ অবগত হয়েছে। নেতা কর্মীদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে দলীয় কোন্দল সহ নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে।
জানা যায়, সম্প্রতি রমজান মাসে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহার নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির নৈরাজ্য প্রতিরোধে মহানগর আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ঈদের পরবর্তিতে বন্দরের ২১ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনী সভা হয়।
এই সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এড খোকন সাহা তার কমিটির সভাপতি আন্য়োার হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আগামী নির্বাচন জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচন বাচাঁ মরার নির্বাচন। আপনার পক্ষে আমরা ২০১৬ সনে সিটি করপোরেশনে নৌকার আনার জন্য কাজ করেছি। কিন্তু যাকে নৌকা দিয়েছে আমরা তার পক্ষে কাজ করেছি। তখন আপনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন। আপনিতো অনেক কিছু পেয়েছেন এবার অন্যদের পাওয়ার সুযোগ দেন।
তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রার্থী হয়ে যারা দলটাকে ১০ টুকরা করেছে আমি মনে করি তারা নৈতিকতা হারিয়েছে। নেত্রী বলেছেন সকলকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার জন্য। আজকে পত্রিকার পাতা খুললে দেখা যায় দল অনৈক্যে এগিয়ে। নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিবে তার পক্ষে কাজ করার জন্য আমরা এখানে এসে একত্রিত হয়েছি।
আপনারা যারা নিজেদের হিরো ভাবতাছেন তারা হিরো না। শেখ হাসিনা বলেছেন যতই লাফা লাফি করেন মনোনয়ন দিবো আমি। আপা কাকে মনোনয়ন দিবেন তা তিনি নির্ধারণ করে রেখেছেন। নেত্রী যদি জোটের কোন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেন আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে যাকেই মনোনয়ন দিবেন তাদের জয় আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
মনোনয়ন-যুদ্ধ শুরু
নির্বাচন কমিশন সূত্রমতে আগামী ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার আলোচনা রয়েছে। এই হিসাবে নির্বাচনের বাকি আট মাস। এখনই সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেছে। কথার লড়াই, বিষোদ্গার, এমনকি একে অপরকে খোচাঁ মেরে বক্তব্য দেয়া পর্যন্ত হচ্ছে। আর এতে করে তাদের মাঝে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে তার দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে বক্তব্যের মাঝেও ফুটে উঠেছে।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীনদের মাঝে নৌকার মনোনয়ন যুদ্ধে নেমেছে একাধিক ব্যক্তি। তারাও এখানে জাতীয় পার্টির এমপিকে হটিয়ে নৌকার এমপি চান। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দলীয় সভানেত্রী যাকে মনোনয়ন দিবে তারা তাকেই মেনে নিয়ে কাজ করবে।
আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কোন্দল নিরসন এবং নেতায় নেতায় ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে তৃণমূলের নেতাদের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বিভেদ ভুলে সবাইকে ঘরে ঘরে গিয়ে নৌকার জন্য ভোট চাইতে নির্দেশনা দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোন্দল নতুন কিছু নয়। কিন্তু নির্বাচনের আগে এই কোন্দল নিরসন না হলে তা আগামী নির্বাচনের দলীয় প্রার্থীকে পস্তাতে হতে পারে। এন. হুসেইন রনী / জেসি


